একটু চুপচাপ।
তারপর শেখরনাথ বলেন, চুক্তিতে সই করে, দেশটাকে কেটেকুটে স্বাধীনতা এলে তার চেহারাটা কেমন হয় তা তো দেখতেই পাচ্ছ। মুক্তি সংগ্রামীদের এত আত্মত্যাগ সব বৃথাই গেল। ক্ষোভে, বেদনায় তার গলা বুঝে এল।
বিনয় অবাক হয়ে যাচ্ছিল। মেনল্যান্ড থেকে প্রায় হাজার মাইল দুরের এই দ্বীপপুঞ্জে থেকেও দেশের কত খবর রাখেন এই মানুষটি।
কথায় কথায় ওরা পশ্চিম দিকের শেষ জমিটায় এসে পড়ল। এরপর গভীর জঙ্গল। সেই জঙ্গল সাফ হলে আবার কিছু উদ্বাস্তুকে ভাগ করে দেওয়া হবে।
শেষ জমিটায় আসতেই চোখে পড়ল একটি যুবক, তিরিশের বেশি বয়স হবে না, ঢ্যাঙা, রোগাটে চেহারা, লম্বা ধরনের মুখ ধারালো বার্মিজ দা দিয়ে ঝোঁপঝাড় কাটছিল। একটা যুবতী, কপালে সিঁথিতে সিঁদুর, মাথায় ঘোমটা নেই–সেও দা দিয়ে বুনো লতা কেটে একধারে জড়ো করছে। এছাড়া আর কেউ নেই। তাদের দুজনকে নিয়েই খুব সম্ভব একটা ডি. পি (ডিসপ্লেসড) ফ্যামিলি।
বিনয়দের দেখে যুবকটি কাছে এগিয়ে আসে। বিনয়কে সে চেনে কিন্তু শেখরনাথ তার অপরিচিত। সে হাত জোড় করে বিনয়কে নমস্কার করে, শেখরনাথের দিকে তাকায়।–আপনারে তো চিনতি ফারলাম না।
বিনয় পরিচয় করিয়ে দিতে সে ঝুঁকে শেখরনাথের পা ছুঁয়ে উঠে দাঁড়ায়। বলে, আপনে বড় সারের কাকা। আপনেরে দেখে। বড় আনন্দ হতিচে। আমাগের নয়া কুলোনি দেখতি আসিছেন?
মাথা নাড়িয়ে শেখরনাথ বললেন, হ্যাঁ। তারপর জিগ্যেস করলেন, তোমার নাম কী?
ছিষ্টিধর বারুই।
দেশ ছিল কোথায়?
আইজ্ঞে, খুইলনে জিলা। গেরাম নেহেরপুর।
পাকিস্তান থেকে কতদিন আগে ইন্ডিয়ায় এসেছ?
তা হবে নে, বছর দেড়-দুই।
ছিলে কোথায়?
কলকেতায় এইসে ছয়-আট মাস শিয়ালদার ইষ্টিশানে। তার পরি (তারপর) কেম্পে। কেম্প থিকে বাবুরা আমাগেরে আন্ধারমান দ্বীপি আনিছে।
শেখরনাথ কী বলতে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ তার নজরে পড়ল লতাটতা কাটা বন্ধ করে বউটি বসে বসে হাঁফাচ্ছে। সে গর্ভবতী। বাচ্চার জন্ম হতে বেশি দেরি নেই। সারা মুখে দানা দানা ঘাম। ঘামে ভিজে গেছে জামা। ক্লান্তিতে তার শরীর ভেঙে পড়ছে।
বিনয়ের মতো ওদের দুজনের সম্পর্কটা আন্দাজ করে নিয়েছিলেন শেখরনাথও। ধমকের সুরে বললেন, বউয়ের এই অবস্থা। তাকে জমিতে খাটাতে নিয়ে এসেছ? মরে যাবে যে।
অপরাধী অপরাধী মুখ করে ছিষ্টিধর অর্থাৎ সৃষ্টিধর বলে, কী করবা নে সার? সরকারি বাবুরা বড় বড় গাছ কাটি দেছেন। ছোট ছোট জঙ্গল সাফ না করতি পারলে জমিন বারোবে (বেরুবে) ক্যামনে? ক্যাশ ডোল তো একদিন বন্ধ হয়ি যাবে। চাষবাস করতি না পারলে না খেয়ি মরতি হবে নে।
শেখরনাথ ভীষণ রেগে গেলেন। গলার স্বর কয়েক পর্দা চড়িয়ে বললেন, আর কক্ষনো বউকে জমির কাজে লাগাবেনা। ওর এখন বিশ্রাম দরকার।
ঢোক গিলে সৃষ্টিধর বলে, কিন্তুক সার, আমার ফেমিলিতে তো আর কেউ নাই। ক্যামন করি এত বড় জঙ্গল সাফা করব?
পরিতোষকে বলব একটা লোক দিতে। সে-ই তোমার সঙ্গে সাফসুফ করবে। যদি বাড়তি লোক পরিতোষের হাতে না থাকে, আমিই কাজে লেগে যাব।
লম্বা জিভ কেটে সৃষ্টিধর বলল, অমন কথা কতি নাই। আমার পাপ হবা। যা পারি আমি একাই করতি চ্যাষ্টা করব।
এ নিয়ে আর কিছু বললেন না শেখরনাথ। জিগ্যেস করলেন, বউকে ডাক্তারবদ্যি দেখিয়েছ?
এই জঙ্গুলি ডাক্তারবদ্যি কোয়ানে (কোথায়) পাবানে (পাব)?
একটু ভেবে শেখরনাথ বললেন, আজ আর কাজ করতে হবে না। বউকে নিয়ে চলে যাও কোথায় থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। তোমাদের?
দুরের ব্যারাকগুলো দেখিয়ে দিল সৃষ্টিধর। এক পলক দেখে শেখরনাথ বললেন, দেখি ডাক্তারের কী বন্দোবস্ত করা যায়।
এতগুলো জমিতে ঘোরাঘুরি করতে করতে বেলা হেলে গেল। তিনদিকের পাহাড়ের ছায়া দীর্ঘ হচ্ছে। সূর্যটা পশ্চিম পাহাড়ের আড়ালে নেমে গেছে। সেটাকে তখন আর দেখা যাচ্ছে না।
নীরবে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন শেখরনাথ। তারপর! স্বগতোক্তির মতো বললেন, রিফিউজি সেটেলমেন্টের জনা # জেফ্রি পয়েন্টটা বাছা হল তখন একবারই এখানে এসেছিলাম। সেইসময় সবে ক্যাম্প অফিস বসেছে, ব্যারাকগুলো তৈরি হচ্ছে। পরিতোষ, লা ডিন, ধনপত পুনর্বাসন আর ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের এমন কিছু লোকজনকে পাঠানো হয়েছে। চারিদিকে চাপ চাপ জঙ্গল। এখন এসে দেখছি সেই জঙ্গলের অনেকটাই সাফ করে ফেলা হয়েছে। রিফিউজিরা এসে তাদের জমিজমা বুঝে নিচ্ছে। বলে চুপ করে গেলেন।
জঙ্গল ধ্বংস হওয়াতে তিনি কি খুশি হননি, ঠিক এমনি বুঝতে পারল না বিনয়। কিন্তু বনভূমি নিমূল না হলে উদ্বাস্তুদের জমি দেওয়া হবে কী করে? তাদের পুনর্বাসনের পরিকল্পনাই। তো বন্ধ করে দিতে হবে।
এখানে উত্তর দিকের জঙ্গলটাই সবচেয়ে ঘন, সবচেয়ে নিবিড়। সেটা অন্য দুধারের জঙ্গলের চেয়ে বেশি ঝাপসা হয়ে দল গেছে। তবু আবছাভাবে দেখা যাচ্ছে ও দিকের বনভূমির মাথা ছাপিয়ে দুশ হাত দুরে দুরে বাঁশের তৈরি টও খাড়া হয়ে আছে। টঙগুলোকে ছুঁয়ে চলে গেছে কাল্পনিক পেরিমিটার রোড।
ওইসব উঁচু, উঁচু মাচা বা টঙ যে বুশ পুলিশের ঘাঁটি বা ওয়াচ টাওয়ার, শেখরনাথ তা জানেন। ওখানে বসেই বুশ পুলিশের দল জারোয়াদের গতিবিধির ওপর নজর রাখে। পেরিমিটার রোডের অস্তিত্ব তার অজানা নয়। সেদিকে আঙুল বাড়িয়ে একসময় জিজ্ঞেস করলেন, যেভাবে উত্তর দিকের জঙ্গল কাটা হচ্ছে তাতে আমার দুশ্চিন্তা হচ্ছে।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।