দ্বিতীয় চিঠিটি নতুন ভারত-এর চিফ রিপোর্টার প্রসাদ লাহিড়ির। তিনি লিখেছেন
প্রিয় বিনয়, আন্দামান থেকে তোমার পাঠানো তিনটি প্রতিবেদন পেয়েছি। আমাদের কাগজে ছাপাও হয়ে গেছে। পাঠকদের রেসপন্স দুর্দান্ত। এডিটর জগদীশ গুহঠাকুরতা খুব খুশি। আমাকে এবং নিউজ এডিটর তারাপদদাকে তার চেম্বারে ডেকে নিয়ে তোমার লেখাগুলোর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। অবিলম্বে আরও লেখা পাঠাও। তোমাকে যেমন বলে দিয়েছিলাম, নিশ্চয়ই সেসব মনে আছে। শুরু রিফিউজি সেটেলমেন্ট নয়, পেনাল কলোনি, ওখানকার ট্রাইবালদের লাইফ, সেলুলার জেলের বর্তমান অবস্থা, তার ইতিহাস, প্রাকৃতিক পরিবেশ-কোনও কিছুই বাদ দেবে না।
তোমার লেখাগুলোর সঙ্গে ছবি থাকলে গুরুত্ব আরও বাড়ত। রিপোর্টিংয়ের সঙ্গে ফোটোটা খুব জরুরি। আমাদের একটা মস্ত ভুল হয়ে গেছে। তোমাকে একটা ক্যামেরা দেওয়া উচিত ছিল। জগদীশবাবু বলেছেন, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, পাঠানোর ব্যবস্থা করবেন। যতদিন না ওটা পৌঁছাচ্ছে, ওখানকার কারওকে দিয়ে যদি ফোটো পাঠাতে পার, সেই চেষ্টা করো।
এবার কলকাতার কথা জানাই। তুমি আন্দামানে যাবার আগেই রিফিউজিদের নিয়ে নানারকম মুভমেন্টে শহরটা অস্থির হয়ে উঠেছিল। এখন একেবারে উত্তাল। তুমি দেখে গেছ, লেফট পার্টিগুলোর অর্গানাইজেশন ইউনাইটেড সেন্ট্রাল রিফিউজি কাউন্সিল (আর.এস.পি বাদে), সংক্ষেপে ইউসিআরসি, রিফিউজি সেন্ট্রাল রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল, সংক্ষেপে আর সি আর সি, দক্ষিণ কলিকাতা শহরতলি বাস্তুহারা সংহতি–এইসব সংগঠন রোজ সারা শহর জুড়ে কত যে মিছিল বার করছে তার লেখাজোখা নেই। শুধু রিফিউজিদের নিয়ে মিছিল, মিটিং আর স্লোগান।
কলকাতার চারপাশে জলাজমি পতিত জমি আর হোগলাবনে উদ্বাস্তুরা অগুনতি জবরদখল কলোনি বসিয়েছে, সেসব কলোনির নানা বিবরণ নতুন ভারত-এ দিনের পর দিন তুমি লিখে গেছ। গুন্ডাবাহিনী দিয়ে জমির মালিকরা তাদের উৎখাত করতে চেয়েছে। উদ্বাস্তুরা তাদের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে তাদের দখল কায়েম রেখে চলেছে। কিন্তু মালিকপক্ষ এবার অন্য পথ ধরেছে। সরকারের ওপর চাপ দিয়ে বাস্তুহারাদের কলোনিগুলো থেকে উচ্ছেদ করবে, এমন একটা বিল আনতে চলেছে। ইউ সি আর সি, আর সি আর সি এবং উদ্বাস্তুদের অন্য সংগঠনগুলো এই উচ্ছেদ বিলের বিরুদ্ধে তীব্র সংগ্রামের ডাক দিয়েছে। কলকাতা খুব শিগগিরই বিশাল রণক্ষেত্র হয়ে উঠতে চলেছে। কত যে রক্তক্ষয় হবে, কে জানে। সুষ্ঠু পুনর্বাসনের পরিকল্পনা নেই, পোড় জমি, জলা উদ্ধার করে পূর্ব পাকিস্তানের ছিন্নমূল মানুষগুলো কোনওরকমে মাথা গোঁজার একটু জায়গা করে নিতে চাইছে সেটাও তাদের দেওয়া হবে না। তাহলে লক্ষ লক্ষ এই মানুষের কী ভবিষ্যৎ?
যা-ই হোক, কলকাতার এই রিফিউজি মুভমেন্টের অ্যাসাইনমেন্টটা পাওয়ার জন্য রমেন বিশ্বাস আমাকে আর তারাপদদাকে খুব ধরাধরি করেছিল। লোকটা ভালো নয়, তোমাকে ভীষণ ঈর্ষা করে, তুমি যে ভালো কাজ করছ সেটা ওর দুচোখের বিষ। আমরা ওকে অ্যাসাইনমেন্টটা দিইনি, দিয়েছি সুধেন্দুকে। জগদীশবাবু চান, তুমি ফিরে এলে তোমাকেই এটা দেওয়া হবে।
আশা করি ভালো আছ। তোমার চিঠি এবং প্রতিবেদনের জন্য অপেক্ষা করে থাকব।-হতি প্রসাদদা।
চিঠিটা পড়ে মন ভালো হয়ে গেল। তার লেখার সমাদর হয়েছে, পাঠকরা তার কাছ থেকে আন্দামান দ্বীপমালা সম্পর্কে আরও অনেক কিছু জানার জন্য আগ্রহী, এটা তার উদ্দীপনাকে যেন উসকে দিতে লাগল।
সবচেয়ে বড় কথা, রমেন বিশ্বাসকে কলকাতার উদ্বাস্তু আন্দোলন কভার করার দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। এই কুচুটে, হিংসুটে ঈর্ষাকাতর লোকটাকে বিনয় যে আদৌ পছন্দ করে না প্রসাদদারা তা জানেন। ওঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতায় মন ভরে গেল বিনয়ের।
তৃতীয় চিঠিটা আনন্দর। খুবই সংক্ষিপ্ত চিঠি। সে লিখেছে, বিনয়ের জন্য তাদের দুশ্চিন্তা ছিল। সমুদ্র পাড়ি দিয়ে অতটা পথ গেছে! চিন্তাটা স্বাভাবিক। তার পৌঁছানো সংবাদ পেয়ে আনন্দদারা খুশি। বিনয়ের লেখা তারা কাগজে পড়ছে। খুব আন্তরিক লেখা, মনকে নাড়া দিয়ে যায়। তাদের বাড়ির সবাই ভালো আছে। সুধাদের সঙ্গে এর মধ্যে দেখা হয়নি। খুব শিগগিরই একদিন সুনীতিকে নিয়ে তাদের বাড়ি যাবে। বিনয় যেন নিয়মিত চিঠি লেখে ইত্যাদি ইত্যাদি।
চতুর্থ চিঠিটা সুধার। সে লিখেছে:
স্নেহের বিনু, তোর চিঠি আসতে বেশ কয়েকদিন লাগল। তুই বলে গিয়েছিলি, আন্দামান থেকে কলকাতায় চিঠিপত্র পৌঁছাতে অনেক সময় লাগে। তবু ভাবনা হয় বইকি। যাক, তোর চিঠি পেয়ে চিন্তা কাটল। পোর্ট ব্লেয়ার থেকে পঞ্চাশ মাইল দূরে আছিস। লিখেছিস চারদিকে জঙ্গল, পাহাড়, সাপখোপ, বড় বড় চেলা বিছে, জেঁক, সমুদ্রে হাঙর। এসব জেনে ভীষণ ভয় হয়। খুব সাবধানে থাকবি। সময়মতো খাওয়াদাওয়া করবি। অবশ্য ওই ঘোর জঙ্গলে খাবারদাবার কী জোটে, সে সম্বন্ধে কিছু লিখিসনি। মনে হচ্ছে, খাওয়া দাওয়ার খুব অসুবিধা হচ্ছে। কলকাতায় ভালো চাকরি নিয়ে কত আরামে থাকতে পারতিস কিন্তু ঘাড়ে ভূত চাপল, খবরের কাগজে কাজ করবি। এখন বোঝা কষ্ট কাকে বলে। নিজেই এমন একটা কাজ বেছে নিয়েছিস। কে আর কী করতে পারে?
এবার এখানকার খবর জানাচ্ছি। আমার দাদাশ্বশুর, তোদের। দ্বারিকদাদুকে নিয়ে কদিন যমে-মানুষে টানাটানি গেল। ধুম জ্বর, সেই জ্বর আর রেমিশন হয় না। সেই সঙ্গে প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট। মনে হচ্ছিল বাঁচানো যাবে না। শেষ পর্যন্ত মা কালী, মা দুর্গা, মা লক্ষ্মীদের করুণায় ধাক্কাটা সামলে উঠতে পেরেছেন। এ-যাত্রা বেঁচেই গেলেন। তবে ভীষণ কাহিল হয়ে পড়েছেন। কাল ডাক্তার অন্নপথ্য দিতে বলেছেন। এই বয়সে শরীর পুরোপুরি সেরে উঠতে কতদিন লেগে যাবে, ভগবানই জানেন। আমার জেঠশাশুড়িকে যেমন দেখে গিয়েছিলি তেমনই আছেন। ওই ধুঁকতে ধুঁকতে টিকে থাকা। তোর হিরণদার অফিসে কাজের চাপ ভীষণ বেড়েছে। তার ওপর দাদাখশুরের জন্য রাত জাগা। বেচারি একেবারে হিমশিম খেয়ে গেছে। আমার এবং উমারও একই হাল।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।