কোনও দিন শেখরনাথ বলেন, দাঙ্গা যখন বাধে ভারতবর্ষের নানা প্রভিন্সে হাজার হাজার ব্রিটিশ সোলজার ছিল। খোদ ইংল্যান্ড থেকে ব্রিটিশ গভর্নমেন্ট কড়া হুকুম পাঠিয়েছিল দাঙ্গা থামাতে সেই ফৌজকে যেন কাজে লাগানো না হয়। এতদূরের ইন্ডিয়ান কলোনির শাসনকর্তাদের এমন বুকের পাটা ছিল না যাতে সেই হুকুম অমান্য করে। কলকাতায় ছেচল্লিশের ডাইরেক্ট অ্যাকশনের সময় ফোর্ট উইলিয়ামে কম সৈন্য ছিল না। এই এলাকার ব্রিগেডিয়ার ম্যাকিনলে তাদের ব্যারাক থেকে বেরুতে দেননি। ভাবখানা এই স্বাধীনতা তো চাইছিস, তার মজাটা বোঝ।
বিমর্ষ সুরে শেখরনাথ কোনও দিন বলেন, ভারতীয় নেতারা পাঞ্জাবে মিলিটারি রুল জারি করার জন্যে যথেষ্ট কাকুতিমিনতি করেছেন। কিন্তু কোনও কাজ হয়নি। ইংরেজ সরকার তখন পুরোপুরি অন্ধ আর বধির। সব শুনেও তারা কিছুই শোনেনি, সব। দেখেও কিছুই দেখেনি। আবেদন নিবেদনে ফল না হওয়ায় তারা মুখে কুলুপ এঁটেছিল। অথচ সেদিন কংগ্রেস আর লিগের নেতারা রাস্তায় নেমে তুমুল আন্দোলন করতে পারতেন। দেশের সবাই হত্যাকারী বা নারীধর্ষক নয়। কোটি কোটি শান্তিকামী মানুষ রয়েছে, তাদের ডেকে বলতে পারতেন সমস্ত কিছু স্তব্ধ করে দাও, ব্রিটিশ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনকে বলতে পারতেন, এত রক্তস্রোতের বিনিময়ে আমাদের স্বাধীনতার প্রয়োজন নেই। কিছুই তাঁরা করেননি। দেশের অনন্ত দুর্গতি আর চরম বিপর্যয়ের জন্যে ইংরেজ যতটা তার চেয়ে কম দায়ী নয় এইসব ক্ষমতালোভী নেতা। দেশ। স্বাধীন হলে রাজপাট তাঁদের দখলে আসবে, এই প্রলোভন ত্যাগ করার মতো মহত্ত্ব এঁদের ছিল না।
কখনও বা বলেন, আমরা যারা সশস্ত্র বিপ্লবে বিশ্বাস করতাম, ইংরেজের চোখে তারা টেরোরিস্ট সন্ত্রাসবাদী। ভারতীয় নেতারাও তা-ই মনে করতেন। আমরা যে মুক্তি সংগ্রামী, দেশের জন্যে শত সহস্র বিপ্লবী যে প্রাণ দিয়েছে, জেলখানায় পচে পচে মরেছে তাদের আত্মত্যাগের কোনও মূল্য নেই। আমরা দেশের জন্যে কতটুকুই বা করেছি, নেতাজির আজাদ হিন্দ ফৌজ যখন ইম্ফল পর্যন্ত এসে নানা কারণে বিপর্যস্ত হল, হাজার হাজার সেনাকে বন্দি করে দিল্লিতে নিয়ে আসা হল, তখন কংগ্রেসের একজন সর্বভারতীয় নেতা বলেছিল, এরা গুন্ডাবাহিনী, কোনও বিচার নয়, এদের ধরে ধরে কঁসিকাঠে ঝুলিয়ে দাও। যারা হাটু গেড়ে চুক্তিপত্রে সই করে হাত পেতে স্বাধীনতা নিল তারাই দেশপ্রেমী। আর যে বিপ্লবীরা জীবনদান করল বা মেনল্যান্ডের জেলখানায় জেলখানায় আর সেলুলার জেলে পচে গলে শেষ হল তারা টেরোরিস্ট। নেতাজির আই এন এ হল গুন্ডাবাহিনী! ভাবতে পারো? ক্রোধে-উত্তেজনায় তার চোখমুখ গনগন করতে থাকে।
এই মানুষটির মধ্যে কতখানি দাহ, কতটা ক্ষোভ জমা হয়ে আছে আন্দাজ করতে পারে বিনয়।
একদিন শেখরনাথ বললেন, ইন্ডিয়াকে স্বাধীনতা দেবার। সিদ্ধান্ত কীভাবে হয়েছিল, তুমি নিশ্চয়ই জানো। সেই সময়কার বড়লাটের বড়ই তাড়া। তাঁকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ইংল্যান্ডে ফিরতে হবে। কেননা যিনি ভবিষ্যতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের রাজ-রাজেশ্বরী হবেন তার সঙ্গে মাউন্টব্যাটেনের ভাইপোর বিয়ে। সেই ছাদনাতলার পাশে উপস্থিত না থাকলে চলে! তাছাড়া ব্রিটিশ নেভির প্রধানের পদটি শীঘ্রই খালি হতে চলেছে। মাউন্টব্যাটেনের নজর সেই মসনদের দিকে। পদটি কম লোভনীয় নয়। কাজেই। ইন্ডিয়ার ব্যাপারে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হাত ধুয়ে লন্ডনের প্লেনে উঠে বসো।
বিনয় জানে, মোটামুটি ঠিক হয়েছিল উনিশশো আটচল্লিশের মাঝামাঝি ভারতীয় উপমহাদেশের যাবতীয় দায়িত্ব এ দেশের নেতাদের হাতে তুলে দেওয়া হবে। কিন্তু মাউন্টব্যাটেনের ভীষণ তাড়া। তাঁর আর তর সইছিল না। ব্রিটিশ গভর্নমেন্টকে তিনি বোঝালেন, এত দেরি করার প্রয়োজন নেই। সরকারও সেটা মেনে নিল। হঠাৎই ঘোষণা করা হল, সাতচল্লিশের পনেরোই আগস্ট দেশটা কেটেকুটে দুটো ডোমিনিয়ন তৈরি করা হবে-ইন্ডিয়া আর পাকিস্তান। একই দিনে স্বাধীনতা এবং দেশ ভাগ। সেদিনই এ দেশের নেতাদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে। আশ্চর্যের ব্যাপারটা কী জানো বিনয়?
বিনয় নিঃশব্দে শুনে যাচ্ছিল। জিগ্যেস করেছে, কী?
শেখরনাথ বলেন, দেশটাকে ভাগ করার জন্যে র্যাডক্লিফের হাতে যে ছুরি তুলে দেওয়া হয়েছিল, মাটিতে সেই ছুরি চালিয়ে কোন কোন অংশ কোন কোন ডোমিনিয়ন পাবে তখনও তিনি স্থির করে উঠতে পারেননি। তার আগে ডোমিনিয়ন বানানো হয়ে গেল।
কখনও শেখরনাথ বলেন, এসবের নিট রেজাল্ট কী হল, আমরা যা পেলাম তা ছেঁড়াখোঁড়া পোকায় কাটা এক স্বাধীনতা।
কখনও বা তিনি বলেন, একটা কথা ভেবে দেখ, দুশ বছর রাজত্বের পর মাত্র সাত সপ্তাহের মধ্যে এত বিশাল একটা দেশের ট্রান্সফার অফ পাওয়ার হয়ে গেল। এত বড় হঠকারী, অবিবেচক, দায়িত্বজ্ঞানহীন সিদ্ধান্ত আর কোথাও কবে হয়েছে, আমার জানা নেই। কলোনিয়াল মাস্টাররা অন্য কোনও দেশকে এভাবে হেলাফেলা করে ফেলে চলে গেছে, এমন নজির আর একটা তুমি দেখাতে পারো?
দাঙ্গা, দেশ বিভাজন, স্বাধীনতা টুকরো টুকরোভাবে এইসব নিয়ে তিনি যা বলেন তার মধ্যে এই মুক্তি সংগ্রামী মানুষটির কত যে ক্ষোভ, আক্ষেপ, যন্ত্রণা, ধিক্কার, নৈরাশ্য আর তীব্র ক্রোধ মিশে থাকে!

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।