নিচু গলায় শেখরনাথ বিনয়কে বললেন, ছেলেটার কী দুরন্ত সাহস। কী শক্ত নার্ভ। আমি এখন বিপদের মুখে হয়তো মরিয়া হয়ে দা চালিয়ে দিতাম, তারপরেই ফেন্ট হয়ে পড়ে যেতাম। আর হরিপদকে দেখলে, কেমন নির্বিকার হয়ে ঘাস কাটতে শুরু করেছিল। আমার ধারণা, কালাপনি পাড়ি দিয়ে যারা এই দ্বীপে এসেছে, সবাই ওরই মত। দে আর ইনভিনসিবল। এখানেই নতুন দেশ ওরা গড়ে তুলবে। বিনয় প্রায় এই কথাগুলোই একটু অন্যভাবে ভাবছিল। হরিপদ নামে যুবকটিকে এ কদিন দেখছে সে লাজুক, নম্র, বিনয়ী এবং একজন চমৎকার গাইয়ে। গানে গানে সবাইকে মোহিত করে দিয়েছে। কে ভাবতে পেরেছিল সে এভাবে দা চালাতে পারে। মানুষ সত্যিই অপরাজেয়।
» ২.০৯ কলোনাইজেশন অ্যাসিস্ট্যান্ট পরিতোষ
দুদিন পর সন্ধের আগে আগে চাল, ডাল, আটা, আলু, তেল, মশলা, গুঁড়ো দুধ ইত্যাদি নিয়ে একটা লরি সরাসরি ক্যাম্প অফিসের সামনে এসে থামল। কলোনাইজেশন অ্যাসিস্ট্যান্ট পরিতোষ বণিক খুবই চিন্তায় ছিল। কী কী জিনিস এখানে দরকার তার তালিকা নিয়ে বিশ্বজিৎ সেই যে পোর্ট ব্লেয়ার চলে গিয়েছিলেন তারপর তিনি একেবারে চুপচাপ। পরিতোষের দুশ্চিন্তা হচ্ছিল, বিশ্বজিৎ যেরকম ব্যস্ত মানুষ, অনেকগুলো দপ্তরের দায়িত্ব তাঁকে সামলাতে হয়–হয়তো সেটেলমেন্টের ব্যাপারটা তার মাথা থেকে বেরিয়ে গিয়ে থাকবে। এদিকে দু-তিন দিনের ভেতর জেফ্রি পয়েন্টে রসদ এসে না পৌঁছুলে মহা সমস্যা হয়ে যাবে। কিন্তু না, বিশ্বজিৎ ভুলে যাননি। লরি বোঝাই করে ঠিক পাঠিয়ে দিয়েছেন।
অন্যদিনের মতো উদ্বাস্তুদের সঙ্গে জমি থেকে বিনয় আর শেখরনাথ ফিরে এসেছিলেন। সমুদ্র থেকে হাতমুখ ধুয়ে এসে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে সবাই চাটা খাচ্ছিল। লরি দেখে উদ্বাস্তুরা সেখানে চলে গেল। পায়ে পায়ে বিনয়রাও গেল।
পরিতোষ, লা ডিন, ধনপত এবং পুনর্বাসন আর বনদপ্তরের কর্মীরা ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়ে। লরিতে অগুনতি চটের বস্তা, সারি সারি টিনের আর কার্ডবোর্ডের বাক্স। তক্ষুনি মাল নামানোর ব্যবস্থা হয়।
কর্মীরা কাঁধে পিঠে বস্তাটস্তা চাপিয়ে ক্যাম্প অফিসের পেছন দিকের গুদাম ঘরে নিয়ে রাখতে থাকে।
লরির ড্রাইভার শেখরনাথ আর পরিতোষের জন্য দুটো সাদা খামের চিঠি নিয়ে এসেছিল, বিনয়ের জন্য একটা বড় প্যাকেট বিশ্বজিৎ পাঠিয়েছেন। ড্রাইভার তিনজনকে সেগুলো বুঝিয়ে দিল।
পরিতোষ তক্ষুনি তার খামটা খুলে চিঠি বার করল। দ্রুত পড়ে নিয়ে বিনয়দের বলল, সারের সব দিকে খেয়াল আছে। এদিকে আমি চিন্তায় অস্থির হইয়া উঠছিলাম। সার লেখছেন এইবার কইলকাতা থিকা যে মাল আইছে, পোর্ট ব্লেয়ারের বিজনেসম্যানরা হেগুলান (সেগুলো) খালাস করতে তিন দিনের জাগায় (জায়গায়) নয় দিন লাগাইছে। হের পর সার চাউল ডাইলের অর্ডার দিছেন। মাল আইতে হেই লেইগা (সেজন্য) এত দেরি অইছে। যাউক, আমার ট্যানশান কমল।
শেখরনাথও তার চিঠিটি পড়ে ফেলেছেন। বিনয়কে বললেন, তোমার সম্বন্ধে বিশু অনেক কথা লিখেছে। রিফিউজি সেটেলমেন্ট কীভাবে গড়ে উঠছে তা তো তুমি নিজের চোখেই দেখছ। বিশুকে তুমি বলেছ, পেনাল কলোনি দেখাবে। সে সম্বন্ধে কাগজে লিখবে। বিশু লিখেছে আমি যেন তোমাকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাই। কাছেই, দুটো পাহাড়ের পর একটা বড় পেনাল কলোনি আছে। খুব শিগগিরই তোমাকে নিয়ে ওখানে যাব। লেখার প্রচুর মেটিরিয়াল পেয়ে যাবে।
এতবড় একটা সুযোগ হাতছাড়া করা যায় না। উৎসুক সুরে বিনয় বলল, নিশ্চয়ই আপনার সঙ্গে যাব। বলল বটে, কিন্তু পরক্ষণে কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে পড়ল। হাতের প্যাকেটটা বেশ ভারী। বোঝাই যাচ্ছে, প্রচুর কাগজপত্র রয়েছে ওটার ভেতর। প্যাকেটে বিশ্বজিতের চিঠি নিশ্চয়ই আছে; কিন্তু সে চিঠি আর কত বড় হতে পারে? তার মনে হল, কদিন আগে এখান। থেকে বিশ্বজিৎ যখন পোর্ট ব্লেয়ারে যান, তাঁর হাতে কলকাতা পাঠাবার জন্য শুধু রিপোর্টই নয়, কটা চিঠিও পাঠিয়েছিল। খুব সম্ভব সেগুলোর জবাব এসেছে। বিনয় উদগ্রীব হয়ে উঠল।
এদিকে সন্ধে নেমে গিয়েছিল। সঙ্গে সঙ্গে পুনর্বাসন বিভাগের কর্মীরা আলো জ্বালিয়ে দিয়েছেন। বিনয় বলল, কাকা, মনে হচ্ছে আমার অনেকগুলো চিঠি এসেছে। মনে হচ্ছে কলকাতা থেকে। ঘরে গিয়ে দেখি
শেখরনাথ বললেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ, যাও। আমি এখানে এদের সঙ্গে একটু গল্প করি।
বিনয় তাদের ঘরে চলে এল। ঘরে জোরালো লণ্ঠন জ্বলছিল। যে কমিটির ওপর আলো জ্বালাবার দায়িত্ব তাদের কোনওদিনই ভুল হয় না; সন্ধে নামতে নামতেই জ্বেলে দিয়ে যায়।
হাতের প্যাকেটটার মুখ খুলে টেবলের ওপর রেখে চেয়ারে বসল বিনয়; তারপর প্যাকেটটার ভেতর থেকে পাঁচখানা খাম বার করল। পাঁচটা খামের ওপরেই তার নাম, পোর্ট ব্লেয়ারে বিশ্বজিৎ রাহার বাংলোর ঠিকনা এবং নিচে কোণের দিকে প্রেরকের নাম লেখা আছে। শুধু একটা খামে গোটা গোটা পরিচ্ছন্ন হরফে তার। আন্দামানের নাম-ঠিকানাই শুধু রয়েছে। কে চিঠিটা লিখেছে তার নাম নেই।
প্রথম চিঠি বিশ্বজিতের। তিনি লিখেছেন, প্রিয়বরেষু, কাকা জেফ্রি পয়েন্টে গেছেন। তার কাছ থেকে ব্রিটিশ আমলের আন্দামান সম্পর্কে যতটা পারেন জেনে নেবেন। এই দ্বীপপুঞ্জ সম্পর্কে ওঁর মতো বিশেষজ্ঞ আর জীবিতদের মধ্যে কেউ নেই। আশা করি আপনার কাজকর্ম ভালো চলছে। কলকাতায় পাঠানোর জন্য চিঠি এবং প্রতিবেদন, যা-যা এর মধ্যে লিখেছেন, যে ড্রাইভারটি লরিতে মালপত্র নিয়ে গেছে তার হাতে দেবেন। পাওয়ামাত্র সেগুলো পাঠানোর ব্যবস্থা করব। আপাতত এখানেই শেষ করছি।-বিশ্বজিৎ।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।