এইসব মরণজয়ী বিপ্লবীদের একজন শেখরনাথ। মেনল্যান্ডে সত্যাগ্রহ করে জেল খেটেছে, এমন কয়েকজনকে আগে দেখেছে বিনয় কিন্তু কালাপানি পার হয়ে সেলুলার জেলে বন্দি ছিল, এমন কারও সঙ্গে কথাও হয়নি। অবাক বিস্ময়ে শেখরনাথের দিকে তাকিয়ে থাকে বিনয়। বুকের ভেতর অদ্ভুত এক শিহরন; গায়ে যেন কাটা দিচ্ছিল তার।
বিহ্বল ভাবটা কাটিয়ে উঠতে একটু সময় লাগল। তারপর ঝুঁকে শেখরনাথের পা ছুঁতে যাচ্ছিল। শেখরনাথ তার দুধ ধরে তুলে। ধরে হেসে হেসে বললেন, থাক থাক। পায়ে ধুলো-ময়লা লেগে আছে। হাত দিলে নোংরা লেগে যাবে।
বিনয় বলল, বিশ্বজিৎবাবুর মুখে শুনেছিলাম, খুব শিগগিরই আপনি এখানে আসবেন। আপনার জন্যে অপেক্ষা করছিলাম। রোজই ভাবি, এই বুঝি এলেন।
বিশু বলেনি, আমি লিটল আন্দামানে গিয়েছিলাম।
হ্যাঁ-হ্যাঁ, বলেছেন। সেই দ্বীপটা কত দূরে? পোর্ট ব্লেয়ার থেকে ষাট-পঁয়ষট্টি মাইল হবে। ওটাই হল আন্দামানের সাদার্নমোস্ট আইল্যান্ড। ঔখানে কারা থাকে জানো?
না। আমি তো এই প্রথম আন্দামানে এসেছি। পোর্ট-ব্লেয়ারে নামার পরই তো জেফ্রি পয়েন্টে চলে এলাম। আর কোথাও যাবার সময়ই পাইনি।
তা ঠিক। লিটল আন্দামানে থাকে ওঙ্গেরা। আন্দামানের আদিম ট্রাইবদের একটা। এরা কালো কালো পিগমি। সাড়ে চার ফিটের মতো হাইট। সংখ্যায় কত জানো? মাত্র চারশো একান্ন। ক্রমশ এরা কমে আসছে। ভয় ছিল, হয়তো একদিন ট্রাইবটা আর থাকবে না। একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। কিন্তু হঠাৎ খবর পেলাম, ওদের দুটো বাচ্চা হয়েছে। শুনে ভীষণ আনন্দ হল, জেলেদের ট্রলারে চেপে চলে গেলাম। তাছাড়া যাবার আরও একটা কারণও ছিল।
বিনয় উৎসুক চোখে তাকিয়েই থাকে।
শেখরনাথ বলতে লাগলেন, হাজার হাজার ছোট কচ্ছপ সমুদ্র। সাঁতরে এই সময়টা লিটল আন্দামানে আর নিকোবরে বালির চড়ায় ডিম পাড়তে আসে। সে একটা আশ্চর্য দৃশ্য। একসঙ্গে এত কচ্ছপ, কল্পনাও করতে পারবে না। চোখ ফেরানো যায় না।
কচ্ছপের ঝাঁক দেখলেন?
দেখলাম তো।
এমন এক বিপ্লবী, যিনি বন্দুক পিস্তল হাতে ইংরেজ পুলিশের সঙ্গে মরণপণ লড়াই করেছেন, তিনিই কিনা ওঙ্গেদের বাচ্চা আর কচ্ছপদের ডিম পাড়া দেখার জন্য জেলেদের ট্রলারে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে সেই কতদূরে চলে গিয়েছিলেন! বিস্ময়ের সীমা-পরিসীমা থাকে না বিনয়ের। হঠাৎ কিছু মনে পড়ায় সে চকিত হয়ে ওঠে, আপনি যে ওঙ্গেদের ওখানে চলে গেলেন বিপদ হতে পারত তো?
একটু অবাক হয়েই শেখরনাথ জিজ্ঞেস করেন, কীসের বিপদ?
এখানকার ট্রাইবরা তো ভীষণ হিংস্র। তারা বিনয়কে হাত তুলে থামিয়ে দিলেন শেখরনাথ। জানালেন ওঙ্গেরা খুবই নিরীহ। শান্ত। মাত্র কিছুদিন হল আগুন ব্যবহার করতে শিখেছে। তির দিয়ে সমুদ্র থেকে মাছ শিকার করে আগুনে ঝলসে খায়। শেখরনাথ অনেকবার লিটল আন্দামানে গেছেন। তাকে দেখলে ওরা খুশি হয়।
হঠাৎ কয়েকদিন আগের সেই রাতের ভয়ংকর দৃশ্যটা চোখের সামনে ভেসে আসে। বিনয় বলে, কিন্তু
কী?
এখানকার জঙ্গলে যে ট্রাইবটা আছে তারা কিন্তু ভীষণ হিংস্র।
তুমি জারোয়াদের কথা বলছ?
হ্যাঁ।
সেদিন রাতে আচমকা এই সেটেলমেন্টে হানা দিয়ে জারোয়ারা আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছিল সেটা সংক্ষেপে জানিয়ে বিনয় বলল, রিফিউজিরা তো ওই ঘটনার পর জেফ্রি পয়েন্টে এক মুহূর্তও থাকতে চাইছিল না। পারলে সেই রাত্তিরেই সবাই কলকাতায়। ফিরে যায়। বিশ্বজিৎবাবু বিভাসবাবু নিরঞ্জনবাবুরা অনেক বুঝিয়েসুঝিয়ে তাদের ঠান্ডা করেন।
একটু চুপ করে থাকেন শেখরনাথ। তারপর বলেন, জারোয়ারা ওঙ্গেদের মতো শান্তশিষ্ট নয়। ওরা খুবই উগ্র ধরনের। তার কারণও আছে।
বিনয় উৎসুক হল। কী কারণ?
শেখরনাথ বললেন, তুমি তো উদ্বাস্তুদের সঙ্গে এই খেপে কলকাতা থেকে এসেছ। প্রথমে রস আইল্যান্ডে নেমেছিলে। তারপর এসেছিল পোর্টব্লেয়ারের এবারডিন মার্কেটের সামনে। তাই তো? জারোয়াদের প্রসঙ্গে এসব কথা আসছে কেন! বুঝতে পারল না বিনয়। শুধু বলল, হ্যাঁ।
সেলুলার জেল তৈরি হবার আগে ইংরেজ পুলিশ প্রায় চল্লিশজন জারোয়াকে ধরে এনে গুলি করে মারে। সেই থেকে প্রচণ্ড হিংস্র হয়ে উঠেছে ওরা। তারা চায় না, বাইরের থেকে সো কলড সভ্য জগতের কেউ এসে তাদের জঙ্গল পাহাড় দখল করে বসুক। অনেকদিনের সেই ঘটনা। কিন্তু জেনারেশনের পর। জেনারেশন তারা ক্রোধটা পুষে রেখেছে।
ইংরেজ পুলিশ জারোয়াদের খুন করেছিল কেন?
সেসব পরে শুনো। চল, সেটেলমেন্টের কাজ দেখি। সেই সঙ্গে তোমার কথাও শুনব। বিশু তোমার সম্পর্কে কিছু কিছু বলেছে, তবে আমি ডিটেলে সব শুনব।
কিন্তু তার আগে আপনার কথা শোনাতে হবে। সেই যে। বাইশ-তেইশ বছর আগে সেলুলার জেলে আপনাকে পাঠানো হল তখন থেকে
বিনয়কে থামিয়ে দিলেন শেখরনাথ।–তোমাকে নিয়ে সময় পেলেই একদিন সেলুলার জেলে যাব। তখন সব শুনো
সেলুলার জেল দেখতে যাবার কথা বিশ্বজিতের সঙ্গে আগেই হয়েছিল। চিফ রিপোর্টার প্রসাদদা, নিউজ এডিটর তারাপদ ভৌমিক তো বটেই নতুন ভারত-এর মালিক এবং সম্পাদক জগদীশ গুহঠাকুরতা বার বার বিনয়কে বলে দিয়েছিলেন, সেলুলার জেলের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ভারতবর্ষের বাস্তিল এই কুখ্যাত কারাগারের ইতিহাস, কী নির্মমভাবে কয়েদিদের, বিশেষ করে সশস্ত্র বিপ্লবীদের ওপর নির্মম অত্যাচার চালানো হত তা নিয়ে বিশদভাবে পাঁচ-সাতটা প্রতিবেদন যেন অবশ্যই পাঠায়।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।