সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার ব্যাপার, রাজদিয়া থেকে হেমদাদুর কোনও চিঠিপত্র পাচ্ছি না। দেশের কী হাল, ওঁরা কী অবস্থায় আছেন, কিছুই বুঝতে পারছি না। নিত্য দাসের মারফত দাদুর চিঠিটিঠি পাই। তুই আন্দামানে চলে যাবার পর থেকে সে একবারও আমাদের বাড়ি আসেনি। কসবায় ওদের ঠিকানা জানি। ভাবছি, তোর হিরণদাকে সামনের রবিবার নিত্য দাসের বাড়ি পাঠাব। দেখা যাক, রাজদিয়ার কোনও খবর পাওয়া যায় কিনা।
যুগল অবশ্য ফি সপ্তাহে একবার দেখা করে যায়। ওদের কলোনি নিয়ে খুব হুজ্জ্বত চলছে। সরকার নাকি বিল আনতে চলেছে জবরদখল কলোনি থেকে উদ্বাস্তুদের উচ্ছেদ করবে। এই নিয়ে রাজনৈতিক কটা দল তুমুল আন্দোলন শুরু করেছে। যুগলরাও সেই আন্দোলনে রয়েছে। তবে একটা সুখবর মুকুন্দপুরে আশু মাস্টারমশাইয়ের স্কুল খুব জমে উঠেছে। যুগলরা সবাই চায়। তাদের জীবন তো নিরক্ষর হয়েই কেটে গেল। তাদের। ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া শিখে মানুষ হোক। পেটে বিদ্যা না থাকলে এদেশে এসে টিকে থাকা যাবে না।
আজ এখানেই শেষ করছি। তুই আমাদের বুকভরা স্নেহ-ভালোবাসা নিস। চিঠি পাওয়া মাত্র উত্তর দিবি। ইতি ছোটদি।
চিঠিটা ভাঁজ করে খামের ভেতর পুরে রাখল বিনয়।
বাকি রইল শেষ চিঠিটা। খামের ওপর সুন্দর গোটা গোটা অক্ষরে তার নাম লেখা রয়েছে: শ্রীবিনয়কুমার বসু। অন্য খামগুলোর তলায় বাঁ দিকে প্রেরকের নাম রয়েছে। কিন্তু এটার তলায় সেরকম কিছু নেই। হাতের লেখাটাও চেনা চেনা মনে হচ্ছে না। কে হতে পারে? কার চিঠি?
রীতিমতো কৌতূহলই হল বিনয়ের। হাত বাড়িয়ে খামটা তুলে নিয়ে ধীরে ধীরে খুলে ফেলল সে। খুব বড় চিঠি নয়। পুরোটা পড়ার আগে একেবারে তলার দিকটা দেখে নিল। সেখানে ঝুমার নাম লেখা রয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে সারা শরীরে তীব্র ঝংকারের মতো শিহরন খেলে গেল।
সুধা আনন্দ প্রসাদ লাহিড়িকে চিঠি লিখেছিল বিনয়। ঝুমা বাদ। কিন্তু সে যে তাকে চিঠি লিখবে, কে ভাবতে পেরেছিল। রুদ্ধশ্বাসে বিনয় পড়তে লাগল।
প্রিয়তম, তুমি আন্দামানে যাবার সময় কথা দিয়ে গিয়েছিলে, দু-তিনদিন পর পর তুমি আমাকে চিঠি লিখবে। তারই জন্য আশায় আশায় প্রতি মুহূর্ত কাটিয়ে গেছি। রোজ পোস্টম্যান আসে, বাড়ির অন্য সবার চিঠি দিয়ে যায়। যার চিঠির জন্য চোখ মেলে বসে থাকি সেটাই শুধু আসে না। ব্যর্থ আমার প্রতীক্ষা।
হঠাৎ একদিন শুনলাম, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সবাইকে তুমি চিঠি লিখেছ, শুধু আমিই বাদ। শুনে আমার যে কী কষ্ট, কী যাতনা, মনে হচ্ছিল বুকের ভেতর জ্বলন্ত শেল বিঁধে যাচ্ছে। কটা দিন ভালো করে ঘুমোতে পারিনি, খেতে পারিনি। উদ্ভ্রান্তের মতো কাটিয়ে দিয়েছি।
জানো না, তুমি রয়েছ আমার জীবনজুড়ে? তুমি যে আমার কতখানি, কী করে বোঝাই? চোখ মেললেও তোমাকে দেখতে পাই, চোখ খুললেও তুমি! আমার ছোট্ট ভুবনে শুধু তুমি, তুমি আর তুমি!
আন্দামান তো কলকাতা থেকে মাত্র আটশো পঞ্চাশ-যাট মাইল দূরে। অন্য কোনও গ্রহে নয়। এতটুকু দূরত্বে গিয়ে, মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে তুমি আমাকে ভুলে গেলে? অন্যদের চিঠি লেখার আগে আমাকেই তো তোমার লেখার কথা। কী আমার অপরাধ, কোথায় আমার ত্রুটি, তার তলকূল পাচ্ছি না।
শেষ পর্যন্ত কতরকম চাতুরি করে আনন্দমামার কাছ থেকে তোমার ঠিকানা জোগাড় করেছি তা আমিই জানি। ঠিকানাটা পেয়েই চিঠি লিখতে বসে গেলাম।
অন্যের চিঠিতে জানতে পেরেছি তুমি যেখানে আছ সেই জায়গাটায় গভীর জঙ্গল, পাশেই সমুদ্র। নিশ্চয়ই খুব অস্বাস্থ্যকর। এলাকা। খুব সাবধানে থাকবে। নিজের শরীরের ওপর যত্ন নিও।
একটাই মিনতি, আমাকে ভুলো না, ভুলো না, ভুলো না। তোমাকে ঘিরে, তোমাকে নিয়েই আমার একমাত্র স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন যদি পূরণ না হয়, আমি ভেঙে চুরমার হয়ে যাব।
তুমি চলে যাবার পর থেকে সারাক্ষণ আমি অস্থির হয়ে থাকি। আমাকে আর কষ্ট দিও না। এই চিঠি পেয়েই উত্তর দেবে। ইতি তোমার ঝুমা।
চিঠিটা পড়ার পর স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে বিনয়। সারা শরীরে। কেমন একটা অসাড় অসাড় ভাব। জানালার বাইরে, একটু দূরে হ্যাঁজাক আর জোরালো লণ্ঠনের আলোয় শেখরনাথ উদ্বাস্তুদের সঙ্গে গল্প করছেন। এত আলো তবু তাদের যেন স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। সব যেন সারি সারি ছায়ামূর্তি। আরও দূরে পশ্চিম আর দক্ষিণ দিকের পাহাড়গুলোকে ঝাপসা দৈত্যের মতো মনে হচ্ছে।
বেশ কিছুক্ষণ অনভূতিশূন্যের মতো কেটে গেল বিনয়ের। তারপর, আচমকা সমস্ত স্নায়ুমণ্ডলজুড়ে তুমুল আলোড়ন শুরু হয়ে গেল।
পূর্ব বাংলার সুদূর স্বপ্নের মতো এক ভূখণ্ডে সেই কোন অল্প বয়স থেকে দুই কিশোরীকে নিয়ে আরম্ভ হয়েছিল দ্বিধাদ্বন্দ্ব আর টানাপোড়েন। সেই কিশোরীরা এখন ভরপুর যুবতী, বিনয় নিজেও পূর্ণ যুবক। মনে হয় শত আলোকবর্ষ ধরে এই দুই নারীকে নিয়ে নিজের সঙ্গেই তার অবিরল যুদ্ধ চলেছে। কখনও চিরদুঃখী ঝিনুক নাড়ি ধরে টান দেয়, কখনও তীব্র আকর্ষণে তাকে যেন শিকড়সুদ্ধ উপড়ে তার কাছে নিয়ে যায় ঝুমা। এটাই বুঝিবা তার ভবিতব্য।
রস আইল্যান্ডে চকিতের জন্য চলুঙ্গা জাহাজে ঝিনুককে দেখার পর থেকে সারা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে একদিকে ঠেলে সরিয়ে দিয়েছিল সে। ভুলে গিয়েছিল ঝিনুক যখন নিরুদ্দেশ, জীবনের অপার শূন্যতাকে ধীরে ধীরে ভরিয়ে দিয়েছিল ঝুমা। অসীম আগ্রহে তারই জন্য প্রতীক্ষা করে আছে মেয়েটা। কোনওদিনই রূঢ়ভাবে তাকে সরিয়ে দিতে পারেনি, বলতে পারেনি ঝিনুক ছাড়া অন্য কোনও নারীর কথা সে ভাববে না, ভাবতে পারে না। বরং কলকাতা থেকে আসার সময় ঝুমার হাতে স্বপ্নের একটি ভূমণ্ডল তুলে দিয়ে এসেছিল। শুধু ঝুমাই নয়, তার বাবা-মা-ঠাকুরদা-ঠাকুমা, মামাবাড়ির সবাই তার জন্য অপেক্ষা করে আছে।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।