স্বাধীনতার পর দিনকাল বদলে গেছে। ফটক এখন হাট করে খোলাই থাকে। বন্দুকওয়ালা পুলিশবাহিনী তো দূরের কথা, একজন গার্ডও চোখে পড়ল না।
এখান থেকে অনেকটা নিচে ঘোড়ার খুরের আকারে সিসোস্ট্রেস বে-টাকে দেখা যাচ্ছে। তার ওধারে রস আইল্যান্ড। কিছুদিন আগে উদ্বাস্তুদের সঙ্গে এস এস মহারাজা জাহাজে নেমেছিল বিনয়। সেখান থেকে ছোট মোটর বোটে এসেছিল পোর্ট ব্লেয়ারে।
ফটক দিয়ে ভ্যানটা ঢুকতে যাবে, কেউ ডেকে উঠল, আদাব চাচাজি—
লোকটাকে দেখতে পেয়েছিলেন শেখরনাথ। একটু অবাক হলেন। ব্যস্তভাবে ড্রাইভারকে ভ্যান থামাতে বলে লোকটার দিকে তাকালেন।-নসিমুল, তুমি এখানে?
মায়াবন্দর থেকে তোমাদের কোম্পানির জাহাজ নিয়ে এসেছ নাকি?
জি। একটু কাত হয়ে তেরছাভাবে ডান হাতের তর্জনীটা বাড়িয়ে দিল।
সেলুলার জেল যে টিলাটার মাথায় ঠিক তার পেছন দিয়ে সিসোস্ট্রেস বে বা উপসাগর ঘোড়ার খুরের আকারে পশ্চিম থেকে পুবে চলে গেছে। সেটার পাড়ে পোর্ট ব্লেয়ারের গা ঘেঁষে একটা জেটি। সেখানে একটা ছোট জাহাজ দাঁড়িয়ে আছে। এস এস সাগর। নসিমুলের আঙুল সেটার দিকে। তার ঠিক উলটো দিকে উপসাগরের ওপারে রস আইল্যান্ড। বিনয়ের খুবই পরিচিত এলাকা। এই তো সেদিন মহারাজা জাহাজে চেপে কয়েক শো রিফিউজি ফ্যামিলির সঙ্গে এসে নেমেছিল।
নসিমুলের বয়স পঞ্চাশবাহান্ন। তামাটে রং। মাঝারি হাইটের মজবুত চেহারা। লম্বাটে মুখে বসন্তের দাগ, মাথায় কাঁচাপাকা চুল। পরনে ঢোলা নীলচে ফুলপ্যান্ট আর সাদা শার্ট। লোকটা এবার জানাল, কয়েকদিন আগে তারা এখানে এসেছে। আজই মায়াবন্দর ফিরে যাবে। তবে রাহাসাহেব অর্থাৎ বিশ্বজিৎ তাঁদের অনুরোধ করেছেন সপ্তাহখানেক আগে মধ্য আন্দামানের একজন বৃদ্ধ রিফিউজি ভীষণ অসুস্থ হয়ে পোর্ট ব্লেয়ারের হাসপাতালে এসে ভর্তি হয়েছিল। তার সঙ্গে পরিবারের দুজন এসেছে। বৃদ্ধ এখন রোগমুক্ত। তাকে আজ রিলিজ করে দেওয়া হবে। নসিমুলরা উত্তর আন্দামানের মায়াবন্দর যাবার পথে যেন এই উদ্বাস্তু পরিবারটিকে মিডল আন্দামানে নামিয়ে দিয়ে যায়। সেজন্য এস এস সাগর-এর বয়লারে যে কয়লা দেয় সেই স্টোকার রহমানকে হাসপাতালে পাঠিয়ে এখানে অপেক্ষা করছে নসিমুল। রহমানরা চলে এলে সে বৃদ্ধদের নিয়ে গিয়ে সে জাহাজ ছেড়ে দেবে।
ঠিক আছে, আবার দেখা হবে। আমার সঙ্গে একজন জখম লোক রয়েছে। তাকে এক্ষুনি হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। আচ্ছা চলি
আদাব
শেখরনাথ হাত তুলে প্রতিনমস্কার জানালেন। ভ্যানওলাকে বললেন, চল– কথা বলতে বলতে তিনি লক্ষ করেছিলেন বিনয় পলকহীন নসিমুলের দিকে তাকিয়ে আছে। নিশ্চয়ই নসিমুল সম্পর্কে তার খুবই কৌতূহল হচ্ছে। তাকে বললেন, পোর্টব্লেয়ার থেকে একশো মাইল দূরে উত্তর আন্দামানের মায়াবন্দরে দত্তদের স-মিল এবং সামুদ্রিক শেল অর্থাৎ শঙ্খ, কড়ি, টার্বো, ট্রোকার্সের ফলাও কারবার। বাঙালি কোম্পানি সারা পৃথিবীতে তারা শেল চালান দেয়। তাদের দু দুটো জাহাজও রয়েছে। এস এস সাগর তো এই মুহূর্তে জেটিতে বাঁধা রয়েছে। অন্যটার নাম এস এস বরুণ।
ভ্যান ফটক পেরিয়ে বিরাট এক চত্বরে এসে পড়েছিল। কোনাকুনি খানিকটা গিয়ে একটা লম্বা ব্লকের সামনে এসে থেমে গেল। সেখানে দোতলার হাইটে মস্ত বোর্ডে লেখা: আন্দামান অ্যান্ড নিকোবর হসপিটাল।
শেখরনাথের শেষ কথাগুলো শুনতে পাচ্ছিল না বিনয়। সেলুলার জেলের চৌহদ্দিতে ঢোকার পর থেকে সারা শরীর ছমছম করছে। ছেলেবেলায় রাজাজিয়ায় থাকার সময় ভারতের বাস্তিল এই জেলখানা সম্পর্কে কত বিভীষিকা, কত আতঙ্কের কাহিনিই না শুনেছে সে। শত শত বিপ্লবী থেকে সাধারণ কয়েদিকে অকথ্য অত্যাচারে পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছে। অনেকে নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে উন্মাদ হয়ে গেছে। ব্রিটিশ পুলিশ কতজনকে যে এই কয়েদখানায় ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে দিয়েছে তার লেখাজোখা নেই। আচ্ছন্নের মতো তিনদিকের উঁচু উঁচু দালানে অগুনতি সেলগুলো দেখতে থাকে বিনয়।
এদিকে ভ্যানটা থামতেই শেখরনাথ নেমে পড়েছিলেন। ব্যস্তভাবে বিনয়কে তাড়া দিলেন, চলচল আমার সঙ্গে। অন্যদের গাড়িতেই অপেক্ষা করতে বললেন।
হাসপাতালের তেতলা বিল্ডিংটার মাঝামাঝি জায়গা থেকে ওপরে ওঠার সিঁড়ি। এপাশে ওপাশে সারি সারি যে কুঠুরিগুলোতে ইংরেজ আমলে কয়েদিদের আটকে রাখা হত, এখন সেগুলোতে রোগীদের জন্য বেড় পাতা। এখন ভিজিটিং আওয়ার্স চলছে। পেশেন্টদের ঘিরে বসে আছে তাদের বাড়ির লোকজন।
বিনয়কে সঙ্গে করে সিঁড়ি ভেঙে দোতলায় চলে এলেন শেখরনাথ। নিচের তলার মতো এখানেও কুঠুরিতে কুঠুরিতে রোগীদের পাশে তাদের আত্মীয়স্বজন।
সেলগুলোর সামনে দিয়ে পনেরো ফিটের মতো চওড়া করিডর বহুদূরে শেষ প্রান্ত অব্দি চলে গেছে। দু চারজন নার্স, অ্যাপ্রন-পরা। জুনিয়র ডাক্তার এবং হাসপাতালের কর্মীদের দেখা যাচ্ছে।
সিঁড়ির ডানপাশে একটু এগুতেই দেখা গেল দেওয়ালের গায়ে পেতলের ঝকঝকে প্লেটে লেখা আছে: ডাঃ পি. চট্টরাজ। চিফ মেডিক্যাল অফিসার।–
দরজার সামনে দামি পরদা ঝুলছে। বাইরে থেকে শেখরনাথ গলার স্বর সামান্য উঁচুতে তুলে ডাকলেন, প্রণবেশ-প্রণবেশ আমি শেখরকাকা-ভেতরে আসতে পারি?
ডাঃ চট্টরাজ নিজেই উসে এঠে পরদা সরিয়ে বললেন, আপনি! আসুন, আসুন, ভেতরে

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।