অনেক পীড়াপীড়ির পরও সেভাবে মেনে নিতে চায়নি ঝিনুক। তবু তার কথায় সামান্য একটু স্বীকারোক্তি যে ছিল না তা নয়। বলেছে, কখনও যদি তার নাম ঝিনুক থেকে থাকে কার কী এসে যায়? এই নামটার জন্য বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কোনও লাভ বা ক্ষতি কিছুই হবে না। পৃথিবী যেমন চলছে নিজের নিয়মে তেমনই চলবে। তার আহ্নিক গতি বার্ষিক গতিতে লেশমাত্র বিঘ্ন ঘটবে না।
অথচ একদিন বিনয়কে বাদ দিয়ে কিছুই ভাবতে পারত না ঝিনুক। তাকেই ব্যগ্রভাবে আঁকড়ে ধরেছিল। সেই চিরদুঃখী, আতঙ্কগ্রস্ত মেয়েটি আজ কী নিদারুণ উদাসীন, নির্বিকার, হয়তো একটু রূঢ়ও। অথচ তার জন্য কী না করেছে বিনয়? মহা সংকটের মধ্যে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে বুকের ভিতর আগলে আগলে তাকে পূর্ব পাকিস্তান থেকে সীমান্তের এপারে নিয়ে এসেছিল। কলকাতায় পৌঁছবার পর তার গায়ে এতটুকু আঁচড় না লাগে সে জন্য ঢালের মতো তাকে রেখেছে। তবু শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচাতে পারেনি। হেমনলিনী, অবনীমোহন এবং অন্যান্য আত্মীয়পরিজনরা অদৃশ্য আঙুল তুলে প্রতিটি মুহূর্তে বুঝিয়ে দিয়েছে– তুমি ধর্ষিতা, তুমি ধর্ষিতা, তোমার মধ্যে শুচিতা নেই, তুমি সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গিয়েছ। এসব যারা বলেছে তাদের কতজনের মুখ চাপা দিয়ে রাখা সম্ভব ছিল জড়িয়ে বিনয়ের পক্ষে? তারা কি জানে না ঝিনুকের জীবনে যে অঘটন ঘটে গিয়েছে সে জন্য তার দোষ কতটুকু?
ঝিনুককে নিয়ে বিনয় যখন দিশেহারা, চারপাশ থেকে একটা দিন এই আগুনের বলয় যখন মেয়েটাকে ঘিরে ধরছিল, তাকে বাঁচাবার জন্য সুধা আর হিরণ ছাড়া অন্য কারুকে পাশে পায়নি বিনয়। অনেকটাই করেছে বিনয়রা কিন্তু সেটা যথেষ্ট ছিল না। আনন্দ আর সুনীতির ইচ্ছা থাকলেও হেমনলিনীর দাপটে তাদের মুখ বুজে থাকতে হয়েছে।
ঝিনুক অপমানে, অভিমানে, তীব্র গ্লানিবোধে নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিল। সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু সে চলে যাওয়ার পর বিনয় কতটা কষ্ট পেয়েছে, চারদিক উথালপাতাল করে তাকে কত খুঁজেছে, কতদিন কত রাত তার উদভ্রান্তের মতো কেটেছে সেসব এতকাল পর ঝিনুককে কাছে পেয়ে বলতে চেয়েছিল বিনয় কিন্তু সে সুযোগ পাওয়া যায়নি। তার কোনও কথাই কানে সম্পূর্ণ তোলেনি ঝিনুক। চরম উদাসীনতায় তাকে রাস্তার মাঝখানে দাঁড় করেছে করিয়ে সে জাহাজঘাটার দিকে চলে গিয়েছিল। তার আচরণ এতটা কঠোর, এমন আবেগহীন হবে, কে ভাবতে পেরেছে!
দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল বিনয়ের। বুকের ভিতরটা যেন দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে। ঝিনুক এতটা বদলে যাবে, কোনও দিন কি তা সে কল্পনা করেছে! নিদারুণ যাতনার মধ্যে হঠাৎ খেয়াল হল যে অসুস্থ বৃদ্ধ এবং বৃদ্ধাটিকে নিয়ে ঝিনুক পোর্টব্লেয়ারের হাসপাতালে এসেছিল তাদের সঙ্গে তার যোগাযোগ ঘটল কী করে? এরা কারা? এদের খোঁজ কোথায় পেয়েছে সে? প্রথমটা এইসব প্রশ্নের তালকুল খুঁজে পাচ্ছিল না বিনয়। কেমন যেন ধন্দে পড়ে গেল। আচমকা বিদ্যুৎ চমকের মতো মনে পড়ে গেল নতুন ভারত-এ রিফিউজিদের জবরদখল কলোনিগুলি নিয়ে প্রতিবেদন লেখার জন্য কলকাতার চারপাশ যখন চষে বেড়াচ্ছে সেই সময় গড়িয়ার কাছাকাছি একটি কলোনির এক আধবুড়ো উদ্বাস্তু অধর ভুঁইমালীর কাছে খবর পেয়েছিল শিয়ালদহ স্টেশনে সে ঝিনুককে একজন বৃদ্ধের সঙ্গে বনগাঁ কিংবা কাঁচরাপাড়া লাইনের ট্রেনে উঠতে দেখেছে। অধর রাজদিয়া অঞ্চলের লোক। ছেলেবেলা থেকেই সে ঝিনুককে চেনে।
সমস্ত ব্যাপারটা এতদিনে জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গেল বিনয়ের কাছে। ভবানীপুরে প্রিয়নাথ মল্লিক, রোডের বাড়ি থেকে নিরুদ্দেশ হওয়ার পর ঝিনুক নিশ্চয়ই ঘুরতে ঘুরতে শিয়ালদহে চলে গিয়েছিল। সেখানেই খুব সম্ভব বৃদ্ধটির সঙ্গে তার দেখা হয়। বৃদ্ধটিও উদ্বাস্তু। ঝিনুক তাদের কাছে আশ্রয় পায়। তারপর পুনর্বাসনের জন্য যখন ছিন্নমূল মানুষদের আন্দামানে পাঠানো হয়, বৃদ্ধদের সঙ্গে ঝিনুকও এখানে চলে আসে।
বিনয় ঈশ্বরবিশ্বাসী কি না নিজের কাছেই সেটা পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তবু এই মুহূর্তে যে মেয়েটি তাকে ভেঙে খানখান করে দিয়ে চলে গেছে তার সম্বন্ধে তেত্রিশ কোটি অদৃশ্য দেবতার উদ্দেশ্যে বুঝি বা নিঃশব্দে জানাল; তোমাদের অপার করুণায় ঝিনুক একটি ভালো মানুষের হাতে গিয়ে পড়েছিল। দেশভাগের পর কলকাতায় হিংস্র সরীসৃপের মতো মেয়ের দালালেরা আর লুচ্চার পাল চারদিকে ওত পেতে আছে। অরক্ষিত কোনও উদ্বাস্তু যুবতীকে দেখলেই ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে পৌঁছে দিচ্ছে নরকের খাসতালুকে। ঝিনুকের সেই চরম দুর্ভাগ্য হয়নি। তোমরাই তাকে রক্ষা করেছ।
এদিকে বাঁ ধারে, অনেকটা দূরে, মাউন্ট হ্যারিয়েটের চুড়োটার ওপাশে সূর্য বেশ কিছুক্ষণ আগেই নেমে গিয়েছিল। দিনের শেষ মলিন আলোটুকু দ্রুত মুছে যাচ্ছে। ঝাপসা হালকা অন্ধকারের সঙ্গে নেমে আসছে ফিনফিনে কুয়াশা! আঁধারে কুয়াশায় ঢেকে যাচ্ছে বঙ্গোপসাগরের এই দ্বীপপুঞ্জ। যেটুকু আলো এখনও রয়েছে তাতে মাউন্ট হারিয়েটের মাথায় ধবধবে বিশাল ক্রশটা কিন্তু পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে।
শয়ে শয়ে সি-গাল পাখি সারাদিন সমুদ্রের উপর চক্কর দিয়ে বেড়ায়। এখন তারা ডানা ঝাঁপটে পাড়ের দিকে চলেছে। এটা তাদের ঘরে ফেরার সময়। সেই ভোর থেকে সূর্যাস্ত অবধি উপসাগরের জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে সার্ডিন, হাঙরের বাচ্চা কী ছোট ছোট চাদা মাছ ধারালো ঠোঁটে তুলে এনে খেয়েছে। পেট ভরতি। পরিতৃপ্ত সিন্ধুশকুনেরা নিত্যকর্ম সেরে এবার পাড়ের কোনও গাছের ডালে রাত কাটাবে। পরদিন সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ফের বেরিয়ে পড়বে উপসাগরের দিকে। সমস্ত দিন ধরে চলবে মাছ শিকার আর খাওয়া। পাখিগুলির পেটে রাহুর খিদে।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।