সেলুলার জেলের ইতিহাস নিশ্চয়ই জানাতে পারবেন বিশ্বজিৎ, কিন্তু সেখানে নির্জন সেলে কাটানো এবং অকথ্য নিগ্রহ আর নারকীয় যন্ত্রণা ভোগ করার অভিজ্ঞতা তো তার নেই। সেই কষ্টকর, দুর্বিষহ জীবনের অনুপুঙ্খ বিবরণ দিতে পারবেন শেখরনাথ। তার সময়ে আর কোন কোন বিপ্লবী সেখানে ছিলেন, ছিল কী ধরনের দুর্ধর্ষ খুনি ডাকাতের দল, সব জানা যাবে।
কুখ্যাত এই জেলখানা অপার রহস্যে ঘেরা। মেনল্যান্ডের মানুষজনের মনে এই কারাগার সম্পর্কে শুধুই ত্রাস আর আতঙ্ক। কত করম ভীতিকর জনশ্রুতি যে ভেসে বেড়াত। একজন বিপ্লবী যিনি জীবনের মহা মূল্যবান সময় অশেষ নির্যাতন সইতে সইতে এখানে ক্ষয় করে দিয়েছেন, তিনি তাঁকে সঙ্গে করে নিয়ে যাবেন, ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সব দেখাবেন, ভাবতেই স্নায়ুমণ্ডলীতে শিহরন খেলে যেতে থাকে বিনয়ের।
শেখরনাথ সামনের দিকে পা বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। দূরের জঙ্গলে গাছ কাটা চলছে। ডানপাশে চলছে জমি মাপামাপি এবং বরাদ্দ জমির সীমানা বরাবর বাঁশের খুঁটি পোঁতার কাজ। আর যেধারে এর মধ্যেই জমি দেওয়া হয়ে গেছে সেই সব জায়গাতেও কাজ চলছে পুর্ণোদ্যমে। প্রতিটি উদ্বাস্তু পরিবারের লোকজন, দুধের শিশুরা বাদে, বুড়ো ধুড়ো মেয়েপুরুষ সবাই দা কোদাল। কুড়াল ইত্যাদি দিয়ে ঝোঁপঝাড়, ছোট-মাঝারি গাছ, জলডেঙ্গুয়ার। উদ্দাম জপল কেটে, উপড়ে সাফ করে ফেলছে।
প্রতিটি জমিতে গিয়ে ছিন্নমূল মানুষগুলোর সঙ্গে আলাপ করছেন শেখরনাথ। নিজের নাম জানিয়ে বলছেন, আমি তোমাদের কলোনির কর্তা বিশ্বজিতের কাকা। তোমার নাম কী?
যাকে জিগ্যেস করা হল, অচেনা প্রৌঢ়টি বিশ্বজিতের কাকা শুনে সসম্ভ্রমে বলে, আইজ্ঞা, বিন্দাবন সাহা
দেশ ছিল কোথায়?
বরিশাল। গেরামের নাম হরিশ্চন্দপুর।
দেশে কী করতে?
দোকানদারি। চাউল ডাইল মশল্লাপাতি বেচতাম। আন্ধারমানে জমি চষতে অইবে। ব্যাবসাদার থিকা চাষি বইনা গ্যালাম।
জমির পর জমি পেরিয়ে যান শেখরনাথ। তার পাশাপাশি হেঁটে চলেছে বিনয়।
শেখরনাথের প্রশ্নের উত্তরে উদ্বাস্তুরা কেউ জানায় তার নাম গণেশ পাল, বাড়ি ফরিদপুর, দেশে মাটির হাঁড়ি পাতিল বানাত, পুজোর মরশুমে গড়ত দুর্গা কালী সরস্বতীর মূর্তি। তারও খানিকটা আক্ষেপ, চোদ্দোপুরুষের কুলকর্ম ছেড়ে তাকেও কৃষক হতে হচ্ছে। দমদমের রিলিফ ক্যাম্পে পচে গলে মরার চেয়ে এ একরকম ভালোই।
কেউ বলল তার নাম রাধেশ্যাম কুণ্ডু, দেশ ছিল ঢাকা, গ্রাম মেদিনীমণ্ডল, পাইকারদের কাছ থেকে ধান চাল কিনে নিয়ে গঞ্জে বেচত। খুবই নগণ্য কারবারি কেউ ক্ষৌরকার বা নাপিত, সাবেক দেশ নোয়াখালি। কেউ ধোপা তার দেশ ছিল বগুড়া। খুলনা যশোরের দুজন রয়েছে, তারা দেশে বরজে পানের চাষ করে সংসার চালাত। এমনি নানা পেশার মানুষের সঙ্গে আলাপ হচ্ছে। তবে বেশিরভাগই কৃষিকর্ম করে এসেছে পুরুষানুক্রমে। ফলাত ধান, পাট, নানা ধরনের রবিশস্য।
উদ্বাস্তুদের সঙ্গে আলাপ করার ফাঁকে ফাঁকে বিনয়ের সঙ্গেও কথা বলছেন শেখরনাথ। স্বাধীনতার চেহরাটা কেমন দেখছ বিনয়? বলে ভুরুদুটো ওপর দিকে তুললেন।
তিনি কী ইঙ্গিত দিয়েছেন মোটামুটি তা আন্দাজ করতে পারছিল বিনয়। তবে উত্তর দিল না।
শেখরনাথ বলতে লাগলেন, এই যে মানুষগুলো চোদ্দো পুরুষের ভিটেমাটি খুইয়ে সমুদ্র পেরিয়ে এই সৃষ্টিছাড়া দ্বীপে টিকে থাকার চেষ্টা করছে, এমনটা কি ওরা কোনওদিন ভাবতে পেরেছিল? এ কেমন স্বাধীনতা যার জন্যে নিজের দেশ থেকে উৎখাত হতে হবে? হঠাৎ কী খেয়াল হতে একটু চুপ করে থেকে এবার বললেন, আরে কাকে কী বলছি! বিশুর কাছে শুনেছি, তুমিও তো মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে পাকিস্তান থেকে চলে এসেছ। যন্ত্রণাটা কতখানি তা তুমি জানো।
আস্তে মাথা নাড়ে বিনয়।
শেখরনাথ থামেননি, আন্দামানে যে কয়েকশো ফ্যামিলি এসেছে, আরও হাজারখানেক ফ্যামিলি আসবে–এরা হয়তো চাষ। আবাদ করে বেঁচে যাবে। কিন্তু কলকাতায় আর পশ্চিমবাংলার নানা জায়গায় রিলিফ ক্যাম্পে, রাস্তায়, স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে যে লাখ লাখ মানুষ পোকামাকড়ের মতো পড়ে রয়েছে তাদের কী হবে? পশ্চিমবাংলা কতটুকু স্টেট? তেত্রিশ হাজার স্কোয়ার মাইলের মতো এরিয়া। সেখানে এত লোকের জায়গা হবে কোথায়? কী হবে এদের ভবিষ্যৎ?
তিনি আরও যা বললেন তা এই রকম। ওড়িশা, মধ্যপ্রদেশ, বিহার, পূর্ব পাকিস্তানের ছিন্নমূল মানুষদের জন্য কিছু জমি দিতে চেয়েছে। কিন্ত কতটা জমি? কতজনের সেখানে পুনর্বাসন হবে? আসামে তো বহু উদ্বাস্তু চলে এসেছে। তাদের অনেককে খেদিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই সব বিতাড়িত অসহায় মানুষ এসে ভিড় জমাচ্ছে কলকাতায়, নর্থবেঙ্গলে। বিহার ওড়িশায় যারা যাবে তাদেরও যদি কোনওদিন তাড়ানো হয়?
শেখরনাথ বললেন, লক্ষ লক্ষ বাঙালিকে উৎখাত করে এই স্বাধীনতা এসেছে। পাঞ্জাবের সমস্যাটার সমাধান হয়ে যাবে। ওখানে টোটাল এক্সচেঞ্জ অফ পপুলেশন হয়ে গেছে। এখানকার মুসলমানদের ফেলে যাওয়া জমিতে এসে বসেছে ওপারের শিখ। আর জাঠেরা। ওপারের ফেলে আসা জমিতে গিয়ে বসেছে। এপারের পাঞ্জাবি মুসলমানরা। জমির জন্যে, পুনর্বাসনের জন্য ওয়েস্টার্ন ইন্ডিয়ায় কোনও সমস্যা নেই। তাছাড়া তাদের জন্য দরাজ হাতে টাকা ঢেলে দেওয়া হচ্ছে। আর বাঙালিদের জন্যে সেন্ট্রাল গভর্নমেন্টের হাত বড়ই কৃপণ। মুঠি খুলতেই চায় না। বলতে বলতে কণ্ঠস্বর তিক্ত হয়ে ওঠে, স্বাধীনতার স্বাদটা কেমন, বুঝতে পারছ? এই স্বাধীনতার জন্যেই কি হাজার হাজার সোনার ছেলে জেলের ঘানি ঘুরিয়েছে, ফাঁসির দড়িতে প্রাণ দিয়েছে?

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।