বিনয় উত্তর দিতে যাচ্ছিল, তার আগেই শেখরনাথ জিজ্ঞেস করেন, তুমি কি জানো রিহ্যাবিলিটেশন ডিপার্টমেন্টের পরিকল্পনাটা কী? বিশু তোমাকে কিছু বলেছে?
বিনয় বলে, কীসের পরিকল্পনা?
ওরা কি বুশ পুলিশের ঘাঁটি আর পেরিমিটার রোডের ও ধারের জঙ্গলও রিফিউজি সেটেলমেন্টের জন্যে সাফ করে ফেলবে?
আমি জানি না। রাহা সাহেব এ নিয়ে আমাকে কিছু বলেননি।
চিন্তাগ্রস্তের মতো শেখরনাথ বললেন, ও পাশের জঙ্গলে হাত। দেওয়া ঠিক হবে না। ওটা যেমন আছে তেমনই থাক। কেন। জানো?
কেন? বিনয় উৎসুক হল।
শেখরনাথ জানালেন, দক্ষিণ আন্দামানের উত্তর দিকের ওই জঙ্গলটা জারোয়াদের নিজস্ব এলাকা। পূর্ব পাকিস্তানের ছিন্নমূল মানুষজনের পুনর্বাসনের জন্য আন্দামানের আদিম বাসিন্দা জারোয়াদের উৎখাত করা খুবই অন্যায়। জঙ্গল গেলে ওদের রিহ্যাবিলিটেশন হবে কোথায়?
শেখরনাথ বললেন, সৃষ্টিধরের জমি পর্যন্ত জঙ্গল কাটা হয়ে গেছে। এই পর্যন্তই থাক। বিশুকে বলব এধারের ফরেস্টে যেন আর হাত না পড়ে। পরক্ষণে কী যেন খেয়াল হয় তার।–কিন্তু বিশুকে বলে কিছু হবে বলে মনে হয় না। যদি ওর ওপরের অথরিটি ঠিক করে থাকে উত্তরের বনবাদাড় শেষ করে ফেলবে, আমি কিন্তু ছাড়ব না। চিফ কমিশনার আন্দামান-নিকোবরের অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ হেড। আমি তার সঙ্গে দেখা করব। তাতেও যদি কাজ না হয়, ওঁর অফিসের সামনে ধর্নায় বসে যাব।
বিনয় লক্ষ করল, শেখরনাথের মুখটা কঠিন হয়ে উঠেছে। তার ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছে অদম্য, জেদি সেই পুরনো বিপ্লবীটি। সে একটু ধন্দে পড়ে যায়। শেখরনাথ যা বললেন তাতে এই দ্বীপে পুনর্বাসনের পরিকল্পনা ধাক্কা খাবে। কুণ্ঠার সুরে সে। বলে, কিন্তু
কী? উত্তর পাহাড়ের দিক থেকে চোখ সরিয়ে এনে শেখরনাথ। জিজ্ঞেস করেন।
বহু রিফিউজি এসে গেছে। তাদের সবাইকে এখনও জমি দেওয়া হয়নি। একমাসের ভেতর আরও অনেক রিফিউজি ফ্যামিলি এসে পড়বে। তাদেরও জমি দিতে হবে। জঙ্গল সাফ না করলে এত ল্যান্ড কোত্থেকে পাওয়া যাবে?
চোখ কুঁচকে একটু ভাবলেন শেখরনাথ। হ্যাঁ, সেটা একটা বড় সমস্যা। তবে তারও সলিউশন আছে। উত্তর দিকটা বাদ দিয়ে পুব আর পশ্চিমের জঙ্গল সাফ করা যেতে পারে। এই দুটো দিকে প্রচুর জমি বেরুবে। জারোয়ারাও নেই।
শেখরনাথের মনোভাবটা এখন স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। উদ্বাস্তুদের সম্পর্কে তার অপার সহানুভূতি, ওদিকে জারোয়াদের ওপরেও অফুরান মমতা। এখানকার জনজাতি তাদের নিজেদের বাসস্থানে চিরকাল যেভাবে থেকে এসেছে তেমনি থাক। তাদের উচ্ছেদ করলে তার ফলাফল হবে মারাত্মক। জঙ্গলে হাত পড়ায় এমনিতেই জারোয়ারা খুশি নয়, যদি উৎখাত হতে হয় তাহলে আরও হিংস্র হয়ে উঠবে।
একদিকে উদ্বাস্তুরা থাক, অন্যদিকে জাবোয়ারা। কোনওরকম বিশৃঙ্খলা, অশান্তি যেন না ঘটে। সহাবস্থানই তার কাম্য।
আলো ফুরিয়ে আসছে দ্রুত। কিছুক্ষণের মধ্যে ঝপ করে সন্ধে নেমে যাবে।
শেখরনাথ বললেন, চল, ফেরা যাক।
দুজনে দক্ষিণে ক্যাম্প অফিসের দিকে হাঁটতে লাগলেন।
এদিকে হাতিরা এ বেলার মতো গাছের গুঁড়ি ঠেলার পর ফিরে যাচ্ছে। সঙ্গে তাদের চালকেরা। উদ্বাস্তুরাও ঝোঁপ-জঙ্গল কেটে সার বেঁধে চলেছে। এদের মধ্যে অনেক বুড়োটুড়োও রয়েছে। বয়সের ভারে নুয়ে-পড়া, গায়ের কুঁচকানো চামড়া আলগা হয়ে ঝলঝল করছে, বেজায় দুর্বল। ধুকে ধুকে তারা হাঁটছে।
এই বয়স্ক, অশক্ত মানুষগুলোকে জমিতে কাজ করতে দেখেছেন শেখরনাথ। তখন সেভাবে লক্ষ করেননি। এখন তাদের ক্লান্ত বিধস্ত চেহারা দেখে বড় মায়া হল।
সৃষ্টিধরকেও দেখা যাচ্ছে। সে তার গর্ভবতী বউকে ধরে ধরে নিয়ে চলেছে মেয়েটির হাঁটতে খুব কষ্ট হচ্ছে। এলোমেলো পা ফেলছে। যদি কিছুতে টক্কর লেগে হোঁচট খেয়ে পড়ে যায়, মহা সর্বনাশ হয়ে যাবে। শেখরনাথ বললেন, এক জায়গা থেকে তুলে এনে এই মানুষগুলোকে বহুদুরের অচেনা দুর্গম একটা এলাকায় এনে ফেলা হল, কিছু জমিজমা দেওয়া হল। ব্যস, দায়িত্ব শেষ। বৃদ্ধেরা, প্রেগনান্ট মেয়েরা জঙ্গল সাফ করার মতো পরিশ্রমের কাজ কবে–এ কেমন কথা? এদের জন্যে কিছু একটা করতেই হবে। পুনর্বাসন বললেই পুনর্বাসন হয় না। দেশে যেভাবে তারা ছিল সেই পরিবেশ, সেই স্বাচ্ছন্দ্যটি তাদের তৈরি করে দিতে হবে।
» ২.০৭ ক্যাম্প অফিসের সামনে
ক্যাম্প অফিসের সামনের ফাঁকা মাঠটায় বিনয়রা যখন ফিরে এল, সন্ধে নামতে শুরু করেছে। অন্যদিনের মতোই উদ্বাস্তুরাও চলে এসেছিল। শ্রান্ত শরীর ছেড়ে দিয়ে তারা বসে পড়েছে। নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল। এলোমেলো, অসংলগ্ন। চারদিক থেকে ভনভনানির মতো গুঞ্জন উঠছে। এর মধ্যে পুনর্বাসনের কর্মীরা বড় বড় লণ্ঠন আর হ্যাঁজাক জ্বালিয়ে দিয়েছে। আলোর ভরে গেছে চারদিক।
জমি সাফাইয়ের কাজ করে এসে এই সময়টা খানিকক্ষণ জিরিয়ে নেয় উদ্বাস্তুরা। তারপর সমুদ্র থেকে হাতমুখ ধুয়ে আসে। আজও তা-ই করল তারা।
দুপুরে খাওয়াদাওয়া সেরে এতক্ষণ একটানা খাটাখাটনির পর খিদেও পায় জবর। পেটে আগুন জ্বলতে থাকে। খাবারের ব্যবস্থাও অবশ্য রয়েছে-চিড়ে, গুড় আর চা। পুনর্বাসনের একদল কর্মী সেসব নিয়ে তৈরিই ছিল।
বিশ্বজিৎ পোর্ট ব্লেয়ারে চলে পেছেন। যে দুটো দিন ছিলেন, এখানকার কলোনাইজেশন অ্যাসিস্টান্ট একটা খাপের ভেতর যেন গুটিয়ে ছিল। এখন সে এই সেটেলমেন্টের হর্তাকর্তা। তার চেহারাটাই পালটে গেছে। হাঁকডাক করে উদ্বাস্তুদের চিঁড়েটিড়ে দেবার ব্যবস্থা করতে লাগল।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।