লা পোয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে জানায় বড়ে সাহেবের হুকুম নিশ্চয়ই তামিল করা হবে। কলকাতার পত্রকারজি যেদিন চাইবেন সেদিনই তাঁকে জাজিরার (দ্বীপের) চার পাশ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে তাদের কার্যকলাপ দেখানোর বন্দোবস্ত করবে তারা।
বিনয়ের কৌশলের প্রথম ধাপটা মাপে মাপে খেটে গেল। বিশ্বজিৎ তাঁর কথায় রাজি হয়েছেন। পরের ধাপটা ঠিক করে নিতে হবে লা পোয়ের সঙ্গে। সেটা কোনওভাবেই বিশ্বজিৎকে জানানো হবে। না পরে তিনি নিশ্চয়ই জানতে পারবেন। তখন। ঝিনুকের ব্যাপারটা না বলে পারা যাবে না। সব শুনলে তিনি বিরক্ত তো হবেনই না, বরং সহানুভূতিই জানানে, এমন বিশ্বাস তার আছে।
লা পোয়েরা লম্বা সেলাম ঠুকে বিশ্বজিতের কাছ থেকে বিদায় নিল। অব যাতা হুঁ বড়ে সাহাব।
লা পেয়োদের এখন কোনওভাবেই ছাড়া যাবে না। তাদের সঙ্গে বোঝাঁপড়াটা ঠিক করে নিতে হবে। বিনয় বলল, আমিও যাই। কালকের সেই লেখাটা ইনৰ্মপ্লিট রয়েছে। ওটা শেষ করে ফেলি গিয়ে।
হ্যাঁ হ্যাঁ যান। আমি দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর একটু রেস্ট নিয়ে পোর্ট ব্লেয়ার ফিরে যাব। তার ভেতর যা যা দেবার সব রেডি করে রাখবেন।
বিনয় লা পোয়েদের সঙ্গে রিহ্যাবিলিটেশনের ক্যাম্প অফিসের দিকে হাঁটতে লাগল। চলতে চলতে সমানে বকরবকর করছে লা। পোয়ে। তার মুখে অনবরত একই কথা–বিশ্বজিৎ। দুনিয়ায় বিশ্বজিতের মতো মানুষ হয় না। তার কাছে বিশ্বজিৎ ঠিক স্বয়ং ফায়ার (বুদ্ধেদেবের) পরেই। অঢেল এই গুণগানের কারণটাও জানা গেল। ইংরেজ আমলের শেষ দিকে যখন লা পোয়ের সাজা শেষ হয়ে গেছে সেই সময় মধ্য আর দক্ষিণ আন্দামানের কোষ্ট লাইন ইজারা নিয়ে সে সিপিবা শেল তুলে আসছিল। স্বাধীনতার পরও নির্বিঘ্নেই চলছিল তার কাজকর্ম। কিন্তু মাদ্রাজ থেকে একজন শেলের কারবারী এসে দরিয়া ইজারা নেবার জন্য অনেক বেশি দর দিয়ে বসল। সে-ই শেল তোলার কাজটা পেয়ে যেত। এই কারবারের সঙ্গে লা পোয়ের পুরো ফ্যামিলি তো বটেই আর তিন ডাইভার এবং তাদের ঘরবাসী বাচ্চাকাচ্চাদের বাঁচা-মরা নির্ভর করে। কাজটা হাতছাড়া হয়ে গেলে তাদের মহা সংকট। তারা গিয়ে রাহা সাহেবের পা জড়িয়ে ধরেছিল। তার জন্যই শেষ পর্যন্ত লিজটা পেয়ে যায় লা পোয়েরা। রাহা সাহেবের ওপর ও তাদের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। ইত্যাদি ইত্যাদি।
এসব আগেও কিছু কিছু বলেছে লা পোয়ে। বিনয় অন্যমনস্কর মতো শুনে যাচ্ছিল। তার ভাবনায় এখন একমাত্র ঝিনুক। বর্মিটাকে না থামালে বিশ্বজিৎ রাহার গুণকীর্তন শেষ হবে না। বিশ্বজিংকে শ্রদ্ধা করে বিনয়, ভালোবাসে। তিনি মার্কামারা রসকষহীন সরকারি আমলা এবং ম্যাজিস্ট্রেট নন, আগাগোড়া হৃদয়বান মানুষ। খুবই সহানুভূতিপ্রবণ। কিন্তু তাঁর সম্বন্ধে যদি লা পোয়ে সমানে বলে যায়, আর বলতে বলতে সমুদ্রে গিয়ে মোটর বোটে উঠে পড়ে, তার কথাটাই জানানো যাবে না।
বিনয় লা পোয়ের বকবকানির মধ্যেই এক সময় বলে ওঠে, আমার একটা কথা ছিল–
এবার যেন বিনয় সম্বন্ধে সচেতন হয়ে ওঠে লা পোয়ে। সে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। হা-হা, বোলিয়ে।
আপনারা তো এই এলাকায় দশ পনেরো দিন থাকছেন?
হাঁ। সমুদরে চক্কর দিতে দিতে সিপি তুলতে হবে।
তারপর কোথায় যাবেন?
মিডল আন্দামানে।
আশায় উত্তেজনায় দুচোখ চকচক করে ওঠে বিনয়ের। সে জিগ্যেস করে, ওখানে কতদিন থাকবেন?
লা পেয়ে জানায়, গভগ দো হপ্তা। ওখানে গিয়ে সিপি তুলব।
গলা নামিয় বিনয় জিজ্ঞেস করে, আপনি কি জানেন মিডল আন্দামানে কোথায় কোথায় রিফিউজিদের সেটেলমেন্ট বসছে?
লা সোয়ের অহমিকায় বুঝি বা একটু বাঁধল। সে বলে, লগভগ তিশ সাল ইস জাজিরামে (দ্বীপপুঞ্জে) গুজর গেল। এখানকার না জানি কী? আমার আঁখকে ফাঁকি দিয়ে আন্দামানে কুছু হতে পারে না।
কতগুলো সেটেলমেন্ট বসছে?
একটু ভেবে লা পেয়ে জানায়, সবে মধ্য আন্দামানে উদ্বাস্তুদের উপনিবেশ পত্তনের কাজ শুরু হয়েছে। খুব সম্ভব তিনটে কি চারটে কলোনির জন্য জঙ্গল সাফ করা হয়েছে। পাকিস্তানের। দু-তিন শো ফ্যামিলিকে ওখানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। লা পোয়ে খবর পেয়েছে, জাহাজ বোঝাই করে আরও অনেক উদ্বাস্তু আসবে। তাদের জন্য আরও জঙ্গল নির্মূল করা হবে, ইত্যাদি।
যেসব তথ্য লা পোয়ের কাছে পাওয়া গেল সেগুলো নতুন কিছু নয়, এই মুহূর্তে যেমন জরুরিও নয়। আগেই বিভাস নিরঞ্জন এবং বিশ্বজিৎ রাহার কাছে সে শুনেছে। একটু চুপ করে থেকে বলল, রাহাসাহেব বলে দিয়েছেন সময় পেলে আপনাদের বোটে করে ঘুরব।
হা-হা এই তো বললেন, দশ মিনিটও হয়নি। আমার ইয়াদ আছে। যেদিন বলবেন আপনাকে বোটে তুলে আমাদের কামকাজ দেখাব।
সে তো দেখবই। আমার একটা কথা রাখতে হবে কিন্তু।
হা-হা জরুর। আপনি বড়ে সাহাবের দোস্ত, আমাদের জাজিরার মেহমান। যা বলবেন তা-ই করব।
আপনারা দুসপ্তাহ পর যখন মিডল আন্দামানে যাবেন আমাকে সেখানে নিয়ে যেতে হবে।
কোই বাত নেহি। আলবত নিয়ে যাব।
আপনাদের কাজ তো দেখবই। মিডল আন্দামানে যেখানে যেখানে রিফউজি কলোনি বসছে সেই সব জায়গাতেও কিন্তু নিয়ে যেতে হবে।
ওখানকার সেটেলমেন্ট নিয়ে আপনাদের আখবরে লিখবেন বুঝি?
মূল উদ্দেশ্য দুটো। পুনর্বাসন নিয়ে লেখালেখি তো আছে ই, ঝিনুককে খুঁজে বার করাটা কম জরুরি নয়। বরং এই মুহূর্তে অনেক বেশি প্রয়োজন। যে মেয়েটা সেই কোন ছেলেবেলা থেকে তার জীবনে শ্বাসবায়ুর মতো জড়িয়ে আছে তাকে রস আইল্যান্ডে দেখার পর থেকে বুকের ভেতরটা কতখানি উতলা হয়ে রয়েছে সেটা শুধু সে-ই জানে।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।