একটু চিন্তা করে শেখরনাথ জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কী মনে হয়, আমার হাসপাতালে থাকা দরকার? তা হলে মোহনবাঁশির বউ ছেলেমেয়ে আর বিনয়কে বিশুর বাংলোয় পৌঁছে দিয়ে ফিরে আসব।
মোহনবাঁশি পূর্ব পাকিস্তানের একজন সামান্য উদ্বাস্তু, যার সঙ্গে লেশমাত্র সম্পর্ক নেই, সম্পূর্ণ অনাত্মীয়, জেফ্রি পয়েন্টে আসার আগে তাকে কোনও দিন দেখেননি, তবু তার প্রতি কী গভীর মমতা শেখরনাথের। কতখানি তীব্র উদ্বেগ! বয়স তো কম হয়নি, তার উপর সেই সকাল থেকে শরীরের উপর দিয়ে ঝড় বয়ে গেছে। সেসব অগ্রাহ্য করে তিনি কি না মোহনবাঁশির জন্য হাসপাতালে রাত কাটাতে চাইছেন! অগ্নিযুগের এই বিপ্লবী মানুষটির প্রতি শ্রদ্ধা শতগুণ বেড়ে গেল বিনয়ের। অবাক বিস্ময়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকে সে।
এদিকে ডাক্তার চট্টরাজ ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন।–না না কাকা, আপনাকে এখানে এসে রাত জাগতে হবে না। হাসপাতালে তো আপনার কিছু করার নেই। বাহা সাহেবের বাংলোয় গিয়ে খাওয়াদাওয়া সেরে শুয়ে পড়ুন। বয়স হয়েছে, ঘুমটা কিন্তু আপনার খুব দরকার। কাল বেলার দিকে এসে মোহনবাঁশির। খবর নেবেন।
ঠিক আছে, তুমি যখন বলছ, বিশুর ওখানে চলেই যাই। কিন্তু ঘুমোতে কি আর পারব? মোহনবাঁশির জন্য বড় চিন্তা হচ্ছে ডাক্তার। বলতে বলতে উঠে পড়লেন।
বিনয়ও আর বসে থাকল না। তাকে সঙ্গে নিয়ে বাইরের প্যাসেজে বেরিয়ে এলেন শেখরনাথ। নিচু গলায় বললেন,ডাক্তারের সঙ্গে যা কথা হল, মোহনবাঁশির বউ ছেলেমেয়েদের কিন্তু বোলো না। শুনলে কান্নাকাটি শুরু করে দেবে। যা বলার আমিই ওদের বলব।
বিনয় আস্তে মাথা হেলিয়ে দিল। আচ্ছা।
মোহনবাঁশির পুরো পরিবারটি যেখানে বসে ছিল সেখানে আসতেই তার স্ত্রী ধড়মড় করে উঠে দাঁড়াল। শুষ্ক, শীর্ণ স্বরে জিজ্ঞেস করল, ডাক্তারবাবু কী কইল? মানুষটা কেমুন আছে?
মানুষটা বলতে মোহনবাঁশি। উত্তর দিতে গিয়ে একটু যেন থেমে গেলেন শেখরনাথ। তারপর বললেন, ইঞ্জেকশন, ওষুধ সবই দেওয়া হয়েছে। ভয়ের কারণ নেই।
মোহনবাঁশির স্ত্রী গেঁয়ো মেয়েমানুষ। দেশভাগের আগে পূর্ববাংলায় তাদের নিজেদের গ্রাম এবং তার চারপাশের কয়েকটি গ্রামগঞ্জের বাইরে কোনও দিন পা বাড়ায়নি। নিরক্ষর হলেও সে নির্বোধ নয়, মুখ দেখে মনের কথা হয়তো পড়তে পারে। একদৃষ্টে সে শেখরনাথকে লক্ষ করছিল। চোখের পাতা পড়ছিল না তার। বলল, আপনে ঠিক নি কন?
শেখরনাথ ভিতরে ভিতরে খুব সম্ভব বিব্রত বোধ করলেন। লহমায় তা সামলে নিয়ে বললেন, বেঠিক বলব কেন? এখন চল
না, আমাগো যাইতে কইয়েন না। মনে বড় কুড়াক ডাকতে আছে। আমরা এহানেই থাকুম। অন্য কুনোহানে যামু না।
এখানে কোথায় থাকবে?
এই কাঠের পাটায় বেঞ্চে) বইয়া (বসে) থাকুম।
খুব দরকার না হলে রোগীর বাড়ির লোকেদের হাসপাতালে রাত্তিরে থাকতে দেয় না। তেমন বুঝলে ডাক্তারবাবু তোমাদের থাকতে বলতেন৷ বলে একটু থেমে জিজ্ঞেস করলেন, আমার ওপর তোমাদের ভরসা আছে তো?
নিয্যস (নিশ্চয়ই)। আপনেরা ছাড়া এই দ্বীপি আমাগো আপনাজন (আপনজন) আর কে আছে?
তা হলে চল।
অনেক বোঝানোর পর প্রবল অনিচ্ছাসত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত মোহনবাঁশির স্ত্রীকে রাজি করানো গেল। শেখরনাথ বিশ্বজিতের একটি জিপ নিয়ে এসেছিলেন। দোতলা থেকে নেমে নিচের বিশাল চত্বরে এসে মোহনবাঁশির গোটা পরিবার এবং বিনয়কে নিয়ে জিপে উঠে পড়লেন শেখরনাথ।
৩.০২ এবারডিন মার্কেট
জিপটা সেলুলার জেলের বিশাল চত্বর পেরিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল। খানিকটা এগিয়ে টিলার ঢাল বেয়ে নিচে নেমে সোজা এবারডিন মার্কেট। মার্কেটের দোকানপাট বেশ রাত অবধি খোলা থাকে। এখন তো সবে সন্ধে পেরিয়েছে। চারিদিকে আলো জ্বলছে। ইলেকট্রিক লাইট ছাড়াও রয়েছে গ্যাসের আলোও। লোকজনও প্রচুর চোখে পড়ছে। বিকিকিনি চলছে। পুরোদমে।
জিপ চালাচ্ছিল বিশ্বজিৎ রাহার ড্রাইভার কালীপদ। ফ্রন্ট সিটে তার পাশে বসে আছে বিনয় এবং শেখরনাথ। পেছনের মুখোমুখি দুটো লম্বা সিটে মোহনবাঁশির স্ত্রী-ছেলেমেয়েরা উদ্বাস্তুরা সেটেলমেন্ট থেকে কোনও কারণে পোর্টব্লেয়ারে এলে এবারডিন মার্কেটের পাশে পুনর্বাসন দপ্তরের ভাড়া করা বাড়িতে রাখা হয়। কিন্তু মোহনবাঁশির পরিবারের লোকজন এতটাই কাতর, এতটাই উৎকণ্ঠিত যে রিহ্যাবিলিটেশনের কর্মীরা ওদের সামলাতে পারবে না; তাই শেখরনাথ বিশ্বজিতের বাংলোয় নিয়ে চলেছেন। খুব সম্ভব এই নিয়ে বিশ্বজিতের সঙ্গে তার কথা হয়েছে। যে কদিন মোহনবাঁশির স্ত্রী-ছেলেমেয়েরা পোর্টব্লেয়ারে আছে, বিশ্বজিতের বাংলোতেই থাকবে। ওদের চোখে চোখে রাখা একান্ত দরকার।
এবারডিন মার্কেট এবং তার চারপাশের এলাকাটা খুব ভালোই চেনে বিনয়। এই তো সেদিন উদ্বাস্তুদের সঙ্গে রস আইল্যান্ড থেকে মোটরবোটে পোর্টব্লেয়ারে নেমে এবারডিন মার্কেটের জিমখানা ময়দানে এসেছিল। সেখান থেকে বিশ্বজিতের সঙ্গে তার বাংলোয়।
মার্কেটের জমজমাট চৌহদ্দি পেছনে ফেলে পশ্চিম দিকের রাস্তা ধরল জিপটা। উঁচু-নিচু টিলা পেরিয়ে সেটা চলেছে তো চলেছেই। দুধারে পরিচিত দৃশ্য। রাস্তার নিচের ঢালু জমিতে ধানখেত; দূরে দূরে ছাড়া ছাড়া ভাবে বাড়ি-ঘর। কাঠের বাড়িই বেশি; ক্কচিৎ দু-চারটে পাকা দালান।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।