পরিতোষ নিজেই দৌড়ে চলে গেল।
বিনয় আগেই ওধারের উদ্বাস্তু কলোনি আর ব্রিটিশ আমলের পেনাল সেটেলমেন্টের খবর পেয়েছে। সেখানে যাবার এই সুযোগটা ছাড়তে চাইল না। আগ্রহের সুরে বলল, কাকা, আপনার। সঙ্গে যেতে চাই।
শেখরনাথ একটু হাসলেন।-বুঝেছি। জার্নালিস্ট তো। ওই দিকের সেটেলমেন্ট টেটেলমেন্ট দেখে কাগজে লিখতে চাও। কিন্তু এবার তো তোমার পক্ষে ওখানে থাকা যাবে না। আমি গিয়েই দাইকে নিয়ে ফিরে আসব। খানিক ভেবে বললেন, এত যখন ইচ্ছে, চল। ওখানকার মাতবরদের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেব। পরে গিয়ে বেশ কিছুদিন থেকে ভালো করে ইনফরমেশন। জোগাড় করে লিখো। নাও, এখন চটপট তৈরি হয়ে নাও। পুনর্বাসন দপ্তরের কর্মীদের দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমরা মেয়েরা যে ব্যারাকে থাকে তার একধারে বাঁশের বেড়াটেড়া দিয়ে আঁতুড়ঘর করে রাখ। আমরা দুপুরের মধ্যে ফিরে আসব। প্রার্থনা কর, তার ভেতর বাচ্চা যেন না হয়ে যায়।
.
এমনই উৎকণ্ঠা যে বিনয়দের চাটা খাওয়া হল না। ট্রাকে ড্রাইভারের পাশে বসে বেরিয়ে পড়লেন।
পাহাড়ের পর পাহাড়। সেগুলোর কোমর বুক পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে কালো মসৃণ পিচের রাস্তা। এই রাস্তা বিনয়ের চেনা। কদিন আগেই এই পথে ব্যাম্বু ফ্ল্যাট থেকে বিশ্বজিৎদের সঙ্গে সে জেফ্রি পয়েন্টে এসেছিল। ট্রাক কখনও চড়াইতে উঠছে, কখনও উতরাইতে নামছে। রাস্তার একধারে গভীর জঙ্গলে ভরা পাহাড়, অন্য দিকে খাদ। খাদের ওধারে আবার পাহাড়।
ঘণ্টাখানেক চলার পর রাস্তাটা দুভাগ হয়ে একটা চলে গেছে সোজা, অন্যটা ডান দিকে। ট্রাকটা ডান পাশের রাস্তাটা ধরল। এদিকটা বিনয়ের পুরোপুরি অচেনা।
খানিকটা যাবার পর দুই পাহাড়ের মাঝখানে অনেকখানি জায়গা মোটামুটি সমতল। তার একধারে টিন কি টালির চাল-দেওয়া কাঠের একতলা কি দোঁতলা। সব মিলিয়ে প্রায় ষাট-সত্তরটা। এই ধরনের বাড়ি বর্মায় দেখা যায়। বিনয় ছবিতে দেখেছে।
বাড়িগুলো পুরানো, কম করে তিরিশ চল্লিশ বছর আগের তৈরি।
শেখরনাথ বললেন, এটা হল পেনাল কলোনি। ব্রিটিশ আমলে গড়ে উঠেছিল। নাম কী জানো?
বিনয় ঘাড় নাড়ল।–না।
ওয়ান্ডুর। বর্মায় ওই নামে একটা ছোট শহর আছে। আন্দামানের কলোনিতে এইরকম নাম দেওয়া হল কেন, ভেবে নিশ্চয়ই অবাক হচ্ছ।
তা হচ্ছি।
নাইনটিন থার্টি ফাইভের আগে বর্মা ছিল ইন্ডিয়ার একটা অংশ বা প্রভিন্স। সেখান থেকে মার্কামারা ডাকাত, খুনিরা আন্দামানে জেল খাটতে আসত। এদের মধ্যে পুরুষও ছিল, মেয়েও ছিল। তারা আর দেশে ফিরে যায়নি। বিয়েটিয়ে করে এখানেই কলোনি বসিয়েছে। কিন্তু জন্মভূমির কথা ভুলতে পারেনি। তাই নিজেদের কলোনির নাম রেখেছে বর্মার কোনও গ্রাম কি শহরের নামে। সাউথ আন্দামানে এরকম আরও সাত-আটটা কলোনি রয়েছে– মেমিও, মৌলমিন, পোগো এমনি নানা নাম। অবশ্য এই ওয়ান্ডুর বর্মিতে বর্মিতেই শুধু বিয়ে হয়নি। অনেক বর্মি মেয়ে ইন্ডিয়ার অন্য প্রভিন্সের লোকজন, যেমন বাঙালি, শিখ, তামিল, মোপলাদের বিয়ে করেছে। বেশকিছু বর্মি পুরুষও তা-ই। তাদের স্ত্রীরা কেউ পাঠান, কেউ মারাঠি, কেউ বিহারি।
যেন আশ্চর্য এক রূপকথা শুনছিল বিনয়। অপার কৌতূহলে জিগ্যেস করে, এদের বিয়ে কী করে হত?
আমি আর কতটুকু বলতে পারব? পরে এসে যখন তুমি কিছুদিন পেনাল কলোনিতে থাকবে, সেই সময় ব্রিটিশ আমলের যে কয়েদিরা বিয়ে করেছে তাদের মুখে ডিটেলে শুনতে পাবে।
বিনয় আর প্রশ্ন করল না। উইন্ড স্ক্রিনের ভেতর দিয়ে বাইরে তাকাল। পেনাল কলোনি থেকে বেশ খানিকটা দূরে সারি সারি অগুনতি টিন এবং টালির চালের ঘর চোখে পড়ল। অনেকটা পুববাংলার ঘরবাড়ির মতো। সেগুলোর গা ঘেঁষে মাইলখানেক, কি তারও বেশি জায়গা জুড়ে হাল-লাঙল চলছে। বোঝা যায় একসময় ওখানে ঘোর জঙ্গল ছিল; সেসব সাফ করে জমি বার করা হয়েছে। তার ডান পাশে সমুদ্র।
ঘরগুলোর দিকে আঙুল বাড়িয়ে বিনয় জিজ্ঞেস করল, মনে হচ্ছে, ওখানে নতুন একটা সেটেলমেন্ট হয়েছে।
হা ওটা রিফিউজি সেটেলমেন্ট। জেফ্রি পয়েন্টের সেটেলমেন্টের মাস ছয়েক আগে ওটা বসানো হয়েছে। দেখ এর মধ্যে চাষবাসও শুরু হয়ে গেছে। যে দাইয়ের জন্যে এসেছি, সে ওখানে থাকে।
কিন্তু উদ্বাস্তু সেটেলমেন্টে যাওয়া হল না। ট্রাক যখন ওয়ারের কাছাকাছি এসে পড়েছে হঠাৎ পাশের একটা কাঠের বাড়ি থেকে লুঙ্গি কুর্তা পরা একটা মাঝারি হাইটের লোক পেটানো মজবুত চেহারা, তামাটে রং, চুলের বেশির ভাগটাই ধবধবে, বয়স ষাট-পঁয়ষট্টি হইহই করতে করতে রাস্তার মাঝখানে এসে দুদিকে দুহাত ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।–রুখখা, রুখো। রুখ যাও
অগত্যা ট্রাকটাকে থামতে হল। রাস্তার লোকটা আরও কাছে এসে হিন্দি-উর্দু মেশানো হিন্দুস্থানিতে শেখরনাথকে বলল, চাচাজি আপ!
বিনয় আগেই জেনেছে শেখরনাথ আন্দামানের সার্বজনীন কাকা বা চাচা। তিনি বললেন, একটা জরুরি কাজে এখানকার রিফিউজি সেটেলমেন্টে যেতে হচ্ছে। তোরা কেমন আছিস, রঘুবীর সিং? মা ফুন ভালো আছে?
লোকটি অর্থাৎ রসুবীর তড়বড় করে বলে, আপনার মেহেরবানিতে ঠিক আছি। কিয়া খুশনসিব ম্যায় নে। কত রোজ বাদে আপনাকে দেখতে পেলাম। আইয়ে আইয়ে– উতারকে আইয়ে–
না রঘুবীর, আজ সময় হবে না। রিফিউজি সেটেলমেন্ট থেকে একজনকে নিয়ে আমাকে দুপুরের মধ্যে জেফ্রি পয়েন্টে ফিরে যেতে হবে। তুই রাস্তা থেকে সর। গাড়ি যেতে পারছে না।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।