লা পোয়েকে কাগজে লেখার কথাই শুধু বলল বিনয়। ঝিনুকের ব্যাপারটা পুরোপুরি গোপন রাখল। বিশ্বজিৎ বলেছিলেন, তাকে অবশ্যই মিডল আন্দামানে পাঠাবার ব্যবস্থা করবেন। করতেনও। সেজন্য কতদিন অপেক্ষা করতে হবে, কে জানে। কিন্তু অযাচিতভাবে এই সেল কালেক্টরগুলো এসে পড়েছে। এতবড় একটা সুযোগ কোনওক্রমেই হাতছাড়া করা যাবে না।
বিনয় জিজ্ঞেস করল, মিডল আন্দামানে তো এক সপ্তাহ থাকবেন। তারপর?
লা পোয়ে বলল, ফির সাউথ আন্দামানে এসে সিপি তুলব। সে বুঝিয়ে দেয়, এইভাবে কয়েকদিন দক্ষিণ আন্দামান, কয়েকদিন মধ্য আন্দামানে ঘুরে ঘুরে তারা পুরো সিজন ধরে সমুদ্রের তলা থেকে শঙ্খ কড়ি টার্বো ট্রোকাসনটিনাস ইত্যাদি তুলে আনে। বিনয় বলল, ওখানে কলোনি বানানো হচ্ছে। নিশ্চয়ই সেসব কাজ দেখাশোনার জন্য সরকারি ক্যাম্প অফিস বসেছে।
জি, হাঁ। আমি ওখানকার সি এ-কে (কলোনাইজেশন অ্যাসিস্ট্যান্ট) চিনি। নাম বিজয় জেয়ারদার। বহুৎ আচ্ছা আমি।
বিনয় উৎসাহিত হয়ে ওঠে, শুধু মধ্য আন্দামানে গেলেই তো হয় না। গেলাম, গিয়েই সঙ্গে সঙ্গে ঝিনুকের সন্ধান পেয়ে যাব তা তো আর হয় না। খোঁজাখুঁজি করতে দু-চার দিন কি তারও বেশি সময় লেগে যেতে পারে। সেখানে থাকবে কোথায়? জেফ্রি পয়েন্টের ক্যাম্প অফিসের মতো ওখানকার ক্যাম্প অফিসই একমাত্র ভরসা। লা পোয়ে জানিয়েছে বিজয় জোয়ারদার মানুষটি ভালো। কিন্তু তার মতো অচেনা উটকো লোককে সে কি ক্যাম্প অফিসে থাকতে দেবে?
বিনয় বলল, আমাকে কিন্তু বিজয় জোয়ারদারের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিতে হবে।
লা পোয়ে মাথা হেলিয়ে দেয়।জরুর।
একটু ভেবে বিনয় বলল, আমি ওখানে কয়েকদিন থাকতে চাই। ওরা থাকতে দেবে কি?
এর চেয়ে বিস্ময়কর কথা আগে আর বুঝি কখনও শোনেনি লা পোয়ে। দুচার লহমা হা করে তাকিয়ে থাকে সে। তারপর যা বলে তা এইরকম। বিনয় রাহা সাহেবের দোস্ত, আখবরে কাজ করে, এসব শোনার পর তাকে মাথায় করে রাখবে বিজয় জোয়ারদার। চিন্তার কারণ নেই।
বিনয়ের দুর্ভাবনা কেটে যায়। সে বলে, আপনারা সিপি তুলবেন, আমি আমার কাজ সারব। তারপর আমাকে আবার এই জেফ্রি পয়েন্টে পৌঁছে দিয়ে যেতে হবে।
আলবত।
কথায় কথায় ওরা বিচে চলে এসেছিল। লা পেয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে সেলাম ঠুকে বলল, আজ আমরা যাই। দশ-পন্দ্র রোজ বাদ এসে আপনাকে নিয়ে যাব।
বিনয় মাথা কাত করে একটু হাসে। বিশ্বজিৎ রাহার বন্ধু হওয়ার কারণে আন্দামানের লোকজন তাকে যথেষ্ট খাতির করছে।
লা পোয়েরা সমুদ্রের জলে নেমে তাদের মোটর বোটে নিয়ে ওঠে। আর বিনয় ফিরে আসতে থাকে।
ক্যাম্প অফিসের কাছাকাছি যখন পৌঁছে গেছে; কোত্থেকে পরিতোষ দৌড়াতে দৌড়াতে এসে হাজির। বলল, আপনে সকালের খাওয়া খান নাই। আপনেগো ঘরে পাঠাইয়া দিমু?
ঘুমভাঙার পর সমুদ্রে মুখ ধুতে গিয়েছিল বিনয়, তারপর লা পোয়েদের সঙ্গে দেখা, তাদের নিয়ে বিশ্বজিতের সঙ্গে দেখা করানো, নানারকম কথাবার্তা, এসবের মধ্যে বেলা অনেকটা চড়ে গিয়েছিল। খাওয়ার কথা একেবারেই খেয়াল ছিল না।
যে কদিন জেফ্রি পয়েন্টে বিনয় থাকবে তার সুবিধা-অসুবিধার দিকে পরিতোষকে নজর রাখতে বলেছিলেন বিশ্বজিৎ। যতটা সম্ভব বিনয়ের স্বাচ্ছন্দ্যের যেন ব্যবস্থা করা হয়। পরিতোষ সেটা ভোলেনি, অক্ষরে অক্ষরে পালন করে চলেছে। সকালে সবার খাওয়া হয়ে গেছে, শুধু বিনয়ই খেতে আসেনি। সেটা লক্ষ রেখেছিল পরিতোষ।
বিনয় বিব্রতভাবে বলল, নানা, পাঠাতে হবে না, আমি নিজে গিয়ে খেয়ে আসছি।
ক্যাম্প অফিসের সামনে যেখান থেকে উদ্বাস্তু এবং পুনর্বাসন বিভাগের কর্মীদের চারবেলা খাবার দেওয়া হয়, সেখানে চলে এল বিনয়। জায়গাটা প্রায় শুনশান। দুচারজন মুখ চেনা কৰ্মী ছাড়া অন্য কেউ নেই। পরিতোষ ব্যস্তভাবে তাদের বলল, বিনয়বাবুর খাওন হয় নাই। তেনারে খাইতে দাও।
সকালের খাবার হল হাতে-গড়া রুটি-তরকারি আর চা। কোনও কোনওদিন চিড়ে-গুড়-টুড়। আজ রুটি হয়েছিল। শালপাতার থালায় খাবার সাজিয়ে বিনয়কে দেওয়া হল।
তাড়াহুড়ো করে খাওয়া সেরে বিশ্বজিতের ঘরে এসে কালকের সেই লেখাটা নিয়ে বসে পড়ল সে। প্রতিবেদনটা শেষ করতে করতে ঘণ্টাদেড়েক লেগে গেল। সেটা একটা খামে পুরে মুখ আঠা দিয়ে আটকে দিল। খামের ওপর প্রসাদের নাম-ঠিকানা লিখে দিল।
আগেও দুটো প্রতিবেদন এবং সুধা আর আনন্দকে চিঠি লিখে খামে ভরে রেখেছিল। তিনটে প্রতিবেদন এবং দুখানা চিঠি–সব মিলিয়ে পাঁচটা খাম।
লেখালেখি শেষ হতে সূর্য মাথার ওপর সরাসরি উঠে এল। আর তখনই নানা মানুষের গলা কানে আসতে লাগল। জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বিনয় দেখতে পায়, উদ্বাস্তু এবং পুনর্বাসনের কর্মীরা জঙ্গল থেকে ফিরে আসছে। সবাই একসঙ্গে নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। ফলে যে শব্দপুঞ্জের সৃষ্টি হচ্ছে সেটা লক্ষ কোটি মাছির ভনভনানির মতো শোনাচ্ছে। বিনয় বুঝতে পারে এ বেলার মতো জমি বিলি শেষ। চান-খাওয়া এবং খানিকক্ষণ জিরিয়ে নেবার পর ওবেলা ফের সবাই জঙ্গলে গিয়ে দ্বিতীয় দফার কাজ শুরু করবে।
বিশাল জনতার সামনের দিকে রয়েছেন বিশ্বজিৎ। তিনি সোজা ঘরে চলে এলেন। জিজ্ঞেস করলেন, কি লেখা শেষ?
বিনয় জানায়, এইমাত্র শেষ করলাম। চিঠি এবং রিপোর্টের থামগুলো আলাদা আলাদা করে রেখে দিয়েছি।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।