অন্য কোনও দিকে নজর ছিল না বিনয়ের। সে সামনের দিকে তাকিয়ে আছে। পলকহীন।
ঝিনুকদের জাহাজটা সিসোস্ট্রেস বে ছাড়িয়ে যেখানে গিয়ে পৌঁছেছে সেখানে একদিকে অফুরান বঙ্গোপসাগর; অন্য দিকে ছোট-বড় অনেকগুলি দ্বীপ। স্টিমশিপ সাগর এক সময় ছোট হতে হতে একটি আবছা বিন্দুর মতো দ্বীপগুলির আড়ালে। মিলিয়ে গেল।
উপসাগরের দিক থেকে বিকালে বা সন্ধেয় প্রবল হাওয়া উঠে আসে। আজও আসছিল। ঠান্ডা, আরামদায়ক বাতাস। বিনয়ের খেয়াল হল, অনেকক্ষণ সে পাহাড়ের ঢালের এই রাস্তাটায় দাঁড়িয়ে আছে। এর মধ্যে শেখরনাথ হয়তো ফিরে এসেছেন। তিনি বলে গিয়েছিলেন, বিনয় যেন আজ যতটা পারে সেলুলার জেলটা ঘুরে ঘুরে দেখে। ঘণ্টাখানেক বা ঘণ্টা দেড়েকের ভিতর বিশাল ওই বন্দিশালার কতটুকুই বা দেখা সম্ভব? পরে পুরো দু তিনটে দিন তাকে সঙ্গে নিয়ে যতগুলি ব্লক আছে সব দেখিয়ে দেবেন।
কিন্তু আজ প্রায় কিছুই দেখা হয়নি। অন্যমনস্কর মতো হাঁটতে হাঁটতে জেলের থমথমে ভীতিকর চেহারার গেট পেরিয়ে বিনয়। চলে এসেছিল বাইরের রাস্তায়। আর সেখানেই দেখা হয়ে গিয়েছে ঝিনুকের সঙ্গে। কতকালের চেনা এই ঝিনুক কিন্তু আজ মনে হল কত অচেনা। সে যেন অজানা গ্রহের কোনও মানুষ। অথচ তার সঙ্গে দেখা হোক, এই তীব্র বাসনাটা মনের কোনও নিভৃত কুঠুরিতে লুকিয়ে রেখেছিল, এমনকী ঝুমা তার কাছাকাছি এসে পড়ার পরও। কত দুঃখ, কত যাতনাইনা এই মেয়েটির জন্য সে সয়েছে৷ কিন্তু এরকম একটা দেখা হবে সে জন্য সে কি আদৌ প্রস্তুত ছিল? টের পাচ্ছিল উতরোল বুকের তলদেশে অবিরল শেল বিধে যাচ্ছে৷
ক্লান্ত, বিপর্যস্ত বিনয় আর দাঁড়াল না; ঢালু রাস্তার চড়াই বেয়ে বেয়ে ওপরে উঠে এল। তারপর সেলুলার জেলের গেট পেরিয়ে ভিতরে ঢুকে সোজা হাসপাতালের দোতলায়।
এখন চারদিকে আলো জ্বলছে।
একপাশে সারি সারি কুঠুরি; এক সময় যা ছিল কয়েদিদের সেল। সেগুলির সামনে দিয়ে টানা চওড়া রেলিংগুলি প্যাসেজ দোতলার এক মাথা থেকে বহুদূরে শেষ মাথা অবধি চলে গেছে।
প্যাসেজে খানিকটা পর পর বসার জন্য বেঞ্চি পাতা। কিছুক্ষণ আগে এখানে প্রচুর লোকজন থিক থিক করছিল। তারা ছিল ভিজিটর; হাসপাতালে ভরতি রোগীদের আত্মীয়স্বজন এবং বন্ধুবান্ধব। তাদের বেশিরভাগই চলে গিয়েছে, ভিড় এখন বেশ হালকা। এখানে-ওখানে সামান্য কয়েকজনকে দেখা যায়।
বিনয় যখন শেখরনাথের সঙ্গে নিচে নেমে যায় র স্ত্রী ছেলেমেয়েরা প্যাসেজের একটি বেঞ্চে যেমন বসে ছিল ঠিক তেমনি জড়সড় হয়ে বসে আছে। পাংশু, শীর্ণ, উৎকণ্ঠিত সারি সারি মুখ। শেখরনাথকে তাদের সঙ্গে কথা বলতে দেখা যাচ্ছে। জেফ্রি পয়েন্টের সেটলমেন্ট থেকে পুনর্বাসন দপ্তরের যে কর্মীরা কে ধরাধরি করে নিয়ে এসেছিল তারা শেখরনাথদের কাছাকাছি চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। একটা ফাঁকা বেঞ্চের উপর দুটো বড় ডেকচিতে ভঁই করা আটার রুটি আর আলু, কুমড়ো এবং নানারকম সবজি দিয়ে তৈরি ঘাট ছাড়াও রয়েছে শালপাতার একগোছা থালা।
বিনয় আন্দাজ করে নিল শেখরনাথ তার ভাইপো বিশ্বজিৎ রাহার সঙ্গে দেখা করে খাবারদাবার নিয়ে ফিরে এসেছেন। এতগুলি মানুষ সেই কোন সকালে মোহনবাঁশিকে নিয়ে হাসপাতালে ছুটে এসেছিল; সারাদিনে তাদের পেটে একফোঁটা জলও পড়েনি। খিদেয় নাড়ি চুঁইয়ে যাচ্ছে। একে দুর্ভাবনা, তার উপর সারাদিন না খাওয়া। ওরা যদি অসুস্থ হয়ে পড়ে– বিরাট সমসা। দেখা যাচ্ছে, শেখরনাথের সব দিকে নজর।
বিনয় ভেবেছিল, জারোয়াদের তিরে মারাত্মক জখম হওয়ার খবরটা পেয়ে বিশ্বজিৎ তক্ষুনি চলে আসবেন। কেননা ছিন্নমূল মানুষগুলির প্রতি তার কত যে সহানুভূতি! তিনি না আসায় রীতিমতো অবাকই হল বিনয়।
ওদিকে শেখরনাথের কথামতো পুনর্বাসনের একজন কর্মী শালপাতার থালায় রুটি-তরকারি সাজিয়ে মোহন বাঁশির স্ত্রী এবং ছেলেমেয়েদের দিকে বাড়িয়ে ধরল।
মোহনবাঁশির স্ত্রীর কপালের আধাআধি অবধি ঘোমটা টানা। করুণ সজল দৃষ্টিতে একবার শেখরনাথের দিকে তাকিয়ে তক্ষুনি চোখ নামিয়ে নিল। ছেলেমেয়েগুলি বোবার মতো তাকিয়ে রইল শুধু। তারা কেউ খাবারের থালাগুলি ধরল না। হাত গুটিয়ে সবাই বসে থাকে।
শেখরনাথ নরম গলায় বললেন, কী হল, নাও
ঢোক গিলে শুকনো গলায় মোহনবাঁশির স্ত্রী বলল, খাওনের ইচ্ছা নাই৷ জবর তরাস (ভয়) লাগতে আছে।
ছেলেমেয়েরা কিছু বলল না।
শেখরনাথ তাদের মনোভাব আঁচ করে নিয়েছেন। বললেন, ভয় পেলে চলবে? মনে জোর রাখতে হবে। ডাক্তারবাবু বলেছেন, মোহনর্বাশি বেঁচে যাবে। শেষ কথাগুলি সাহস দেওয়ার জন্য। ডাক্তার চট্টরাজ ঠিক এতখানি ভরসা দেননি। তিনি বলেছেন, মোহনবাঁশির প্রাণরক্ষার জন্য তারা সাধ্যমতো চেষ্টা করবেন। হয়তো লোকটা বেঁচে যাবে। তবে সবই নির্ভর করছে অপারেশনের পর। ব্যস, এটুকুই।
ডাক্তার চট্টরাজ যা বলেছেন হুবহু তা জানালে মোহনবাঁশির স্ত্রী ছেলেমেয়েরা আরও ভেঙে পড়বে। তারা কিছুতেই খাবে না; একরকম জোরজার করে নিজে তাদের হাতে খাবারের থালাগুলি ধরিয়ে দিলেন শেখরনাথখাও বলছি।
অনিচ্ছা সত্ত্বেও, নিঃশব্দে খাওয়া শুরু হল।
শেখরনাথ এবার পুনর্বাসন কর্মীদের দিকে ফিরলেন। সারাদিন তোমাদের যথেষ্ট ধকল গিয়েছে। না খাওয়া, না চান। তার উপর পাহাড়ি রাস্তায় ট্রাকের ঝাঁকুনি। নাও নাও, রুটিটুটি তুলে নিয়ে খেতে শুরু কর।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।