জানালার বাইরে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে শুনছিলেন শেখরনাথ। বললেন, কত কাল পর পূর্ববাংলার গান শুনছি। প্রাণমন ভরে যাচ্ছে। কী দরদ দিয়ে যে গাইছে লোকটা! আহা–
রাজদিয়ায় থাকতে এই ধরনের গান যুগলই প্রথম শুনিয়েছিল বিনয়কে। তারপর আরও কতজনের মুখেই না শুনেছে সে। মাঝি-মাল্লা বৈরাগী যাত্রাদলের গায়ক–এমনি অনেক। কলকাতায় আসার পর জীবনের ওপর দিয়ে কত ঝড়ঝাঁপটা গেছে। ঝিনুক যখন নিরুদ্দেশ ইল, মনে হয়েছিল আকাশ যেন খানখান হয়ে ভেঙে পড়েছে। হৃদয় জুড়ে তখন শুধুই ক্ষত। চূর্ণবিচূর্ণ বিনয় উদভ্রান্তের মতো ঝিনুককে খুঁজে বেড়াচ্ছে কলকাতার অলিগলিতে, জনারণ্যে, চারদিকের রিফিউজি কলোনিগুলোতে। জীবন থেকে পূর্ববাংলার সেইসব মায়াবী স্বপ্নের গান বিলীন হয়ে গিয়েছিল।
বহুকাল পর এই সেদিন, বিশ্বজিৎ তখন এখানে, জেফ্রি পয়েন্টের এই উদ্বাস্তু কলোনিতে আসার পর হরিপদর গান শুনে মনে হয়েছিল পূর্বজন্মের স্মৃতি আবার ফিরে এসেছে। তারপর থেকে রোজ গানবাজনার আসর বসে। হরিপদ হারাধন মোহনর্বাশি–এরা সবাই পাহাড় অরণ্য সমুদ্রে ঘেরা এই দ্বীপে। কিছুক্ষণের জন্য হলেওজাদুকরের মতো পূর্ববাংলার সজল কোমল মায়াময় ভূখণ্ডটিকে নামিয়ে আনে।
শেখরনাথ আপ্লুত। বললেন, লোকগুলোর কী এনার্জি, কী প্রাণশক্তি, দেখেছ। সারাদিন জঙ্গল কেটেছে, তারপর কোথায় খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়বে, তা নয়। গানের আসর বসিয়ে দিয়েছে।
এসব তো আগেই দেখেছে বিনয়। কিছু বলল না। শুধু একটু হাসল।
শেখরনাথ বলতে লাগলেন, দূর থেকে শুনে জুত হচ্ছে না। যাই, আসরে গিয়ে ওদের পাশে বসি। তিনি চলে গেলেন।
বিনয় অবাক বিস্ময়ে কিছুক্ষণ বসে থাকে। শেখরনাথ উদ্বাস্তুদের এনার্জির কথা বলেছেন। কিন্তু তাঁর নিজের? সেই পোর্ট ব্লেয়ার থেকে পাহাড়ের পর পাহাড় পেরিয়ে, দুর্গম বনজঙ্গল ভেদ করে সেটেলমেন্টে এসেছেন। এসেই ছুটেছেন জমি বিলি দেখতে। ঠায় এক জায়গায় কি দাঁড়িয়ে থেকেছেন? হেঁটে হেঁটে একরের পর একর জমি ঘুরে ঘুরে দেখেছেন। উদ্বাস্তুদের ডেকে ডেকে আলাপ করেছেন, তাদের সুবিধা অসুবিধার খোঁজখবর নিয়েছেন। তারপর এই রাত্রিবেলা ছুটলেন কাছাকাছি বসে গান শুনতে। এই বয়সেও প্রাক্তন এই স্বাধীনতা-সংগ্রামীর কী অফুরান প্রাণশক্তি! একসময় টেবলের দেরাজ খুলে কাগজ কলম বার করে লিখতে শুরু করল বিনয়।
বঙ্গোপসাগরের এই সৃষ্টিছাড়া দ্বীপে অবিরল হারাধনের সুরের ইন্দ্রজাল ছড়িয়ে পড়ছে।
২.০৮ এসেছেন শেখরনাথ
দিন পাঁচেক হল জেফ্রি পয়েন্টে এসেছেন শেখরনাথ। সারাদিন সারা রাত বিনয় তাঁর সর্বক্ষণের সঙ্গী। সকালে উঠে চা রুটি-টুটি খেয়ে উদ্বাস্তুদের সঙ্গে তারা জমিতে ছোটে। লা ডিন, ধনপতদের কাজকর্ম দেখে। রিফিউজিদের জঙ্গল সাফাই দেখে। শেখরনাথের কথায় কাজ হয়েছে। সৃষ্টিধর বারুইয়ের জমির ঝোঁপঝাড় কাটার জন্য একজন লোক দিয়েছে পরিতোষ। আজকাল আর তার গর্ভবতী বউটিকে জমিতে দেখা যায় না।
অদ্ভুত মানুষ এই প্রাক্তন বিপ্লবীটি। বড়ই মায়াময়, উদ্বাস্তুদের জন্য তার কী যে অপার সহানুভূতি! কোনও জমিতে হয়তো গিয়ে দেখলেন অশক্ত চেহারার বুড়ো-ধুড়ো কেউ বুনো উদ্দাম গাছপালার গায়ে দা চালাতে চালাতে হাঁপিয়ে পড়েছে। তিনি তক্ষুনি দা-টি কেড়ে নিয়ে কাজে লেগে যান। চারপাশ থেকে সবাই!
হাঁ হাঁ করে ওঠে, তিনি কারও বারণ শোনেন না।
দুপুরে ফিরে এসে চান, খাওয়া, সামান্য বিশ্রাম। তারপর আবার জমিতে জমিতে ঘোরা। সন্ধের আগে আগে ক্যাম্পে এসে চা-টা খেয়ে কিছুক্ষণ জিরিয়ে নেওয়া। তারপর রাতের খাওয়া চুকিয়ে শেখরনাথ চলে যান গানের আসরে, আর বিনয় লিখতে বসে।
রাতের এক প্রহর পেরুলে আসর ভাঙে। শেখরনাথ ঘরে এসে বিনয়ের পাশের খাটে শুয়ে পড়েন। ততক্ষণে বিনয়ের লেখাও শেষ। সেও শুয়ে পড়ে। এই হল দুজনের এখনকার দৈনন্দিন রুটিন।
এসবের ফাঁকে ফাঁকে নানা কথা হয়। তার বেশির ভাগটাই জুড়ে থাকে দাঙ্গা, দেশভাগ, স্বাধীনতা। আর এই স্বাধীনতার জন্য বাঙালিরা, বিশেষ করে পূর্ববাংলার হিন্দুরা, কতভাবে যে বঞ্চনার শিকার হয়েছে, বার বার এই প্রসঙ্গগুলো চলে আসে। এগুলো নিয়ে তার কত যে ক্ষোভ, কত রোষ এবং উত্তেজনা।
কোনও দিন শেখরনাথ বলেন, পার্টিশনের ঠিক আগে জওহরলাল নেহরু লর্ড মাউন্টব্যাটেনরে যে একটা চিঠি লিখেছিলেন সেটা জানো?
বিনয় বুঝতে পারে না। কোন চিঠির কথা বলছেন শেখরনাথ। সে তাকিয়ে থাকে।
শেখরনাথ বলেন, দেশ জুড়ে শুধুই ভয়াবহ আতঙ্ক আর আতঙ্ক। সরকার তা থামাতে পারছে না। শুধু চরম বিপর্যয় আর বিপর্যয়। বিশেষ করে লাহোরে যে নারকীয় ঘটনা ঘটছে তা মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। অমৃতসর গুরুগাঁও তো কার্যত যুদ্ধক্ষেত্র। অথচ প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল যে কোনও বিশৃঙ্খলা সর্বশক্তি দিয়ে দমন করা হবে। একটা ব্যাপার লক্ষ করেছ বিনয়?
বিনয় জিজ্ঞেস করে, কী?
ডাইরেক্ট অ্যাকশনের কল দেওয়ায় কলকাতায় যা ঘটেছে, নোয়াখালিতে যে গণহত্যা হয়েছে, সেসব নিয়ে নেহরু কতখানি বিচলিত তা জানা যায় না। আমি অন্তত জানি না।
একটু চুপ করে থেকে ফের শুরু করেন, বেঙ্গলে কী ঘটেছে তা নিয়ে ইন্ডিয়ার অন্য প্রভিন্সের নেতাদের চোখ থেকে রাতের ঘুম ছুটে গিয়েছিল কি না, আমার জানা নেই। গান্ধীজি অবশ্য নোয়াখালি রায়টের–রায়ট কী বলছি, একতরফা মার্ডার, অ্যাবডাকশন, রেপ, কনভারশন– এসবের পর সেখানে। গিয়েছিলেন। তখন তো মহাসর্বনাশ ঘটেই গেছে। হ্যাঁ, এটাও বলতে হবে বিহারেও হাজার হাজার নিরীহ মানুষকে ঠান্ডা মাথায় খুন করে বিরাট বিরাট গর্ত খুঁড়ে রাতারাতি পুঁতে দেওয়া হয়েছে।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।