.
অন্য দিনগুলোর মতো আজও সকালে চা, চিড়ে-টিড়ে খেয়ে জমিতে এসেছেন। তার কথামতো উত্তর দিকের জঙ্গল কাটা আপাতত স্থগিত রয়েছে। পুবে পশ্চিমে সাফাইয়ের কাজ চলছে। যেমন যেমন জমি বার করা হচ্ছে, সঙ্গে সঙ্গে সেসব উদ্বাস্তুদের ভাগ করে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
ওপর থেকে নির্দেশ ছিল, দশ পনেরো দিনের ভেতর জমির বিলিব্যবস্থা চুকিয়ে ফেলতে হবে। কিন্তু দেড়শো উদ্বাস্তু পরিবারকে অরণ্য নির্মূল করে জমি ভাগ করে দেওয়া কি মুখের কথা! একাশি বিরাশিটা পরিবার এখন অবধি জমি পেয়েছে। এখনও সত্তরটার মতো বাকি।
আগের কদিন উত্তর আর পুব দিকে ঘুরেছেন শেখরনাথরা। আজ গেলেন পশ্চিম দিকে। প্রথম চারটে জমিতে যে উদ্বাস্তুরা কাজ করছিল তাদের সঙ্গে আগেই আলাপ হয়েছে শেখরনাথের। ওদের সঙ্গে দু-একটা কথা বললেন, কোনওরকম অসুবিধা হচ্ছে কি না জিগ্যেস করলেন। হচ্ছে না জেনে পরের জমিটায় এলেন। এখানে ভারী সুন্দর চেহারার একটি যুবতী বয়স কুড়ি-একুশ, কপালে বড় সিঁদুরের ফোঁটা, সিঁথিতে সিঁদুরের চওড়া রেখা, পাতলা নাকের পাটায় নাকছাবি, কানের লতিতে মাকড়ি, হাতে রুপোর চুড়ি, গলায় রুপোর গোট-হার, গাছকোমর করে পরা লাল-পাড় শাড়ি- ধারালো বর্মি দা দিয়ে জলডেঙ্গুয়া অর্থাৎ বনতুলসীর ঝাড় কাটছিল। তার সঙ্গী বছর তিরিশেকের একটি পুরুষ, যুবকই তাকে বলা যায়, লম্বা হিলহিলে চেহারা, তামাটে রং, মাথায় কঁকড়া চুল সেও একটা দা দিয়ে কাটাঝোঁপ সাফ করছিল। দেখেই আন্দাজ করা যায় স্বামী-স্ত্রী। পরিশ্রমে দুজনেই ঘেমে নেয়ে যাচ্ছে।
আগে এদের লক্ষ করেনি বিনয়, শেখরনাথও। এত এত উদ্বাস্তু এসেছে। কয়েকজনের সঙ্গে ভালোই আলাপ হয়েছে তাদের, কিন্তু এত অল্প সময়ে সবাইকে আলাদা আলাদা করে চিনে, তাদের পরিচয় জেনে মনে করে রাখা সম্ভব নয়।
শেখরনাথ যুবকটিকে জিগ্যেস করলেন, কী নাম তোমার?
যুবকটি হাতের দা ফেলে কাছে এগিয়ে এল। শেখরনাথ তাকে না চিনলেও সে তাকে চেনে। হাতের চেটো দিয়ে কপালের ঘাম মুছে বিনয়ের সুরে বলল, আইজ্ঞা, বিন্দাবন বসাক
দেশ ছিল কোথায়?
ঢাকা জিলা। গেরামের নাম বেতকা- মুন্সিগঞ্জের নাম নি হুনছেন (শুনেছেন)?
শুনেছি। বিক্রমপুরে।
আমাগো বেতকা অইল মুন্সিগঞ্জের কাছে।
দেশ থেকে কবে এসেছ?
বছর দ্যাড়েক।
কথায় কথায় জানা যায়, বিন্দাবন অর্থাৎ বৃন্দাবন আর বউ মাইল পনেরো দূরে সিরাজদিঘায় এক বন্ধুর বাড়ি গিয়েছিল। বন্ধুরা শিগগিরই দেশ ছেড়ে চলে যাবে, এই খবর পেয়ে। সারা পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থাগতিক একেবারেই ভালো না, সর্বক্ষণ আতঙ্ক, সর্বক্ষণ দুর্ভাবনা। কখন কী ঘটে যাবে, কেউ জানে না। বন্ধুদের কাছে জানতে চেয়েছে কবে তারা দেশ ছাড়বে, ইন্ডিয়ার কোথায় গিয়ে উঠবে, ইত্যাদি। ঠিক হয়েছিল একসঙ্গেই তারা পাকিস্তান ছেড়ে ত্রিপুরায় যাবে। কেননা সিরাজদিঘা অঞ্চলের অনেকেই। ত্রিপুরায় যাচ্ছে। বহু মানুষ সঙ্গে থাকলে মনের জোর বাড়ে। বৃন্দাবন বন্ধুকে বলেছিল, বেতকায় ফিরে দু-একদিনের মধ্যে মা-বাবা-ভাইবোনদের নিয়ে চলে আসবে। তারপর এখান থেকেই ত্রিপুরায় রওনা হবে।
কিন্তু বেতকায় ফেরার পথে খবর পাওয়া গেল, বেতক একতরফা খুনখারাপি, আগুন, জোর করে নারীহরণ চলছে তাদের পরিবারের সবাই শেষ হয়ে গেছে। সিরাজদিঘায় ফিরবে তারও উপায় নেই, বেড়া আগুনের মতো দাঙ্গা সেখানে ছড়িয়ে পড়েছে। বন্ধু এবং তার বাড়ির লোকজন বেঁচে আছে কি না, জানা যায়নি।
বৃন্দাবন আর বউ একটা বিরাট খালে পুরো একটা দিন ঠা কচুরিপানার ভেতর লুকিয়ে ছিল। তারপর রাত্তিরে খালের জ আর কচুরিপানা ঠেলে ঠেলে কীভাবে যে মুন্সিগঞ্জ স্টিমারঘাট চলে গিয়েছিল, তারাই জানে। না, ত্রিপুরা যাওয়া হয়নি। মুন্সিগ থেকে রিফিউজিদের জন্য নির্দিষ্ট স্টিমারে চেপে দমবন্ধ ভি চলে এসেছিল গোয়ালন্দে। সেখান থেকে ট্রেনে শিয়ালদা কদিন সেখানকার নরককুণ্ডে কাটিয়ে দমদমের রিলিফ ক্যাম্পে এক বছরেরও বেশি সেখানে কাটিয়ে আন্দামানে এসেছে।
প্রায় সব ছিন্নমূল মানুষের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আতঙ্কে ইতিহাস। বৃন্দাবনের বেলায় আলাদা আর কী হবে?
সেই বউটি জলডেঙ্গুয়া কাটা বন্ধ রেখে কাছাকাছি এসে দাড়ি দাঁড়িয়ে শাড়ির আঁচল দিয়ে গালগলা কপাল পুঁছে নিল। তার বড় বড় লাজুক চোখে শেখরনাথকে দেখতে লাগল। প্রাক্তন ও বিপ্লবী সম্পর্কে সে খুব সম্ভব কিছু কিছু শুনেছে।
শেখরনাথ বউটিকে কাছে ডেকে জিগ্যেস করলেন, তোম দেশ কোথায়, নাম কী?
চেহারার মতো মেয়েটির কণ্ঠস্বর ভারী মিষ্টি। সে জানা তাদের বাড়িও ঢাকা জেলায়, মানিকগঞ্জের সোনাদিঘি গ্রামে। ত নাম মায়া।
কে কে আছে তোমার? বাবা মা ভাই বোন?
বিনয় লক্ষ করল, মেয়েটার চোখেমুখে কেমন যেন ভয়ের ছা। পড়েছে। মুখ নামিয়ে আস্তে আস্তে মাথা নাড়ল সে। তার কেউ নেই। একটু অবাকই হল বিনয়। এই ধরনের গ্রামের মেয়েরা লাজুকই হয়। কিন্তু শেখরনাথ ঝানু উকিলদের মতো জেরা করেননি, সাধারণ কৌতূহলে তার মা বাবা সম্বন্ধে জানতে চেয়েছেন, এতে এমন ভয় পাওয়ার কারণ কী থাকতে পারে? মেয়েটার আচরণ বেশ অস্বাভাবিকই মনে হল।
অথচ তার স্বামী বৃন্দাবনের কথায় কোনওরকম অস্বাচ্ছন্দ্য ছিল না। খুব স্বাভাবিকভাবেই কোন পরিস্থিতিতে তাদের দেশ ছাড়তে হয়েছে তা বলেছিল।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।