হঠাৎ স্নায়ুমণ্ডলীতে তীব্র একটা ঝাঁকুনি লাগল বিনয়ের। উদ্ভ্রান্তের মতো সেও ঢাল বেয়ে নামতে নামতে ডাকতে থাকে, ঝিনুক-ঝিনুক
নসিমুলরা দাঁড়িয়ে পড়েছিল। ততক্ষণে বিনয় তাদের কাছে চলে এসেছে। নসিমুল তাকে চিনতে পেরেছে। জিগ্যেস করল, ভাইসাব, আপ চাচাজিকা সাথ ভ্যানমে থে
তার কথাগুলো শুনতেই পেল না বিনয়। উতরোল আবেগে বুকের ভেতরটা তোলপাড় হয়ে যাচ্ছিল তার। যেন লক্ষ কোটি, বছর পর ঝিনুককে সামনাসামনি দেখল সে। কী যে কষ্ট, কত যে সুখানুভূতি! কাঁপা গলায় বলতে লাগল, ঝিনুক ঝিনুক-তুমি বাকিটা আর শেষ করা গেল না। গলা বুজে এল।
ফটকের সামনে খুব সম্ভব বিনয়কে লক্ষ করেনি ঝিনুক। সে প্রথমটা হকচকিয়ে যায়। তারপর ঠোঁট টিপে দাঁড়িয়ে থাকে। ভাবলেশহীন। বিনয়কে সে আগে কোনও দিন বুঝিবা দেখেনি। সম্পূর্ণ অপরিচিত।
কণ্ঠস্বর আবার ফিরে পেল বিনয়। তুমি ভবানীপুরের বাড়ি থেকে চলে আসার পর কলকাতা আর চারপাশে কত যে তোমাকে খুঁজেছি! দিনের পর দিন। সারা রাত ঘুমোতে পারিনি, মনে হত যন্ত্রণায় মৃত্যু হবে। কিন্তু মরতেও পারিনি।
সেই একদিন বুকের ভেতর আগলে আগলে বিনয় পূর্ব পাকিস্তান থেকে যে মেয়েটিকে কলকাতায় নিয়ে এসেছিল দুঃখে গ্লানিতে আতঙ্কে সে একেবারে শীর্ণ হয়ে গিয়েছিল। সেই ঝিনুক আর নেই। ঝলমলে স্বাস্থ্যে, লাবণ্যে সে এখন পরিপূর্ণ যুবতী।
ঝিনুক উত্তর দিল না। বিনয় যেন কথাগুলো তাকে নয়, অন্য কারওকে বলছে। উদাসীন মুখে ঝিনুক সমুদ্র, সি-গাল পাখি, আকাশ দেখতে থাকে।
উদ্বেল স্বরে বিনয় জিগ্যেস করে, খিদিরপুর ডকে আবছাভাবে তোমাকে যখন দেখি, মনে হয়েছিল হয়তো তুমি নও। তারপর রস আইল্যান্ডেও দেখলাম। অত মানুষের ভিড়ে তেমন ভালো করে নয়। কিন্তু চলুঙ্গা জাহাজে স্পষ্ট দেখতে পেলাম। একই জাহাজে এতদূরে এসেছি, তুমি কি আমাকে দেখতে পাওনি ঝিনুক?
বৃদ্ধ এবং বৃদ্ধা বিমূঢ়ের মতো তাকিয়ে ছিল।
বৃদ্ধটি এবার বলল, বাবা, আপনে কারে ঝিনুক কইতে আছেন?
ঝিনুকের দিকে আঙুল বাড়িয়ে দিল বিনয়। একে—
আপনের ভুল অইছে বাবা। ও ঝিনুক না– সীতা।
বিনয় বুঝতে পেরেছে, নিরুদ্দেশ হবার পর ঝিনুক নাম পালটে ফেলেছে। সে জোর দিয়ে বলল, সীতা না, ও ঝিনুকই।
এতক্ষণে মুখ খুলল ঝিনুক, না, আমি সীতাই।
তুমি ঠিক বলছ না।
বিনয়ের চোখে চোখ রেখে ঝিনুক বলল, যদি আমি ঝিনুকই হই, কী এসে যায়? এই পৃথিবীর কোনও ক্ষতি বৃদ্ধি হবে না। বৃদ্ধ এবং বৃদ্ধার দিকে ফিরল সে। মাসিমা মেসোমশাই চলুন, সন্ধে হয়ে আসছে, বাড়ি ফিরতে অনেক রাত হয়ে যাবে।
দলটা নেমে যেতে লাগল। চলতে চলতেই নসিমুল, রহমান, বৃদ্ধা ও বৃদ্ধ বার বার পেছন ফিরে বিনয়কে দেখতে লাগল। ঝিনুক ফিরেও তাকাল না।
বিনয় দাঁড়িয়েই আছে, দাঁড়িয়েই আছে। হতবুদ্ধি। বিহ্বল। এতকাল খোঁজাখুঁজির পর এ কোন ঝিনুককে দেখল বিনয়? যে মেয়েটা ছিল সারাক্ষণ ত্রস্ত, সারাক্ষণ আতঙ্কগ্রস্ত, এক পলক তাকে না দেখলে কী যে ব্যাকুল হয়ে পড়ত তার ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছে অন্য এক নারী। দৃঢ়, অবিচল, কঠিন।
বিহ্বলতা কাটলে বিনয় অদ্ভুত এক ঘোরের মধ্যে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলতে লাগল, আজ তুমি আমার সঙ্গে ভালো করে কথা বললে না। না চেনার ভান করলে। কিন্তু তোমার ঠিকানা মোটামুটি জেনে গেছি। খুব শিগগির আমি মিডল আন্দামানে যাব। দেখব সেদিন আমাকে চিনতে পার কি না।
ঝিনুক এবারও তার দিকে তাকাল না।
দাঁড়িয়ে থাকতে বিনয়ের মনে হল, অসহ্য কষ্টে, তীব্র যাতনায় মাথার শিরা-স্নায়ু ছিঁড়ে ছিঁড়ে পড়ছে, বুকের ভেতরের কোথায় যেন অবিরল রক্তক্ষরণ হচ্ছে।
দিনের আলো কমে গিয়েছিল। ঝাপসা আঁধারে একসময় দেখা গেল ঝিনুকরা এস এস সাগর-এ উঠে পড়েছে। একটু পর ভোঁ বাজিয়ে উপসাগরকেচকিত করে জাহাজ চলতে শুরু করল।
দ্বিতীয় পর্ব সমাপ্ত
৩.০১ সেলুলার জেলের বাইরে
কয়েকদিন আগে ‘রস’ আইল্যান্ড থেকে ‘চলুঙ্গা’ জাহাজে মিডল আন্দামানে চলে গিয়েছিল ঝিনুক। আজ যাচ্ছে এস এস সাগর-এ। কলকাতা এবং তার চারপাশের জনারণ্যে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস এই মেয়েটিকে খুঁজে বেড়িয়েছে বিনয় কিন্তু বৃথাই। তারপর একদিন ধীরে ধীরে সমস্ত আবেগ, সমস্ত উৎকণ্ঠা যখন থিতিয়ে এসেছে, তীব্র ব্যাকুলতা যখন জুড়িয়ে গিয়েছে, ঝিনুকের মুখ, তার স্মৃতি যখন ক্রমশ ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল সেই সময় তাকে স্পষ্টভাবে দেখা গেল রস আইল্যান্ডে। কিন্তু তা দূর থেকে। তখন কিছুই করার ছিল না।
আর আজ? আজ এই সেলুলার জেলের বাইরে, সমুদ্রের দিকে যাওয়ার ঢালু রাস্তায় কত আলোকবর্ষ পরে কয়েক লহমার জন্য ঝিনুককে সামনাসামনি পাওয়া গিয়েছিল। সঙ্গে সঙ্গে হৃৎপিণ্ড তোলপাড় হয়ে যাচ্ছিল বিনয়ের। কিন্তু আশ্চর্য, প্রথমটা তাকে চিনতেই পারেনি ঝিনুক। কথাটা ঠিক হল না। চিনতে চায়নি। সমস্ত অতীত মুছে দিয়ে নিজের নামটাও বদলে ফেলেছে। রাজদিয়ার সেই জাপানি পুতুলের মতো মেয়েটা তার চোখের সামনে ক্রমশ কিশোরী, তারপর পূর্ণ যুবতী হয়ে উঠেছে। কখন যে জীবনের পরতে পরতে মিশে গিয়েছে অচ্ছেদ্য বন্ধনে, যা গিয়েছে তার প্রতি মুহূর্তের শ্বাসবায়ুতে, নিজেও টের পায়নি বিনয়। সেই ঝিনুক তার পুরনো জীবনটা পুরোপুরি বাতিল দিয়ে হয়ে উঠেছে সীতা। ঝিনুক বলে কেউ যেন কোনও পৃথিবীতে ছিল না।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।