পুনর্বাসনের কর্মীরা সামান্য ইতস্তত করে বলল, কাকা, আপনে খাইবেন না?
আমার জন্য ভেবো না। বিশুর কাছে গিয়েছিলাম। সে আমাকে জোর করে খাইয়ে দিয়েছে আর তোমাদের জন্য খাবার পাঠিয়েছে। বলতে বলতে শেখরনাথের নজর এসে পড়ল বিনয়ের উপর।–আরে, তোমার কথা একেবারেই খেয়াল ছিল না। কোথায় ছিলে এতক্ষণ?
ঝিনুকের ব্যাপারটা না জানিয়ে ভাসা ভাসা জবাব দিল বিনয়।–আপনি সেলুলার জেলটা দেখতে বলে গিয়েছিলেন। এধারে-ওধারে ঘুরে তাই দেখছিলাম।
কী দেখেছে তা নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আর কোনও প্রশ্ন করলেন না শেখরনাথ। তাড়া দিয়ে বললেন, সারাদিনে তোমারও তো কিছু খাওয়া হয়নি। রুটি-তরকারি খেয়ে নাও
খাওয়াদাওয়া চুকে গেলে শেখরনাথ পুনর্বাসন কর্মীদের বললেন, এবার তোমরা তোমাদের আস্তানায় চলে যাও। ভালো করে বিশ্রাম নাও। আর তোমাদের হাসপাতালে আসতে হবেনা। কাল সকালে উঠে সোজা জেফ্রি পয়েন্টের সেটলমেন্টে চলে যাবে। মোহনবাঁশির ব্যাপারটা আমরা দেখব।
বিনয় আগেই জেনেছিল, পোর্টব্লেয়ারের এবারডিন মার্কেটের পাশে রিফিউজি রিহ্যাবিলিটেশন ডিপার্টমেন্ট একটা বড় বাড়ি। ভাড়া নিয়েছে! কলকাতা থেকে নতুন উদ্বাস্তুরা এলে সেখানে তারা দু-এক দিন থাকে। তারপর তাদের সাউথ আন্দামানের নানা এলাকায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। শুধু কলকাতা থেকে আসা উদ্বাস্তুরাই নয়, পুনর্বাসন দপ্তরের কর্মীরা সুদূর সেটলমেন্টগুলি থেকে কোনও প্রয়োজনে পোর্টব্লেয়ারে এলে তারাও এখানে কাটিয়ে যায়।
জেফ্রি পয়েন্ট থেকে মোহনবাঁশিকে নিয়ে যে কর্মীরা এসেছিল তারা চলে গেল। মোহনবাঁশির স্ত্রী ছেলেমেয়েরা যেখানে বসে আছে তাদের সেখানে অপেক্ষা করতে বলে শেখরনাথ বিনয়কে বললেন, চল, ডাক্তার চট্টরাজের সঙ্গে দেখা করে পেশেন্টের এখনকার হাল জেনে নিই। এতক্ষণে সে নিশ্চয়ই মোহনবাঁশির ট্রিটমেন্টের সমস্ত ব্যবস্থা করে ফেলেছে।
ডাক্তার চট্টরাজের চেম্বারটি কোনাকুনি ডানধারে খানিকটা দূরে। সেদিকে যেতে যেতে বিনয় জিজ্ঞেস করল, এমন একটা মারাত্মক ঘটনার খবর পেয়েও রাহাসাহেব এলেন না কেন? ভেবেছিলাম– বাকিটা শেষ না করে থেমে গেল সে।
শেখরনাথ বললেন, ওর আসার খুব ইচ্ছে ছিল। কিন্তু সন্ধেবেলায় চিফ কমিশনার রিহ্যাবিলিটেশনের কজন। অফিসারকে তার বাংলোয় ডেকেছেন। তাই আসতে পারল না। হাসপাতালের কাজ চুকলে মোহনবাঁশির বউ ছেলেমেয়ে আর তোমাকে তার বাংলোয় নিয়ে যেতে বলেছে। যে কদিন পোর্টব্লেয়ারে আছি, তার বাংলোতেই থাকব।
বিনয় আর কোনও প্রশ্ন করল না।
ডাক্তার চট্টরাজ তার চেম্বারেই ছিলেন। মোহনবাঁশিকে এমার্জেন্সি ওয়ার্ডে ভরতি করা হয়েছিল। ডাক্তার চট্টরাজকে দেখে মনে হল, তাকে দেখে একটু আগে ফিরে এসেছেন। চুল এলোমেলো, কেমন একটু চিন্তাগ্রস্ত, অস্থির অস্থির ভাব। লক্ষণটা ভালো লাগল না বিনয়ের।
শেখরনাথ আর বিনয়কে দেখে উঠে দাঁড়ালেন ডাক্তার চট্টরাজ। টেবিলের এধারে সারি সারি চেয়ারগুলি দেখিয়ে বললেন, বসুন বসুন–
শেখরনাথ জিজ্ঞেস করলেন, মোহনবাঁশিকে তোমার হাতে দিয়ে আমি বিশুর কাছে গিয়েছিলাম। এক ঘণ্টার বেশি কেটে। গেছে। ওর কন্ডিশন কীরকম বুঝছ?
কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ বসে রইলেন ডাক্তার চট্টরাজ। তারপর সোজা শেখরনাথের দিকে তাকালেন। খুবই সিরিয়াস কাকা।
দুর্ভাবনার ছায়া পড়ল শেখরনাথের চোখেমুখে। কীরকম?
ডাক্তার চট্টরাজ জানালেন, জারোয়াদের তির মোহনবাঁশির ফুসফুসে ঢুকে গেছে। সেটা ভীষণ বিপজ্জনক। তিরটা বার করতে গিয়ে যদি ভিতরে রক্তক্ষরণ হয় লোকটাকে বাঁচানো যাবে কি না বলা মুশকিল।
নীরবে বসে রইলেন শেখরনাথ। তার উৎকণ্ঠা বাড়ছিল। বিনয়েরও।
বেশ কিছুক্ষণ পর ডাক্তার চট্টরাজ বললেন, যে অবস্থায় মোহনবাঁশিকে নিয়ে এসেছিলেন তিরটা ঠিক সেইরকম বিধে আছে। ওটা বার না করলেই নয়। কিন্তু আজ তা সম্ভব না।
রুদ্ধশ্বাসে শেখরনাথ জানতে চাইলেন, কেন?
তিরটা বার করার জন্য আমার দুজন অ্যাসিস্টান্ট সার্জন দরকার। তেমন কেউ আপাতত হাসপাতালে নেই। ডাক্তার চট্টরাজ বলতে লাগলেন, আপনি তো জানেন কাকা, আমাদের এখানে প্রয়োজনের তুলনায় স্টাফ কম। বিশেষ করে ডাক্তার। কলকাতা বা মাদ্রাজ থেকে কোনও ডাক্তার এখানে চাকরি নিয়ে আসতে চায় না। মাত্র কয়েকজনকে নিয়ে এত বড় হাসপাতাল চালাতে হচ্ছে। আমার দুজন ব্রাইট ইয়াং সহকর্মী দুসপ্তাহ আগে কার নিকোবরে গেছে। সেখানে কটা ক্রিটিকাল অপারেশন সেরে কাল সকালে তাদের ফেরার কথা। ওরা এসে পৌঁছুলেই তিরটা বার করব।
যদি কোনও কারণে ওঁদের না আসা হয়, তা হলে?
সেটা বিরাট সমস্যা। আশা করছি এসে যাবে। না এলে আমাকেই যা করার করতে হবে। রিস্ক হবে ঠিকই, কিন্তু সেটা না নিয়ে উপায় নেই।
গভীর উদ্বেগের সুরে শেখরনাথ বললেন, আজ সকালের দিকে তির বিঁধেছে। সেই অবস্থায় সারাদিন কেটেছে, রাতটাও কাটবে। আমার কিন্তু একেবারেই ভালো মনে হচ্ছে না।
ডাক্তার চট্টরাজ বললেন, যাতে ইনফেকশন ছড়িয়ে না পড়ে সেজন্য দুটো ইঞ্জেকশন দেওয়া হয়েছে। রাত্তিরে আরও দুটো। দেওয়া হবে। একটাই সুলক্ষণ, ফুসফুসের ফাংশন বন্ধ হয়ে যায়নি। মোহনবাঁশি বেঁচে আছে, তবে চেষ্টা করেও জ্ঞান ফেরাতে পারিনি! ভাববেন না কাকা, আজকের রাতটা আমি হাসপাতালে মোহনবাঁশির কাছে থাকব। কোয়ার্টারে ফিরব না।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।