তাঁকে থামিয়ে দিয়ে শেখরনাথ বললেন, এখন বসার সময় নেই৷ কী কারণে হাসপাতালে আসা, সংক্ষেপে তা জানিয়ে দিলেন। সেই জেফ্রি পয়েন্ট থেকে নিয়ে আসতে হয়েছে। লোকটা খুব সম্ভব বেঁচে আছে। শিগগির ভর্তির ব্যবস্থা কর।
তক্ষুনি তৎপরতা শুরু হয়ে যায়। ডাঃ চট্টরাজ একে ওকে ডেকে স্ট্রেচার, একজন জুনিয়র ডাক্তার এবং একজন নার্সকে নিচে পাঠিয়ে দেন। পাঁচ মিনিটের ভেতর মোহনবাঁশিকে দোতলাতেই এমার্জেন্সি ডিপার্টমেন্টে ভর্তি করে নেওয়া হয়। বাইরের করিডরে অপেক্ষা করতে থাকেন শেখরনাথ এবং বিনয়। তাদের সঙ্গে উৎকণ্ঠিত মোহনবাঁশির ছেলেমেয়ে বউ আর পুনর্বাসনের কর্মীরা।
ডাঃ চট্টরাজ এমার্জেন্সিতে মোহনর্বাশিকে দেখতে গিয়েছিলেন। মিনিট দশেক পর বেরিয়ে এসে বললেন, কেসটা ক্রিটিক্যাল। প্রথমে তিরটা বার করতে হবে। তারপর বড় একটা অপারেশন। অন্তত পনেরোকুড়ি দিন হাসপাতালে থাকতে হবে। আশা করি, বাঁচাতে পারব।
ডাঃ চট্টরাজের দুই হাত ধরে গভীর স্বরে শেখরনাথ বললেন, যেভাবে তোক বাঁচাতে চেষ্টা কর।
আমাদের চেষ্টার কোনও ত্রুটি হবে না কাকা। আন্দামানের আরও অজস্ৰজনের মতো ডাঃ চট্টরাজও শেখরনাথকে কাকা বলেন।
শেখরনাথ তাঁর সঙ্গীদের দেখিয়ে বললেন, এঁরা মোহনবাঁশির বউ ছেলেমেয়ে আর রিহ্যাবিলিটেশনের এমপ্লয়ি। তারপর বিনয়কে কাছে টেনে এনে জিজ্ঞেস করলেন, এঁকে কি তুমি চেন?
ডাঃ চট্টরাজ কয়েক পলক বিনয়কে লক্ষ করলেন। তারপর বললেন, মুখটা চেনা চেনা লাগছে। ঠিক
ও কলকাতার একজন সাংবাদিক। বিনয়। রিফিউজিদের সঙ্গে এখানকার সেটেলমেন্ট দেখতে এসেছে।
এইবার মনে পড়ে গেল। ডাঃ চট্টরাজ বিনয়ের কাঁধে একটা হাত রেখে বললেন, রস আইল্যান্ডে রাহা সাহেব আপনার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন। অ্যাম আই রাইট?
বিনয় হেসে হেসে বলল, ওয়ান হানড্রেড পারসেন্ট।
উত্তর দিতে যাচ্ছিলেন ডাঃ চট্টরাজ। তার আগেই শেখরনাথ বলে উঠলেন, সেই সকালে আমরা বেরিয়েছি। আর্টটা নাগাদ চা আর রুটি ছাড়া এখন অব্দি কারও পেটে একফোঁটা জল পড়েনি। সবার জন্য কিছু খাবার নিয়ে আসি। তাছাড়া একটা শিপিং কোম্পানি থেকে গাড়ি নিয়ে চ্যাথাম থেকে মোহনবাঁশিকে এখানে এনেছি। গাড়িটা এক্ষুনি তাদের ফেরত দিতে হবে। বিশুকেও মোহনবাঁশির খবরটা দেওয়া দরকার। আমি মিনিট চল্লিশেকের ভেতর চলে আসছি।
বিনয় জিগ্যেস করল, কাকা, আমি কি আপনার সঙ্গে যাব?
একটু ভেবে শেখরনাথ বললেন, না, তুমি এখানেই থাক। সেলুলার জেলটা যতটা প্রার, দেখ। পরে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সমস্ত দেখাব।
মোহনবাঁশির বউ ছেলেমেয়েদের ভরসা দিয়ে বললেন, কোনও ভয় নেই। কেউ কান্নাকাটি কোরো না।
ডাঃ চট্টরাজ তার চেম্বারে চলে গেলেন। বিনয় শেখরনাথের সঙ্গে নিচের চত্বরে নেমে এল। বাকি সকলে এমার্জেন্সি বিভাগের সামনের করিডরে কয়েকটা বেঞ্চে বসে রইল।
নিচে এসে শেখরনাথ সেই ভ্যানটায় উঠে পড়লেন। সঙ্গে সঙ্গে গাড়িটা স্টার্ট দিয়ে ফটকের দিকে ছুটল।
হাসপাতালের ব্লকটার ঠিক উলটো দিকে একই মাপের একই চেহারার বিশাল একটা ব্লক। একতলা থেকে তেতলা অব্দি লাইন দিয়ে কত যে সেল। সেসব দেখতে দেখতে পুরানো ভাবনাটা আবার ফিরে আসে। শত আলোকবর্ষ পেরিয়ে ইতিহাসের সেই উথালপাতাল দিনগুলোতে ফিরে গেল বিনয়। সারা দেশ জুড়ে, বিশেষ করে বাংলায় সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামীরা ঝাঁপিয়ে পড়েছে ইংরেজদের ওপর। বাতাসে তখন বারুদের গন্ধ। চলছে গুলি, বোমা, ট্রেন,ডাকাতি। মরণজয়ী বিপ্লবীরা পণ করেছে ভারতবর্ষ থেকে ব্রিটিশ শাসন উৎখাত করবেই।
ওদিকে যাদের রাজত্বে কোনওদিন সূর্যাস্ত হয় না, সেই ব্রিটিশ প্রশাসন হাত গুটিয়ে বসে রইল না। তাদের বন্দুকের নল থেকে পালটা গুলি ছুটে গেল ঝুঁকে ঝাকে। চলল ধরপাকড়। চলল চরম দমননীতি। শত শত বিপ্লবীতে ভরে গেল কয়েদখানাগুলো। তাদের অনেককে ফাঁসিতে ঝোলানো হল। অনেককে নির্বাসন দেওয়া হল আন্দামানে।
ব্লকের ভেতরে ঢোকেনি বিনয়। সামনের রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ভাবতে চেষ্টা করছিল কোন সেলে ছিলেন উল্লাসকর দত্ত, কোনটায় সাভারকার ভাইরা, কোনটায় গণেশ ঘোষ, কোনটায় উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়।
চলতে চলতে কখন যে ফটকের কাছাকাছি চলে এসেছে। খেয়াল নেই। পুরানো দিনের ইতিহাসে মগ্ন হয়ে ছিল বিনয়।
হঠাৎ একটি মেয়ে-গলা কানে এল। আস্তে আস্তে। বুড়োমানুষ, জোরে জোরে কি পা ফেলতে পারে?
চেনা কণ্ঠস্বর। লহমায় আচ্ছন্নতা কেটে যায় বিনয়ের। ব্যগ্রভাবে একটু কাত হয়ে তাকাতেই পা থেকে মাথা অব্দি সমস্ত শরীরে তড়িৎপ্রবাহ খেলে যায় ঝিনুক। একটি বৃদ্ধের একখানা হাত ঝিনুকের কাঁধে। ঝিনুক তার পিঠটা নিজের হাতে বেড় দিয়ে আছে। বৃদ্ধের অন্য হাতটা ধরে আছে নসিমুল। পেছন থেকে ধরে রয়েছে একটি যুবক। নিশ্চয়ই এস এস সাগর-এর স্টোকার। আরও একজন বৃদ্ধাও রয়েছে। তিনি খুব সম্ভব বৃদ্ধটির স্ত্রী। নসিমুল এদের জন্যই তাহলে গেটের কাছে অপেক্ষা করছিল।
বিহ্বলের মতো দাঁড়িয়ে থাকে বিনয়। কী করবে সে যেন ভেবে পায় না।
ওদিকে বৃদ্ধকে নিয়ে ঝিনুকরা ফটক থেকে খানিক দূরের ঢাল বেয়ে নিচে নেমে এসেছে। আরও মিনিট কয়েক হাঁটলেই সিসোস্ট্রেস বের কিনারে জেটিটায় পৌঁছে যাবে।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।