আজ সকালে অন্য দিনের মতোই জমিতে গিয়েছিল উদ্বাস্তুরা। উত্তর-পূর্ব দিকে মোহনবাঁশি কর্মকার তার বউ ছেলেমেয়ে নিয়ে তার জমির জলডেঙ্গুয়ার ঝাড় সাফ করছিল। আচমকা ওধারের জঙ্গল ফুড়ে, বুশ পুলিশের নজর এড়িয়ে এক দঙ্গল কালো কালো জারোয়া তির-ধনুক নিয়ে হানা দিল। বেশ কয়েকদিন আগে, বিশ্বজিৎ তখন জেফ্রি পয়েন্টে ছিলেন, জারোয়ারা মাঝরাতে হামলা চালিয়েছিল। আজ একেবারে প্রকাশ্য দিবালোকে।
অদ্ভুত আওয়াজ করে, দুর্বোধ্য ভাষায় গজরাতে গজরাতে তারা এলোপাতাড়ি তির ছুঁড়তে থাকে। চোখেমুখে তাদের প্রচণ্ড আক্রোশ।
তিরগুলো এধারে ওধারে উড়ে যাচ্ছিল। তবে একটা এসে লাগল মোহনবাঁশির বুকের ডান পাশে। চারপাশের জমিতে যারা কাজ করছিল তারা তুমুল হুলস্থুল বাধিয়ে দিল। সবাই আতঙ্কগ্রস্ত। কেউ কেউ উদভ্রান্তের মতো ক্যাম্পের দিকে দৌড়াতে থাকে। ওদিকে বুশ পুলিশও পেরিমিটার রোডের উঁচু উঁচু টঙ থেকে জারোয়াদের দেখতে পেয়েছিল। তারা টিন বাজাতে বাজাতে তুমুল হইচই বাধিয়ে দেয়। সেই সঙ্গে আকাশের দিকে বন্দুক তুলে ফায়ার করতে থাকে।
লহমায় জারোয়ারা গভীর জঙ্গলে উধাও হয়ে যায়। বিনয় আর শেখরনাথ উত্তর দিকের একটা জমিতে ছিলেন। বহু মানুষের চিৎকার শুনে দৌড়ে মোহনবাঁশিদের কাছে চলে আসেন। ওদিকে জমি মাপামাপি বন্ধ করে লা ডিনরা দৌড়ে এসেছে।
মোহনবাঁশির বুকে তিরটা অনেকখানি ঢুকে গেছে। সে বেহুঁশ মাটিতে পড়ে আছে। তিরের ফলার পাশ দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত বেরিয়ে আসছে। তাকে ঘিরে তার বউ ছেলেমেয়েরা উন্মাদের মতো কাঁদছে। আর জড়ানো জড়ানো গলায় তার বউ বলে যাচ্ছে, ক্যান যে আন্ধারমান দ্বীপি আইছিলাম। মানুষটার পরানডা গেল! এই আছিল আমাগো কপালে!
ছেলেমেয়ে দুজনেই রুদ্ধশ্বাসে একটানা বলে যাচ্ছিল, বাবা, চৌখ মেইলা তাকাও। চৌখ মেল–
শেখরনাথ পলকহীন মোহনবাঁশিকে লক্ষ করছিলেন। বুঝতে পারছেন, তিটা টানাটানি করে খুলতে গেলে গলগল করে রক্ত বেরিয়ে আসবে। জেফ্রি পয়েন্টের তো প্রশ্নই নেই, আশপাশে কোথাও ডাক্তার নেই। দ্রুত মোহনবাঁশির নাকের তলায় হাত রাখলেন তিনি। তির তির করে নিঃশ্বাস পড়ছে। তার মানে লোকটা বেঁচে আছে।
ওদিকে হইচই শুনে ক্যাম্পের দিক থেকে পরিতোষ এবং পুনর্বাসনের কর্মীরা দৌড়ে এসেছিল।
শেখরনাথ সংক্ষেপে ঘটনাটা জানিয়ে দিয়ে ব্যস্তভাবে বললেন, মোহনবাঁশিকে বাঁচাতে হলে এক্ষুনি পোর্ট ব্লেয়ারের হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। মালপত্র নিয়ে যে লরিটা এসেছিল সেটা কি ফিরে গেছে?
পরিতোষ বলল, হে তো আপনেরা যেইদিন উইধারের সেটেলমেন্টে গ্যাছিলেন হেইদিনই বিকালে চইলা গ্যাছে।
সর্বনাশ। এখন উপায়? বলতে বলতে হঠাৎ কিছু খেয়াল হল শেখরনাথের।
-আরে, ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের ট্রাক দুটো তো রয়েছে। তার একটায় তুলে মোহনবাঁশিকে নিয়ে যাব।
কিন্তুক
শেখরনাথ বিরক্ত হলেন।-কীসের কিন্তু?
পরিতোষ ভয়ে ভয়ে জানায়, একটা লরি গাছের গুঁড়ি দিয়ে বোঝাই করা হয়েছে। আরেকটায় হাতি দিয়ে ভোলা হচ্ছে। সেটা ভর্তি হতে হতে বিকেল হয়ে যাবে। তারপর ট্রাক দুটো রওনা হবে ব্যাম্বু ফ্ল্যাটের দিকে। মাল খালাস করে ফিরে আসতে আসতে পরশু।
শেখরনাথ ধমকে উঠলেন, পরশু অবধি মোহনবাঁশি তির বেঁধা অবস্থায় পড়ে থাকবে? ওকে বাঁচানো যাবে? এক্ষুনি গিয়ে আমার নাম করে বল, যেটা এখনও ভর্তি হয়নি সেটায় গুঁড়ি তোলা বন্ধ রাখুক। যা তোলা হয়েছে নামিয়ে ফেলুক। ওই ট্রাকটায় আমরা মোহনবাঁশিকে নিয়ে যাব।
পরিতোষ ঊৰ্ধশ্বাসে ছুটে গেল।
.
ঘণ্টা দেড়েক বাদে একটা লম্বা পুরু চট দুভাজ করে তার ওপর মোহনবাঁশিকে খুব সাবধানে শুইয়ে ট্রাক দৌড় শুরু করল। শেখরনাথ তো গেলেনই, তার সঙ্গে বিনয়ও গেল। মোহনবাঁশির ছেলেমেয়ে বউ ট্রাকে উঠে পড়েছে। তারা মোহনবাঁশিকে ঘিরে বসেছে; তাকে অন্যের হাতে ছেড়ে দিতে ওদের খুব সম্ভব ভরসা নেই। কেঁদে কেঁদে সবার গলা ভেঙে গেছে। মোহনবাঁশিকে ট্রাক থেকে ওঠানোনামানোর জন্য পুনর্বাসনের কর্মীকেও সঙ্গে নেওয়া হয়েছে।
ড্রাইভারের পাশে ফ্রন্ট সিটে বসেছেন শেখরনাথ। জানালার ধারে বিনয়।
শেখরনাথ ড্রাইভারকে তাড়া দিচ্ছিলেন।জোরে চালিয়ে যত তাড়াতাড়ি পার আমাদের ব্যাম্বু ফ্ল্যাটে পৌঁছে দাও। পেছন ফিরে পুনর্বাসনের কর্মীদের বারবার সতর্ক করে দিচ্ছিলেন, তারা যেন শক্ত করে মোহনবাঁশিকে দুদিক থেকে ধরে রাখে। গাড়ির ঝাঁকুনিতে তির যদি তার বুকের আরও গভীরে ঢুকে যায়, মোহনবাঁশিকে হয়তো বাঁচানো যাবে না।
বেলা যখন অনেকখানি হেলে পড়েছে সেই সময় ট্রাক ব্যাম্বু ফ্ল্যাটে এসে গেল। জেটিতে একটা লঞ্চ দাঁড়িয়ে ঘন ঘন ভো দিচ্ছিল। খুব শিগগিরই ছেড়ে দেবে।
লঞ্চটা বিনয়ের খুবই চেনা-সিগাল। এই জলযানেই কয়েকদিন আগে পোর্ট ব্লেয়ার থেকে দেড়শো উদ্বাস্তু ফ্যামিলি এবং বিশ্বজিতের সঙ্গে সে জেফ্রি পয়েন্টে গিয়েছিল।
শেখরনাথরা নেমে পড়লেন। পুনর্বাসনের কর্মীরা শক্ত করে চটের চার কোনা ধরে মোহনর্বাশিকে নামিয়ে আনল। তাদের পেছন পেছন নামল মোহনর্বাশির বউ ছেলেমেয়েরা।
শেখরনাথ ট্রাকের ড্রাইভারকে জেফ্রি পয়েন্টে ফিরে যেতে বলে একরকম দৌড়ে গিয়েই টিকেট কেটে ফেললেন। তারপর সবাই লঞ্চে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে সিগাল লম্বা ভো দিয়ে চলতে শুরু করল।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।