ফাইন। আমাকে দিন। সুটকেসে ভরে ফেলি।
.
চান-খাওয়া চুকিয়ে ঘণ্টা দেড়েক জিরিয়ে নিলেন বিশ্বজিৎ। এর মধ্যে একটা লম্বা ফর্দ দিয়ে গিয়েছিল পরিতোষ। এখানকার ভঁড়ার প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। বুড়োধুড়ো বাচ্চাকাচ্চা, যুবকযুবতী ইত্যাদি নানা বয়সের কয়েকশো ছিন্নমূল মানুষ ছাড়াও রয়েছে। পুনর্বাসন এবং বনবিভাগের কর্মীরা। এতগুলো লোকের জন্য রোজ চারবেলা চুলো ধরাতে হবে। হিসেব করে পনেরো দিনের মতো চালডাল সবজি তেল মশলা চা চিনি গুঁড়ো দুধ, এমনি কতটা করে দরকার লিখে দিয়েছে পরিতোষ। রসদ ফুরবার দু-চার দিন আগে আবার পোর্ট ব্লেয়ারে নতুন তালিকা পাঠিয়ে দেবে সে। বেলা পড়ে এলে বিশ্বজিৎ তাঁর জিপে উঠে পড়লেন। সঙ্গে গেল বিভাস আর নিরঞ্জন। বিনয়, পরিতোষ এবং দু-তিনজন কর্মী। ওদের সঙ্গে সঙ্গে জিপটা যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেই পর্যন্ত গেল। বাকি সবাই জঙ্গলে আগেই চলে গিয়েছিল। জমি বিলির কাজ একবেলার জন্যও বন্ধ রাখা যাবে না। বিশ্বজিতের কড়া নির্দেশ দশ দিনের ভেতর মাপজোক করে সীমানা বরাবর বাঁশের খুঁটি পুঁতে প্রতিটি উদ্বাস্তু পরিবারকে বরাদ্দ জমি বুঝিয়ে দিতে হবে। কোনওরকম ঢিলেমি বরদাস্ত করা হবে না। দশ মানে দশ দিনই। তার বেশি একদিনও যদি দেরি হয় তার ফলাফল হবে মারাত্মক। পুনর্বাসন দপ্তরের কর্মীরা হাড়ে হাড়ে জানে রাহাসাহেব কী ধরনের জবরদস্ত অফিসার। এক সময় ড্রাইভার স্টার্ট দিল। বিশ্বজিৎদের গাড়িটা পাহাড়ের গা বেয়ে পেঁচানো রাস্তায় পাক খেতে খেতে একটা বাকের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল।
২.০৬ বিশ্বজিৎ চলে যাবার পর
বিশ্বজিৎ চলে যাবার পর দিন তিনেক কেটে গেছে। এর মধ্যে বিশাল বিশাল মহাবৃক্ষ তো বটেই, ছোট মাঝারি গাছগুলোর নামও ধনপতের কাছ থেকে জেনে নিয়েছে বিনয়। শুধু তা-ই না, ঝোঁপঝাড় লতাগুল্ম সবই চিনিয়ে দিয়েছে ধনপত। সেই কতকাল আগে কালাপানির সাজা খাটতে এখানে এসেছিল সে। বনবিভাগে চেনম্যানের কাজ নিয়ে দ্বীপে দ্বীপে ঘুরতে ঘুরতে আন্দামানের আদিম অরণ্যের নাড়িনক্ষত্র জেনে গেছে সে।
সেই সকাল থেকে বনদপ্তরের একদল কর্মী প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড করাত দিয়ে বিশাল বিশাল মহাবৃক্ষ যেমন দিদু চুগলুম প্যাডক বা ঝাড়ালো রেনট্রি গুলো কেটেই চলেছে, কেটেই চলেছে। সমস্ত বনভূমি জুড়ে আওয়াজ উঠছে– ঘসর ঘস, ঘসর ঘস।
অন্যদিকে জমি মেপে উদ্বাস্তুদের মধ্যে বিলির কাজও চলছে পুরোদমে। যারা যারা জমি পেয়েছে তারা কোদাল দা করাত ইত্যাদি হাতিয়ার দিয়ে ঝোঁপঝাড় ছোট গাছ টাছ নির্মূল করার কাজ শুরু করে দিয়েছে। যার নামে জমি দেওয়া হল সে-ই শুধু নয়, তার ফ্যামিলির সবাই ছেলেমেয়ে বউ তার সঙ্গে হাত লাগিয়েছে। সব চেয়ে বেগ দিচ্ছে উদ্দাম জলডেঙ্গুয়া। অর্থাৎ বনতুলসীর ঝাড়গুলো। সেগুলোর শিকড় মাটির গভীরে বহুদূর অবধি ছড়িয়ে আছে। উপড়ে ফেলা কি মুখের কথা!
সেদিন যে চারটে হাতি নিয়ে তিরুর থেকে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের আজীব সিংরা এসেছিল তারাও হাত-পা গুটিয়ে বসে নেই। এখানে পৌঁছুবার পরদিন থেকেই হাতিগুলোকে সে এবং তার সঙ্গীরা কাজে লাগিয়ে দিয়েছে।
যে মস্ত মস্ত ট্রাকে চাপিয়ে হাতিগুলো আনা হয়েছিল সে দুটো ব্যারাকগুলোর ডান পাশে, খানিকটা দূরে নামিয়ে আনা হয়েছে। তারপর ট্রাকের পেছন দিকটা খুলে একটা কংক্রিটের ঢালু পাটাতন মাটিতে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে।
যেসব বড় গাছ আগেই কাটা হয়েছিল সেগুলোর খণ্ড খণ্ড গুঁড়ি, মোটা মোটা ডাল চারিদিকে উঁই করে রাখা আছে।
দুই মাহুত জিভ দিয়ে অদ্ভুত টকাস টকাস শব্দ করতেই তাদের দুই হাতি থামের মতো ভারী ভারী পা দিয়ে ধাক্কা মারতে মারতে ট্রাকের পাটাতন অবধি নিয়ে আসছে; তারপর গুঁড়ে পেঁচিয়ে পাটাতনের মসৃণ গড়ানে গায়ের ওপর দিয়ে ঠেলে ঠেলে ট্রাকে তুলে দিচ্ছে। ট্রেনিং পাওয়া শিক্ষিত হাতি। মাহুতের জিভের আওয়াজে কী সংকেত থাকে, সেটা নিমেষে তারা বুঝে ফেলে। বিনয় লক্ষ করেছে ট্রাক দুটো বোঝাই হলেই ড্রাইভার আর বনদপ্তরের চারজন কর্মী সে দুটো নিয়ে চলে যাচ্ছে। সে শুনেছে। সরকারি করাতকলে গাছের গুঁড়িটুড়ি পৌঁছে দিয়ে তারা ফিরে আসছে। এভাবে দুখেপ তারা গেল এবং এল। যতদিন গাছ কাটা হবে লরিগুলোকে যাতায়াত করতেই হবে।
দুটো হাতি গাছের গুঁড়ি ট্রাকে তোলে। বাকি দুটোর কাজ অন্যরকম। যেসব বড় গাছ কাটার পর শিকড়বাকড় সমেত খানিকটা অংশ মাটির ওপরে এবং নিচে থেকে গেছে সেগুলোও তাদের দিয়ে পুরোপুরি উপড়ে ফেলা হচ্ছে। পদ্ধতিটা এইরকম। কেটে ফেলার পর মাটির ওপরে তিন-চার হাত অংশটা থাকছে তাতে মোটা বঁড়শির মতো লোহার মস্ত হুক ঢুকিয়ে তার সঙ্গে স্টিলের শিকল আটকে হাতির গলায় সেই শিকলের একটা দিক বেঁধে দেওয়া হচ্ছে। তারপর সহিস জিভ চকচক করে সুরেলা আওয়াজ করে চলেছে। এই শব্দটাও সংকেত। হাতি দুটো প্রবল শক্তিতে টানাটানি করে শিকড়টিকড় নিয়ে গাছের শেষ অংশটা তুলে ফেলছে। সেগুলো ট্রাকে তুলে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
জেফ্রি পয়েন্টের পাহাড় সমুদ্র এবং দুর্গম অরণ্যে ঘেরা এই এলাকাটা জুড়ে সকাল থেকে সন্ধের আগে পর্যন্ত তুমুল কর্মকাণ্ড চলছে। দক্ষিণ আন্দামানের এমন একটা এলাকায় নতুন সেটেলমেন্ট গড়ে তোলা কি সহজ কাজ!!

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।