লঞ্চে বেশ ভিড় ছিল। বিশ্বজিতের সঙ্গে উদ্বাস্তুদের নতুন সেটেলমেন্টে যাবার সময় যেমন বর্মি কারেন শিখ এমনি ইন্ডিয়ার নানা প্রভিন্সের প্যাসেঞ্জার দেখা গিয়েছিল, এখনও ঠিক তেমনটাই চোখে পড়ল। বিনয় আন্দাজ করে নিল এদের বেশিরভাগই ব্রিটিশ আমলের কয়েদি। কালাপানির সাজা খাটতে আন্দামানে এসেছিল। মুক্তি পাওয়ার পর স্বাধীন ভারতের নাগরিক। শেখরনাথকে দেখে তারা অনেকে এগিয়ে এসে সসম্ভ্রমে মাথা ঝুঁকিয়ে বলে, আদাব চাচাজি, কেউ বলে, নমস্তে–মোহনবাঁশিকে ডেকে শুইয়ে রাখা হয়েছিল। তার দিকে তাকিয়ে প্রাক্তন কয়েদিরা খুব একটা অবাক হল না।
একজন মোহনবাঁশিকে দেখিয়ে শেখরনাথকে জিগ্যেস করল, জরুর পাকিস্তানকা রিফিউজি-হ্যায় না চাচাজি? উদ্বাস্তুদের চেহারায় মার্কামারা একটা ছাপ থাকে, এতদিনে এখানকার পেনাল সেটেলমেন্টের পুরানো বাসিন্দারা তা চিনে ফেলেছে।
শেখরনাথ আস্তে মাথা নাড়লেন, হ্যাঁ।
গভীর জঙ্গলের খাঁজে কোথায় কোথায় উদ্বাস্তুদের উপনিবেশ গড়ে উঠছে, কোথায় জারোয়ারা তাদের পড়োশি, এবং এই আদিম জনজাতিটি কতটা হিংস্র, সব তাদের জানা। লোকটি বলল, জরুর জারোয়ারা তির মেরেছে!
এবারও শেখরনাথ আস্তে মাথা নাড়েন।-হ্যাঁ।
ওহি জংলি লোগ বহুৎ খতরনাক। রিফিউজিদের হেঁশিয়ারি থাকা দরকার। বলে লোকটা জানতে চাইল, তার এবং তার সঙ্গীদের কোনওরকম সাহায্যের প্রয়োজন আছে কি না?
শেখরনাথ জানালেন, প্রয়োজন নেই। তার সঙ্গে লোক আছে। বেশিক্ষণ লাগল না; মিনিট পনেরোর ভেতর সিগাল উপসাগর পেরিয়ে ও পারে পোর্ট ব্লেয়ারের চ্যাথাম জেটিতে গিয়ে ভিড়ল।
তড়বড় করে অন্য প্যাসেঞ্জাররা নেমে যাবার পর শেখরনাথদের সঙ্গে পুনর্বাসনের যে কর্মীরা এসেছিল, ধরাধরি করে তারা মোহনবাঁশিকে নামিয়ে জেটিতে শুইয়ে দিল। জানতে চাইল, এবার কী করতে হবে।
শেখরনাথ বললেন, এখান থেকে হাসপাতালে যেতে হলে একটা গাড়ির ব্যবস্থা করতে হবে। তোমরা একটু বসো। দেখি কোথায় পাওয়া যায়–
জেটির বাইরের রাস্তায় ছোট ছোট প্রাইভেট শিপিং কোম্পানির দু-তিনটে অফিস। শেখরনাথ বিনয়কে সঙ্গে করে সেখানে চলে এলেন।
শেখরনাথকে এইসব কোম্পানির লোকেরা ভালোই চেনে। শ্রদ্ধাও করে। একটা অফিস থেকে জানানো হল, তাদের একটা জিপ এবং একটা ভ্যান কিছুক্ষণ আগে বেরিয়ে গেছে। বিব্রতভাবে ম্যানেজার বলল, কাকা, এখন কিছুই দিতে পারছি না। দু ঘণ্টা পর গাড়ি দুটো ফিরলে নিশ্চয়ই দেব।
শেখরনাথ জানালেন, যে মারাত্মকভাবে জখম লোকটিকে জেফ্রি পয়েন্ট থেকে নিয়ে আসা হয়েছে তাকে অতটা সময় ফেলে রাখা যাবে না।
দ্বিতীয় শিপিং অফিস থেকে একটা লম্বা ভ্যান পাওয়া গেল। তবে ঘণ্টা দেড়েকের ভেতর সেটা ফিরিয়ে দিতে হবে।
শেখরনাথ বললেন, অতটা সময় লাগবে না। তার আগেই ফিরিয়ে দেব।
ভ্যানটা লম্বা তো বটেই, ভেতরে অনেকটা জায়গা রয়েছে। মোহনবাঁশিকে তুলে পেছন দিকের পাটাতনে শুইয়ে তার। চারপাশে একটু ঘেঁষাঘেঁষি করে বাকি সবাই বসল। বিনয়কে নিয়ে ড্রাইভারের পাশে বসেছেন শেখরনাথ। শিপিং কোম্পানিটা থেকে ড্রাইভারও দেওয়া হয়েছিল।
গাড়ি ছুটল উঁচুনিচু সড়ক ধরে। এই এলাকাগুলো বিনয়ের চেনা। এই রাস্তা দিয়েই কিছুদিন আগে বিশ্বজিতের সঙ্গে চ্যাথামে এসেছিল সে। তবে হাসপাতাল কোথায় সে জানে না। পোর্টের চৌহদ্দি ছাড়িয়ে হ্যাঁডো, ডিলানিপুর, ফুদ্দি চাউঙ, মিডল পয়েন্ট, এবারডিন মার্কেট পেছনে ফেলে বাঁ দিকের মোড় ঘুরে অন্য একটা রাস্তায় এসে পড়ল ভ্যানটা। রাস্তাটা খাড়াই বেয়ে উঁচু টিলার দিকে চলেছে। আর টিলার মাথায় বিশাল দৈত্যের মতো দাঁড়িয়ে আছে সেলুলার জেল।
বিনয় বুঝতে পারছে না, ভ্যানটা কেন জেলখানার দিকে চলেছে। শেখরনাথকে তা জিগ্যেস করে ফেলল।
চড়াই ভাঙছে, তাই ভ্যানের গতি অনেক কমে গেছে। শেখরনাথ বুঝিয়ে দিলেন। সেলুলার জেলের মাঝখানে রয়েছে একটা বিরাট উঁচু টাওয়ার। একসময় সাতটা মস্ত মস্ত তেতলা বিল্ডিং সেটার সাতদিকে চলে গেছে। এই সাতটা বিল্ডিংয়ে ছিল সবসুদ্ধ হাজারখানেক সেল বা কয়েদিদের আটকে রাখার কুঠুরি। দুটো টাওয়ার ভূমিকম্পে ভেঙে যায়, একটা জাপানি বোমায় ধংস হয়েছে। বাকি চারটে এখনও অটুট। এই ব্লকের একটায় এখন লোকাল জেল, একটায় হাসপাতাল। অন্য দুটোয় মিউজিয়াম। ব্রিটিশ আমলে বিপ্লবীরা কে কোন কুঠুরিতে ছিলেন, কীভাবে তাদের এবং সাধারণ অন্য সব কয়েদির ওপর নির্মম নির্যাতন চালানো হত তার কিছু কিছু স্মারক ওই ব্লক দুটোয় সংরক্ষণ করা আছে। ভ্যান সেলুলার জেলের সামনে চলে এসেছিল। ঢোকার মুখ প্রথমেই গম্ভীর, থমথমে, ভয়ংকর গোলাকার চেহারার একজোড়া টাওয়ার। দুটোর দূরত্ব তিরিশ চল্লিশ ফিটের মতো। জোড়া টাওয়ারের মাঝামাঝি জায়গায় খানিকটা উঁচুতে দোতলা সমান হাইটে লম্বা করিডর। সেটা টাওয়ার দুটো জুড়ে রেখেছে। তার তলায় লোহার মজবুত ফটক। এটা দিয়েই যাতায়াত করতে হয়।
ফটকের দুটো পাল্লা খোলা রয়েছে। বিনয় কার একটা লেখায় পড়েছে ব্রিটিশ আমলে চব্বিশ ঘণ্টা রাইফেল হাতে খাস ইংরেজ পুলিশের একটা বাহিনী চব্বিশ ঘণ্টা ফটকের সামনে টহল দিতে দিতে নজরদারি চালাত। তাদের চোখে ধুলো ছিটিয়ে একটা মাছিও গলতে পারত না।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।