রঘুবীর সরল তো না-ই, সামনের বাড়িটার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে হাঁক পাড়তে লাগল, মা ফুন, এ মা ফুন। জলদি নিকালকে আ
প্রায় দৌড়েই একটি বর্মি মেয়েমানুষ বেরিয়ে এল। তারও যথেষ্ট বয়স হয়েছে, ষাটের কাছাকাছি তো বটেই। চুল কাঁচাপাকা। মঙ্গোলিয়ানদের মতো চেরা চোখ। এই বয়সেও শরীরের বাঁধুনি অটুট। কিন্তু তার মুখের দিকে তাকালে আঁতকে উঠতে হয়। লম্বা লম্বা কালো দাগ। এলোপাতাড়ি ছুরি চালাবার পর ক্ষত শুকোলে যেমন দেখায় সেইরকম। দেখলে চমকে উঠতে হয়। তার পরনে লুঙ্গি এবং কুর্তা। বর্মি মেয়েদের পোশাক।
রঘুবীর তাকে বলল, এই দ্যাখ, চাচাজি এখানে না নেমে সিধা রিফিউজিদের কলোনিতে চলে যাচ্ছে।
মা ফুন হুলুস্থুল বাধিয়ে দিল।-কভি নেহি, কভি নেহি। এতকাল পর এসেছেন। আমাদের কোঠিতে না গেলে রাস্তা ছাড়ব না।
শেখরনাথ বোঝান, দ্রুত জেফ্রি পয়েন্টে না ফিরলে একজনের মৃত্যু পর্যন্ত হয়ে যেতে পারে।
রঘুবীররা এবার একটু থমকে যায়। মা ফুন জিগ্যেস করে, কী হয়েছে?
এখানে আসার উদ্দেশ্যটা জানিয়ে দেন শেখরনাথ।
রঘুবীর বলে, ঠিক হ্যায়। রিফিউজি কলোনির ওই দাইকে আমরা চিনি। বাচ্চা পয়দা করায়। নাম মনসা। আপনারা আমাদের কোঠিতে বসুন। চায়-পানি খান। আপনার নাম করে তোক পাঠিয়ে তাকে ডাকিয়ে আনছি। উতারিয়ে উতারিয়ে
মা ফুনও তার সঙ্গে সুর মেলাল। শেখরনাথকে কিছুতেই ছাড়া হবে না। এতদিন বাদে এই এলাকায় এসে তিনি বাড়ির পাশ দিয়ে চলে যাবেন, তা-ই কখনও হয় নাকি? ট্রাকের সামনে তারা দাঁড়িয়ে থাকবে। শেখরনাথদের যেতে হলে তাদের চাপা দিয়ে যেতে হবে।
শেখরনাথ বিপন্ন মুখে একবার বিয়ের দিকে তাকালেন। তারপর হেসে ফেললেন। এদের হাত থেকে নিস্তার নেই। চল, নেমে পড়া যাক। অবশ্য যে জন্যে এখানে আসা, সেটা হয়ে যাবে। মনসা দাই এলেই তাকে নিয়ে জেফ্রি পয়েন্টে ফিরে যাব।
বিনয় কিছু বলল না। শেখরনাথকে আন্দামানের মানুষজন কতটা ভালোবাসে, কতখানি শ্রদ্ধা করে, তা আরও একবার নিজের চোখেই দেখতে পেল।
রঘুবীররা শেখরনাথ আর বিনয়কে তাদের বাড়ির ভেতর একটা সাজানো গোছানো ঘরে এনে বসাল। সব আসবাব কাঠের আর বেতের। আলমারি, তক্তপোশ, গদিওলা মোড়া, চেয়ার কী নেই নেই! এক দেওয়ালে রেঙ্গুনের সোয়েডামিন প্যাগোডার ফ্রেমে বাঁধানো বিরাট ফটো অন্যদিকে তেমনি ফ্রেমে বাঁধানো শিউশঙ্করজির ছবি। বিনয় আন্দাজ করে নিল ফুন বৌদ্ধ এবং রঘুবীর হিন্দু।
মা ফুন অনর্গল, পরিষ্কার হিন্দুস্থানিতে শেখরনাথকে বলতে লাগল, আপনাকে দেখে কী খুশি যে হয়েছি! এখানে আরাম করে বসুন। চায়-পানি করে আনি।
এদিকে শেখরনাথের নাম করে মনসাকে ধরে আনার জন্য পেনাল কলোনির একটি বর্মি ছেলেকে রিফিউজি সেটেলমেন্টে পাঠিয়ে রঘুবীর বিনয়রা যে ঘরে বসে ছিল সেখানে ফিরে এল। কিন্তু চেয়ার বা মোড়ায় বসল না, নিচে কাঠের মেঝেতে থেবড়ে বসে পড়ল।
শেখরনাথ বললেন, এটা কী হচ্ছে, উঠে একটা মোড়ায় বোস।
জিভ কেটে রঘুবীর যা বলল তা এইরকম। শেখরনাথের মতো একজন সম্মানিত মানুষ, যিনি, দেশের আজাদির জন্য সর্বস্ব ত্যাগ করেছেন, তাঁর সামনে উঁচু জায়গায় তার পক্ষে বসা সম্ভব নয়। তার উপযুক্ত জায়গা শেখরনাথের পায়ের তলায়।
শেখরনাথ হাসলেন। এদের নিয়ে পারা যায় না।
রঘুবীর জিগ্যেস করল, আপনার তবিয়ত আচ্ছা হ্যায় তো?
হ্যাঁ। তোরা কেমন আছিস?
আপনার মেহেরবানিতে ঠিক হ্যায়।কথা বলতে বলতে গভীর আগ্রহে রঘুবীর বারবার বিয়ের দিকে তাকাচ্ছিল।
শেখরনাথ বললেন, তোর ছেলেকে তো মাদ্রাজে পাঠিয়েছিলি। সেখানে ঠিকমতো পড়াশোনা করছে?
হ্যাঁ। রঘুবীর প্রাণ খুলে হাসল। ছেলেটা তার মাবাপের মতো বজ্জাত হয়নি। বিলকুল জেন্টলম্যান। পড়াশোনা ছাড়া আউর কুছু বোঝে না। জজ-ম্যাজিস্টর হবে।তারপরেই বিনয়কে দেখিয়ে জিগ্যেস করল, এই বাবুজিকে তো চিনতে পারলাম না চাচাজি।
শেখরনাথ বললেন, ওই দ্যাখ, তোদের সঙ্গে আলাপ করিয়ে। দিতে ভুল হয়ে গেছে। ওর নাম বিনয় বসু। কলকাতার এক আখবরের পত্রকার? বিনয়কেও রঘুবীরদের সম্বন্ধে জানাল, ওরা একসময় কয়েদি হয়ে আন্দামানে এসেছিল। রঘুবীর ইন্ডিয়ার সেন্ট্রাল প্রভিন্স থেকে, আর মাফুন এসেছিল বর্মার ওয়ান্ডুর থেকে। তারপর ওদের বিয়ে হয়। একটাই ছেলে। মাদ্রাজে হোস্টেলে থেকে বি.এসসি পড়ছে। খুব ভালো ছাত্র।
বিনয় জানত কালাপানি পাড়ি দিয়ে জাহাজ বোঝাই করে শুধু পুরুষ কয়েদিদেরই সেলুলার জেলে নিয়ে আসা হত। মেয়ে কয়েদিদেরও যে একসময় এই দ্বীপে আনা হয়েছে, এটা তার জানা ছিল না। বর্মি মা ফুনের সঙ্গে কী করে সেন্ট্রাল প্রভিন্সের রঘুবীরের বিয়ে হল, তা নিয়ে ভীষণ কৌতূহল হচ্ছিল কিন্তু সেটা প্রকাশ করা অভদ্রতা। সে চুপ করে থাকে।
এদিকে শেখরনাথের সঙ্গে একজন পত্রকার তাদের কোঠিতে এসেছে সেজন্য রঘুবীর খুবই উত্তেজিত। ভেতরের একটা দরজার দিকে মুখ ফিরিয়ে সে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলতে লাগল, মা ফুন, চাচাজির সঙ্গে একজন আখবরের লোক এসেছে। জলদি ইধর
মা ফুনের গলা ভেসে এল। পন্দ্র মিনট পর যাচ্ছি। চায় হয়ে এসেছে।
রঘুবীর এবার বিনয়ের দিকে তাকায়।জানেন বাবুজি, আমরা গন্ধী আদমি। হত্যারা। রাগের মাথায় তিনটে খুন করে কালাপানি, এসেছিলাম। আমার বিবি হামসে কমতি নেহি। মা ফুন দোঠো খুন করে এসেছে। আমি যখন সেলুলার জেলে আসি তখন এই চাচাজি আজাদির জন্যে আংরেজদের সঙ্গে লড়াই করে কয়েদ খাটছেন। জেলখানার ছোট এক সেলে চাচাজিকে আটকে বাইরে। থেকে তালা দিয়ে রাখা হত। নাহানার (চান) জন্যে একবার আর খাওয়ার জন্যে দুবার বাইরে আনা হত। সেই সময় চাচাজির সঙ্গে আমার জানপয়চান। দেওতা য্যায়সা আদমি (দেবতার মতো মানুষ)।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।