হাত তুলে রঘুবীরকে থামিয়ে দিলেন শেখরনাথ।আমার কথা অত বলতে হবে না।
এর মধ্যে শেখরনাথের আসার খবরটা পেনাল কলোনিতে ছড়িয়ে পড়েছিল। এখানকার বাসিন্দারা একে একে এসে তার সঙ্গে দেখা করে যেতে লাগল। এদের বেশিরভাগই বর্মি। দু-চারজন ভারতের নানা প্রভিন্সের লোক। সেলুলার জেলে। শেখরনাথের সঙ্গে একসময় এরাও কয়েদ খেটেছে। রঘুবীরের। মতোই শেখরনাথের ওপর এদের অফুরান শ্রদ্ধা।
একজন সশস্ত্র মুক্তি সংগ্রামী ভারত এবং বর্মার কত মানুষের হৃদয় জয় করে নিয়েছেন, নিজের চোখে না দেখলে ভাবতে পারত না বিনয়। সে ভেতরে ভেতরে অভিভূত হয়ে যাচ্ছিল।
শেখরনাথ সবাইকে নামে নামে চেনেন। তাদের ছেলেমেয়ে স্ত্রীর খবর রাখেন। যেই আসছে, কে কেমন আছে, কারও কোনও সমস্যা হচ্ছে কি না, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জেনে নিচ্ছেন।
এর মধ্যে মা ফুন ভেতর দিক থেকে চলে এল। শুধু চাই না পরোটা এবং সবজিও বানিয়ে এনেছে। চিনামাটির কটা কাপ-প্লেট একটা নিচু টেবলের ওপর রেখে, একটা প্লেট এবং চায়ের কাপ ট্রাকের ড্রাইভারকে দিয়ে ফিরে এসে সে-ও মেঝেতে রঘুবীরের পাশাপাশি বসে পড়ে।
শেখরনাথ বললেন, এত সব করতে গেলি কেন? শুধু চা হলেই তো হত।
মা ফুন হাসল, স্রিফ চা দিলে কী চলে! কত মাহিনা বাদ আপনি এলেন বলুন তো?
শেখরনাথ হেসে বিনয়ের দিকে তাকালেন।-না, এরা কোনও কথা শুনবে। নাও, খেতে শুরু কর। তারপর মা ফুনের সঙ্গে বিনয়ের পরিচয় করিয়ে দিতে দিতে হঠাৎ সেই কথাটা মনে পড়ে গেল।
শেখরনাথ এবার বললেন, শোন, বিনয় তোদের এই পেনাল কলোনি নিয়ে তাদের আখবরে কিছু লিখতে চায়। তোদের কাছে যদি কিছুদিন এসে থাকে, অসুবিধে হবে না তো?
কীসের অসুবিধে। মা ফুন এবং রঘুবীর হইচই বাধিয়ে দিল, বাবুজি এলে আমরা মাথায় করে রাখব।
আসলে কলোনিতে যারা থাকে, তাদের সবার সঙ্গে বিনয় কথা বলবে। তারা কবে কোন অপরাধে ইন্ডিয়া আর বর্মা থেকে কালাপানিতে সাজা খাটতে এসেছিল, সেলুলার জেলে কীভাবে, কত নির্যাতন সহ্য করে তাদের দিন কেটেছে, মুক্তি পাওয়ার পর কীভাবে এখানে কলোনি বানিয়ে জীবনের শেষ দিনগুলো কাটাচ্ছে সব সে জানতে চায়। তারপর ওদের আখবরে সেই লেখা ছাপবে।
রঘুবীর এবং মা ফুন, দুজনেই প্রচণ্ড উত্তেজিত। রঘুবীর জিগ্যেস করল, বাবুজি কবে আসবে?
কিছুদিন পর। আমিই ওকে দিয়ে যাব।
ওঁদের কথাবার্তার মধ্যেই দূর থেকে চেঁচামেচি ভেসে এল। অনেকে একসঙ্গে কথা বললে যেমন শোনায় অনেকটা সেইরকম।
বাইরের দিকের খোলা দরজা দিয়ে দেখা গেল পঞ্চাশ-ষাটজনের একটা দঙ্গল রিফিউজি সেটেলমেন্টের দিক থেকে প্রায় ছুটতে ছুটতেই এগিয়ে আসছে। পাঁচ সাত মিনিটের ভেতর রঘুবীরদের বাড়ির সামনে পৌঁছে গেল। তাদের মধ্যে রয়েছে মাঝবয়সি, ভদ্র চেহারার একটি লোক, মাঝবয়সি, মাঝারি হাইটের মজবুত একটি মেয়েমানুষ। তার হাতে চটের একটা ব্যাগ জিনিসপত্রে বোঝাই। এছাড়া নানা বয়সের ক্ষয়টে চেহারার মানুষজন। দেখামাত্রই টের পাওয়া যায়– উদ্বাস্তু। ছিন্নমূল সর্বস্ব খোয়ানো মানুষগুলোর চোখেমুখে ক্লেশের, উৎকণ্ঠার একটা ছাপ থাকে। সেটাই তাদের নির্ভুল চিনিয়ে দেয়। যে বর্মি যুবকটি দাইয়ের খোঁজে গিয়েছিল, ভিড়ের মধ্যে তাকেও দেখা গেল।
দ্রুত খাওয়া চুকিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন শেখরনাথ। তার পেছন পেছন বিনয়, মা ফুন এবং রঘুবীর।
জনতার ভেতর থেকে সেই মাঝবয়সি লোকটি ক্ষোভের সুরে। বলল, কাকা, এত দূর তরি (পর্যন্ত) আইলেন, কিন্তু আমাগো সেটেলমেন্টে গ্যালেন না? মনসারে ডাকতে লোক পাঠাইলেন। মনে বড় দুঃখু পাইলাম।
এগিয়ে এসে লোকটির কাঁধে হাত রেখে কাঁচুমাচু মুখে বললেন, রাগ করো না বিনোদ। মা ফুনরা কিছুতেই ছাড়ল না। শিগগিরই আবার আসছি। তখন আগে তোমাদের ওখানে যাব।
আইজ একবার পায়ের ধুলা দিবেন না?
উপায় নেই। একটি মেয়ের প্রসব বেদনা উঠেছে। জেফ্রি পয়েন্টে ডাক্তারটাক্তার নেই। তাই দাই নিতে এসেছি। দাই কি এসেছে?
এখানকার রিফিউজি সেটেলমেন্টের সবাই শেখরনাথের মুখচেনা; তবে অনেকের নাম জানেন না।
বিনোদ নামের লোকটি বলল, এসেছে। এই তো সেই মধ্যবয়সিনিকে দেখিয়ে দিল সে।এরই নাম মনসা। আপনি খবর পাঠাইছেন। মনসা এক্কেরে (একেবারে) তৈয়ার অইয়া আইছে।
শেখরনাথ মনসাকে জিগ্যেস করলেন, তোমার কে কে আছে?
মনসা জানায় সে অল্প বয়সেই বিধবা হয়েছে। ছোট ভাই ৮ গোপাল আর তার বউ কমলার কাছে থাকে। তাদের সঙ্গেই আন্দামানে এসেছে। যুবতী বয়স থেকে দাইগিরি করছে।
শেখরনাথ বললেন, আমাদের সঙ্গে গেলে তোমার ভাই আপত্তি করবে না তো?
একটি বছর চল্লিশের ভালোমানুষ ধরনের লোক বলে উঠল, আমি গুপাল। আপনে দিদিরে লইয়া যাইবেন আমি আপত্ত করুম! আমার ঘেটিতে (ঘাড়ে) কয়ডা মাথা?
শেখরনাথ বিনোদের সঙ্গে বিনয়ের আলাপ করিয়ে দিল। বিনোদ বি.এ পাশ। ঢাকায় থাকত। ইচ্ছা করলে পার্টিশনের পর ইন্ডিয়ায় এসে চাকরিবাকরি জুটিয়ে নিতে পারত। নেয়নি। ওর খুব দুঃখের জীবন; বড় আঘাত পেয়েছে। কলকাতায় ভালো লাগছিল না। অন্য উদ্বাস্তুদের সঙ্গে আন্দামানে চলে এসেছে।
পরিচয় করানো হলে শেখরনাথ বিনোদকে বললেন, কিছুদিন পর যখন আসব, বিনয়কেও সঙ্গে আনব। ওরঘুবীরদের বাড়িতে থাকবে, তোমাদের ওখানেও যাবে। খবরের কাগজে তোমাদের সেটেলমেন্টের কথা লিখবে। বিনয়কে একটু সাহায্য করো।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।