শেখরনাথ মায়াকে খুব সম্ভব সেভাবে লক্ষ করেননি। সস্নেহে বললেন, যাও, তোমরা কাজ কর।
পরের জমিটা হরিপদর। সে তার বাবা, মা এবং একটি ছোট ভাই ফ্যামিলির সবাই মিলে জমি সাফ করছে।
হরিপদ এবং তার মা-বাবার সঙ্গে আগেই আলাপ হয়েছে বিনয়ের। শেখরনাথেরও। হরিপদর মা হল দুর্গা, বাপ রসময়, ছোট ভাইয়ের নাম গোপাল। হরিপদর এখনও বিয়ে হয়নি। ওরা খুলনা জেলার লোক।
হরিপদ একজন গুণী যুবক। শিল্পী। তার গানে g৪ বিশ্বজিৎ, শেখরনাথ, বিনয় থেকে শুরু করে সেটেলমেন্টের সবাই মুগ্ধ।
রসময় আর দুর্গা জমির এধারে আগাছা পরিষ্কার করছিল। খানিকটা দূরে একটা মাঝারি গাছের চারপাশে বুনো ঘাসের ঘন জঙ্গল। ধারালো বর্মি দা দিয়ে সেগুলো কাটছে গোপাল আর হরিপদ।
রসময় আর দুর্গা শেখরনাথ এবং বিনয়কে দেখে সসম্ভ্রমে এগিয়ে এসেছিল। কিছু বলতে যাবে, আচমকা গোপালের আর্ত তীক্ষ্ম চিৎকার ভেসে এল।
.
সবাই সচকিত হয়ে সেদিকে তাকায়। সঙ্গে সঙ্গে আতঙ্কে তাদের বুকের ভেতরটা হিম হয়ে যায়।
বিনয় এমন দৃশ্য আগে আর কখনও দেখেনি। যে গাছটার চারপাশের ঘাস কাটছিল দুই ভাই সেখানে একটা কালো কুচকুচে সাপ, প্রায় পাঁচ ফুটের মতো লম্বা, ল্যাজের ওপর ভর দিয়ে হরিপদর মুখোমুখি খাড়া দাঁড়িয়ে আছে। বিশাল ফণায় সাদা চক্রের মতো দাগ, তার হিংস্র চোখ দুটো জ্বলছে। হরিপদ আর সাপটার মাঝখানে দূরত্ব মাত্র ফুট তিনেক। বিনয় সাপ চেনে না, তবে তার মনে হল, ওটা সাংঘাতিক বিষাক্ত। বুকের ভেতরটা কনকনে ঠান্ডা, কিন্তু সারা শরীর লহমায় ঘামে ভিজে গেছে।
ওদিকে গোপাল চিৎকার করেই ঘাড়মুখ গুঁজে লুটিয়ে পড়েছে, এখন আর তার গলা থেকে এতটুকু আওয়াজ বেরুচ্ছে না। ঘাড় ফিরিয়ে শেখরনাথ, দুর্গা এবং রসময়ের দিকে যে তাকাবে, সেই বিনয়ের শক্তিটুকুও কেউ যেন হরণ করে নিয়েছে। জিভটা ভয়ে শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।
প্রাক্তন বিপ্লবীটি, মৃত্যু যার কাছে কোনও ঘটনাই নয়, পাশ থেকে তাঁর ত্রস্ত, কাঁপা কাঁপা, শুষ্ক কণ্ঠস্বর বিনয়ের কানে এল, সর্বনাশ। ওটা কাল কেউটে। কপালে ছোবল মারলে কয়েক কউ সেকেন্ডে শেষ।
রসময় আর দুর্গার সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেছে। তারা হয়তো বুঝতে পেরেছে, তাদের গুণী ছেলেটির আয়ু আর কয়েকটা মুহূর্ত মাত্র।
সূর্য এর মধ্যে পুব দিকের পাহাড়ের মাথা ছাপিয়ে অনেকটা ওপরে উঠে এসেছে। হলকার মতো রোদের তাপ ছড়িয়ে পড়েছে দুর্গম এই উপত্যকায়। রোদে সাপটার কালো পিছল শরীরটা ঝকঝক করছে। মাঝে মাঝে সেটার মুখ থেকে সরু লিকলিকে জিভটা বেরিয়ে আসছে।
বিনয়ের মনে হচ্ছিল সে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে না। শরীরের সব হাড় যেন আলগা হয়ে গেছে। সে এবার হুড়মুড় করে আছড়ে পড়বে। তারই মধ্যে ঝাপসাভাবে যেন দেখতে পেল হরিপদ সাপটার চোখে চোখ রেখে অনড় দাঁড়িয়ে রয়েছে। পলকহীন একটা মানুষ এবং একটা বিষধর ভয়ংকর প্রাণীর মধ্যে চলছে প্রবল স্নায়ুযুদ্ধ।
একেকটা মুহূর্ত যেন একশো বছরের মতো দীর্ঘ, তা যেন ফুরোবে না। আচমকা, বিদ্যুৎ গতিতে আন্দামানের তীব্র, শানিত রোদ চিরে একটা ঝিলিক খেলে গেল।
হৃৎপিণ্ডে তীব্র ঝাঁকুনি খেল যেন বিনয়। শিথিল স্নায়ুমণ্ডলীতে আবার পুরানো জোর ফিরে এসেছে। সে দেখতে পেল সেই সাপটার মুণ্ডু গলার কাছ থেকে সাত আট হাত দূরে ছিটকে পড়েছে, ধড়টা মাটির ওপর মোচড় দিতে দিতে পাক খেয়ে চলেছে। আর হরিপদ ফের ঘাসবনে দা চালিয়ে যাচ্ছে।
শেখরনাথের খুব সম্ভব খাস আটকে গিয়েছিল। জোরে জোরে ফুসফুসে বারকয়েক বাতাস টেনে ব্যগ্র স্বরে বললেন, চল, হরিপদর কাছে যাই। বলে একরকম দৌড়াতে শুরু করলেন। বিনয়ও তার পাশাপাশি ছুটছে।
এদিকে দুর্গা আছাড়ি-পিছাড়ি খেতে খেতে ছেলের কাছে। চলেছে। তার সঙ্গে রসময়। দুর্গা সমানে কাঁদছে আর জড়ানো জড়ানো বিকৃত স্বরে বলে চলেছে, হে ভগবান, হে মা মনসা তুমি আমার ছেইলেটারে বাঁচায়ি দেয়। তোমাদের দয়া, তোমাদের দয়া
বিনয়রা কাছে চলে আসতে ঘাস কাটা বন্ধ করে সোজা হয়ে দাঁড়াল হরিপদ। ঝকঝকে দাঁত মেলে ভারী সরল, নিষ্পাপ মুখে একটু হাসল। বলল, আপনিরা বড় ডরায়ি গেছিলেন–না? সে হয়তো সাপটাকে মারার পর দূর থেকে বিনয়দের ভয়ার্ত মুখগুলো লক্ষ করেছিল।
ওধারে গোপালও উঠে এসে বিহুলের মতো বড় ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে।
দুর্গা ছেলেকে দুহাতে আঁকড়ে ধরে তার বুকে মুখ ঘষতে ঘষতে বলে যাচ্ছে, ও আমার সোনা রে, যমের মুখ থিকি ফিরি আসছিস রে। আমি পরের পুন্নিমায় হরির লুট দেব।
অনেক কষ্টে মাকে শান্ত করে তার পাশে দাঁড় করাল হরিপদ। হইচই কান্নাকাটি শুনে পাশের জমিগুলো থেকে অনেকে ছুটে এসেছে। এবং ঘটনাটা জেনে ফেলেছে।
শেখরনাথ জিজ্ঞেস করলেন, সাপটা কোথায় ছিল– ঘাসের জঙ্গলে?
না। পাশের গাছটা দেখিয়ে হরিপদ বলল, ওই গাছের মাথাতি। হঠাৎ ঝপ করি একটা আওয়াজ হল। দেখি যম আমার সামনে খাড়োয়ি (দাঁড়িয়ে) আছে। হয় আমি মরব, না হলি ও। আমার এই বয়সে মরার সাদ (সাধ) লেই। দেলাম হাতের দা-খান চালায়ে। শালো নিপাতি হয়ে গেল।
সাপটার মুণ্ডু এক জায়গায়, ধড় আরেক জায়গায়। ধড়ের ধড়ফড়ানি এখন থেমে গেছে। বনবিভাগের একজন কর্মী দৌড়ে গিয়ে কেরোসিনের টিন নিয়ে এল। সাপটার গায়ে-মাথায় কেরোসিন ছিটিয়ে আগুন ধরিয়ে দিল সে। যারা ভিড় জমিয়েছে, তারা সাপের শেষকৃত্য দেখতে লাগল।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।