বিনয় রোজ সকালে রিহ্যাবিলিটেশনের কর্মী এবং উদ্বাস্তুদের সঙ্গে জঙ্গলে চলে যায়। জমি মাপামাপি দেখে। দুপুরে সবার সঙ্গে ফিরে চান-খাওয়া এবং বিশ্রাম। তারপর আবার জঙ্গলে গিয়ে ঢাকা। দিনের আলো যতক্ষণ থাকে সেখানেই কাটিয়ে আসে। রাত্তিরে খাওয়া দাওয়ার পর বিশ্বজিতের ঘরে এসে সারাদিনে যা-যা দেখল তার প্রতিবেদন লিখতে বসে।
বিশ্বজিৎ পোর্ট ব্লেয়ার চলে গেছেন। পুরো ঘরখানা এখন একা বিনয়ের দখলে।
ওধারে ব্যারাক দুটোর সামনের দিকে মস্ত ফাঁকা চত্বরটায় কাঠের মোটা মোটা অগুনতি খুঁটি পুঁতে তার ওপর চেরা বাঁশের পাটাতন বসিয়ে বিরাট মঞ্চ বানিয়েছে মোহনবাঁশিরা। শখানেক মানুষ সেখানে ঘেঁষাঘেঁষি করে বসতে পারে।
রাত্তিরে খাওয়াদাওয়া চুকলে মোহনবাঁশি সহদেবরা একতারা দোতারা সারিন্দা, এমনি সব বাদ্যযন্ত্র নিয়ে আজকাল রোজই গানবাজনার আসর বসাচ্ছে।
বিশ্বজিতের ঘরে বসে রিপোর্ট লিখতে লিখতে গান শোনে। বিনয়। এই নির্জন দ্বীপ মায়াবী সুরের দোলায় যেন অলীক কোনও স্বপ্নের দেশ হয়ে ওঠে। কী ভালো যে লাগে বিনয়ের।
.
বিশ্বজিৎ চলে যাবার তিন দিন বাদে দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর সবার সঙ্গে রোজকার মতো জঙ্গলে গেছে বিনয়। পুরোদমে কাজ চলেছে চারদিকে। হঠাৎ গাড়ির আওয়াজে ডান দিকে তাকায় সে। ওধারে উপত্যকার তলায় উদ্বাস্তুদের জন্য লম্বা লম্বা ব্যারাক আর সেটেলমেন্টের ক্যাম্প অফিস। সে সবের পেছন দিকে পাহাড়।
বিনয় দেখতে পেল, একটা জিপ পাহাড়টার গা বেয়ে নেমে আসছে। বিশ্বজিৎ বা পুনর্বাসন দপ্তরের অন্য কোনও অফিসারের তো আজ আসার কথা নয়। তারা এলে কলোনাইজেশন অ্যাসিস্টান্ট পরিতোষ বণিককে আগেভাগেই জানিয়ে দেওয়া হয়। পরিতোষের সঙ্গে প্রায় সারাক্ষণই তো কাটে বিনয়ের। কেউ আসবেন, এমন খবর পেলে সে নিশ্চয়ই জানিয়ে দিত। কে আসতে পারে তাহলে?
বিনয় লক্ষ করল, জিপটা ক্যাম্প অফিসের সামনে এসে থামল। সঙ্গে সঙ্গে গাড়িটা থেকে যিনি নামলেন তাঁর বয়স তিপ্পান্ন-চুয়ান্নর মতো। মাঝারি হাইট। মাথায় কাঁচাপাকা এলোমেলো চুল, চোখে চশমা। পরনে পাজামা এবং খাটো ঝুলের শার্ট। দূর থেকে এর বেশি আর কিছু বোঝা গেল না।
ক্যাম্প অফিসের কাছাকাছি দু-তিনজন কর্মী কী করছিল, তারা দৌড়ে বয়স্ক লোকটির কাছে চলে এল। তাদের সঙ্গে দু-এক মিনিট কী কথা বললেন, তারপর জঙ্গলের দিকে লম্বা লম্বা পায়ে হাঁটতে শুরু করলেন। কর্মী দুটি তার পিছুপিছু আসছিল। তিনি হাত তুলে তাদের থামিয়ে দিলেন। বোঝা গেল, তিনি একাই। জঙ্গলে আসতে চান, পথ দেখাবার জন্য কারওকে দরকার নেই।
কর্মী দুজন আর এগুল না। মাঝবয়সি লোকটি সোজা জঙ্গলে চলে এলেন।
তাঁকে দেখে আমিন লাডিন, চেনম্যান ধনপত এবং পুনর্বাসনের অন্য কর্মীরা কাজকর্ম ফেলে দৌড়ে এল। সসম্ভ্রমে মাথা ঝুঁকিয়ে কেউ বলল, সালাম, কেউ বলল, নমস্তে- কেউ বলল, আপকা তবিয়ত ঠিক হ্যায় তো?
মধ্যবয়সি মানুষটি যে সামান্য লোক নন, লা ডিনদের সসম্ভ্রমে কথা বলতে দেখে সেটা আন্দাজ করতে পারছিল বিনয়।
কাছাকাছি আসায় মানুষটিকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। রোগা, ক্ষয়াটে চেহারা, গাল ভাঙা, হাতের শিরাগুলো প্রকট। কণ্ঠার হাড় চামড়া কুঁড়ে বেরিয়ে এসেছে। আরও একটা ব্যাপার চোখে পড়ল। তাঁর দুই হাতের কবজিতে মোটা কালচে দাগ। অনেকদিন হাতে গোলাকার ধাতুর জিনিস পরিয়ে রাখলে যেমন হয়, ঠিক সেইরকম আর কী।
মধ্যবয়সী, দেখা গেল, সবাইকে চেনেন। প্রত্যেককে আলাদা আলাদা করে জিগ্যেস করলেন, তুমি কেমন আছ লা ডিন? তুমি কেমন আছ ধনপত? ইত্যাদি।
সবাই জানায়, মাঝবয়সির মেহেরবানিতে তারা ভালোই আছে।
বয়স্ক মানুষটি বললেন, কাজ বন্ধ করে গল্প নয়। তোমরা যাও। পরে কথা হবে।
লা ডিনদের সঙ্গে তিনি কথাবার্তা বলছিলেন ঠিকই কিন্তু তাঁর চোখ বারবার বিনয়ের দিকে চলে যাচ্ছিল। ভিড়টা হালকা হয়ে। গেলে তিনি এগিয়ে এলেন। একটু হেসে বললেন, আমার যদি ভুল না হয়ে থাকে, তুমি নিশ্চয়ই বিনয়। কলকাতার কাগজের রিপোর্টার?
বিনয় অবাক। বলল, আপনি আমাকে চিনলেন কী করে?
আগে আমাদের কখনও দেখা হয়েছে বলে তো মনে হয় না।
না, হয়নি। তবু তোমার কথা আমি জানি। আমার নাম শেখরনাথ রাহা; হয়তো নামটা শুনেছ। আমি বিশ্বজিতের কাকা। বিশুর কাছে তোমার কথা শুনেছি।
বোঝাই যায় বিশ্বজিতের ডাকনাম বিশু। এই মানুষটি ইংরেজ রাজত্বের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আন্দোলন করতে গিয়ে ধরা পড়েছিলেন। তারপর দ্বীপান্তরী সাজা দিয়ে তাঁকে আন্দামানে পাঠানো হয় উনিশশো পঁচিশে। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে এবং পরে কত বিপ্লবী ভারতের মেনল্যান্ডে ফিরে গেছেন কিন্তু শেখরনাথ ফেরেননি। বঙ্গোপসাগরের এই দ্বীপপুঞ্জেই থেকে গেছেন।
সাভারকার, উল্লাসকর দত্ত থেকে শেখরনাথ পর্যন্ত কত বিপ্লবীর নামই তো শুনেছে বিনয়। এঁরা সবাই পরমাশ্চর্য রূপকথার সব নায়ক। অসমসাহসী, আদর্শবাদী, আদ্যোপান্ত দেশপ্রেমিক। ভারতকে স্বাধীন করাই ছিল তাদের একমাত্র লক্ষ্য। যে ইংরেজদের রাজত্বে কোনওদিন সূর্যাস্ত হত না সেই বিপুল অপরাজেয় শক্তির বিরুদ্ধে দুর্জয় মনোবলে এঁরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। মৃত্যু এঁদের কাছে ছিল নেহাতই ছেলেখেলার জিনিস। মহা কৌতুকে তিন তুড়িতে মৃত্যুর চিন্তাকে তারা উড়িয়ে দিতেন। বিচারক যাবজ্জীবন কারাবাস মৃত্যুদণ্ডের সাজা দিলে এঁরা হেসে হেসে গড়িয়ে পড়তেন। যেন এরচেয়ে মজার কথা ভূভারতে কেউ কোনওদিন শোনেনি।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।