কিন্তু বহুদিন বাদে ঝিনুককে দেখার পর পৃথিবী ওলপালট হয়ে গেছে। যে মেয়েটা কোন ছেলেবেলা থেকে তার শ্বাসবায়ুতে মিশে আছে, তাকে ছাড়া বাঁচতে পারবে না বিনয়। সে ভীরু, সে কাপুরুষ, একনিষ্ঠ হতে কোনও দিনই পারেনি। এজন্য নিজেকে আগেও ধিক্কার দিয়েছে, আজও দিতে লাগল। আর তারই মধ্যে একটা যুক্তি খাড়া করে নিজেকে শক্ত করে নিল।
ঝুমা রূপসী, শিক্ষিতা, বনেদি বংশের মেয়ে। তার বাবার অঢেল অর্থ, বিপুল প্রতিষ্ঠা। তারা চোখের পলকে ঝুমার ঝলমলে, চোখধাঁধানো ভবিষ্যৎ তৈরি করে দিতে পারবেন। একটা আঙুল তুলে ইশারা করলে কলকাতার সেরা সেরা বিত্তবান বংশের উচ্চশিক্ষিত, ঝকঝকে, রূপবান ছেলেরা তাদের বাড়ির সামনে ভিড় জমিয়ে দিত। নেহাত ঝুমা বিনয়ের জন্য জেদ ধরে বসেছিল সেজন্য হয়তো অনিচ্ছা সত্ত্বেও শিশির রামকেশব হেমনলিনীরা রাজি হয়েছিলেন।
কিন্তু ঝিনুক? সে ধর্ষিত। অপমানে, অসম্মানে, অন্তহীন গ্লানিবোধে সে কুঁকড়ে থাকত। একদিন তো ক্ষোভে অভিমানে নিখোঁজই হয়ে গেল। যাদের সঙ্গে সে মিডল আন্দামানে গেছে, তাদের সন্ধান কীভাবে পেল, কে জানে। তারা যে উদ্বাস্তু তা নিয়ে, অবশ্য সংশয় নেই। তা না হলে আন্দামানে তাদের আসাই হত না। কিন্তু তারা কেমন মানুষ, তাদের মধ্যে কতটা মর্যাদা নিয়ে সে। আছে, তার আশ্রয়দাতারা কি তার বেদনাদায়ক ইতিহাসটা জানে? সেসব তার সঙ্গে দেখা না হলে জানার উপায় নেই।
ঝিনুক পা রাখার একটু জায়গা পেয়েছে ঠিকই, কিন্তু অন্যের আশ্রয়ে বাকি লম্বা জীবনটা কাটানো কি সম্ভব? যাদের কাছে সে আছে, একদিন তারা বোঝা মনে করে ছুঁড়েও তো ফেলে দিতে পারে। মানুষের পক্ষে কতটা মহানুভব, কত হৃদয়বান হওয়া সম্ভব? তখন?
না, আর ভাবতে পারে না বিনয়। কবে যে ঝিনুকের সঙ্গে দেখা হবে। তার চারপাশ ঘিরে এখন শুধু ঝিনুক, ঝিনুক আর ঝিনুক।
ঝিনুককে নিয়ে কলকাতায় ফিরে গেলে খুবই দুঃখ পাবে ঝুমা, কষ্টে তার বুক চৌচির হয়ে যাবে। কিছুদিন মুহ্যমানের মতো কেটে যাবে তার। খাবে না, ঘুমোবেনা। সবার সামনে না হলেও গোপনে অঝোরে কাঁদবে। তারপর? তারপর আহ্নিক গতি বার্ষিক গতির মতো সব কিছু সহজ, স্বাভাবিক হয়ে যাবে। তার জীবন থেকে একদিন দূর নীহারিকায় বিলীন হয়ে যাবে বিনয়।
কতক্ষণ আচ্ছন্নের মতো বসে ছিল, খেয়াল নেই। হঠাৎ শেখরনাথের ডাকে চমকে ওঠে বিনয়।
বেশ রাত হয়েছে। খাবার দেওয়া শুরু হয়েছে। চল
খাওয়ার ইচ্ছা একেবারেই ছিল না বিনয়ের। জীবনের দুই প্রান্তের দুই নারী তাকে ভেতরে ভেতরে এতটাই ব্যাকুল, এতটাই বিচলিত করে রেখেছিল যে খিদে-তেষ্টার বোধটাই নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু খেতে ইচ্ছে নেই বললে শেখরনাথ ছাড়বেন না, তাঁকে হাজারটা কৈফিয়ত দিতে হবে। নিঃশব্দে চিঠিগুলো টেবিলের দেরাজে রেখে ধীরে ধীরে উঠে পড়ল বিনয়।
২.১০ বহু মানুষের চেঁচামেচি
তখনও ভালো করে ভোর হয়নি, হঠাৎ বহু মানুষের চেঁচামেচিতে ঘুম ভেঙে গেল বিনয়, আর শেখরনাথের। বন্ধ দরজার বাইরে থেকে জোরে জোরে ধাক্কাও দিচ্ছে কেউ কেউ।
তারই মধ্যে পরিতোষের গলা শোনা গেল, কাকা, কাকা, তরাতরি দুয়ার খোলেন।
বিনয় এবং শেখরনাথ বিছানা থেকে নেমে পড়েছিলেন। বিনয় লম্বা পায়ে এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে দিলেন। শেখরনাথও তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। বাইরে সারি সারি উদ্বিগ্ন মুখ। পরিতোষ এবং পুনর্বাসন দপ্তরের কয়েকজন কর্মচারীর সঙ্গে বেশ কিছু উদ্বাস্তুও রয়েছে। তারা সবাই বয়ষ্ক পুরুষ এবং মেয়েমানুষ। তাদের মধ্যে খুলনা জেলার সৃষ্টিধর বারুইকেও দেখা গেল। তার উৎকণ্ঠাই সবচেয়ে বেশি। ভেতরকার চাপা ত্রাসে ঘন ঘন ঢোক গিলছে।
বিনয়রা রীতিমতো অবাক তো হয়েছেই। এই ভোরবেলায় এতগুলো লোক আচমকা চলে এসেছে। তাদের মুখচোখের চেহারা দেখে দুজনের দুশ্চিন্তা হচ্ছিল।
শেখরনাথ ব্যগ্র স্বরে জিগ্যেস করলেন, কী ব্যাপার, কী হয়েছে?
একটি মাঝবয়সি সধবা মেয়েমানুষ, কপালের আধাআধি অবধি ঘোমটা টানা- শেখরনাথকে বলল, ছিষ্টিধরের বউয়ের ব্যথা উঠছে। যন্তরনায় কাতরাইতে আছে। একজন ডাক্তর কি দাই না পাইলে মহা বিপদ অইয়া যাইব। আপনে এট্টা কিছু ব্যাবোস্তা করেন।
সেই পূর্ণগর্ভা বউটির কথা মনে পড়ে গেল বিনয়ের। সেদিন সৃষ্টিধরের সঙ্গে কত কষ্ট করেই না তাদের জমির আগাছা সাফ করছিল। মনে আছে, শেখরনাথ এই সেটেলমেন্টে একজন ডাক্তার পাঠানোর জন্য বিশ্বজিৎকে খবর পাঠিয়েছিলেন। সেই ডাক্তার এখনও এসে পৌঁছায়নি। সরকারি ব্যাপার, অনেকরকম নিয়মকানুন আছে। মুখের কথা খসালেই ব্যবস্থা করা যায় না। এদিকে সৃষ্টিধরের বউটি প্রসব যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। এই মুহূর্তে কীভাবে নির্বিঘ্নে তার সন্তানটির জন্ম হবে ভেবে পেল না বিনয়। হতবুদ্ধির মতো সে তাকিয়ে রইল।
ওধারে শেখরনাথ চকিতে কিছু ভেবে নিলেন। তারপর পুবদিকে আঙুল বাড়িয়ে বললেন, ওই দিকের তিনটে পাহাড়ের ওধারে যে নতুন রিফিউজি সেটেলমেন্ট বসেছে, শুনেছি সেখানে। একজন দাই আছে। চাল ডাল আর অন্য সব মালপত্র নিয়ে সেই যে ট্রাকটা এসেছিল সেটা কি ফিরে গেছে?
পরিতোষ বলল, না কাকা
তাকে রেডি হতে বল, আমাকে নিয়ে ওই সেটেলমেন্টে যাবে। আমি মুখটুখু ধুয়ে বাসি কাপড়চোপড় পালটে নিই।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।