জি বড়ে সাহেব। সবই আপনার মেহেরবানিতে। এহী সাল আগের সালের চেয়ে তিন গুনা (গুণ) সিপি (শেল অর্থাৎ শঙ্খ কড়ি টড়ি) উঠছে।
বিশ্বজিৎ হাসলেন। তাহলে লাভ ভালোই হবে বলছ?
হাঁ বড়ে সাহাব। আপনি যদি আমাদের না দেখতেন, বালবাচ্চা নিয়ে ভুখা মরতে হত। আপনার জন্য আমরা বেঁচে গেছি। এই জিন্দগিতে আপনার মেহেরবানি কভি ।
বাস, বাস– একটা হাত তুলে লা পোয়েকে থামিয়ে দিলেন। বললেন, এত গুণকীর্তন করে তাকে অকাশে চড়াতে হবে না।
লা পেয়ে থেমে গেল। বিনয় চুপচাপ একধারে দাঁড়িয়ে ওদের কথা শুনছিল। সে জানে বিশ্বজিৎ রাহা আন্দামানের ফার্স্ট ক্লাস ম্যাজিস্ট্রেট এবং রিফিউজি রিহ্যাবিলিটেশন ডিপার্টমেন্টের একজন বড় কর্তা। বর্মি শেল কালেক্টরকে তিনি কীভাবে মেহরেবানি করলেন, বোধগম্য হলনা। বিশ্বজিতের যে ধরনের দায়িত্ব তাতে তার আওতায় সমুদ্র থেকে শেল তোলার ব্যাপারটা আসে না।
বিশ্বজিৎ লা পোয়েকে বললেন, তোমরা এদিকে কতদিন শেল তুলবে?
দশ পন্দ্র রোজ তো জরুর।
হঠাৎ কিছু মনে পড়তে বিশ্বজিৎ বিনয়ের দিকে তাকালেন। জানেন এই লা পোয়ে নাইনটিন টোয়েন্টি ফাইভে বর্মায় মৌলমিন থেকে কালাপানির সাজা খাটতে আন্দামানে এসেছিল। লা পোয়েকে জিগ্যেস করলেন, কী ঠিক বলছি তো?
হাঁ, বড়ে সাহাব শাস্তি ভোগ করতে আসার কথায় নিজেকে গুটিয়ে নিল লা পোয়ে। মিনিমিনে গলায় বলল, ও সব পুরানা বাত ।
বোঝা যাচ্ছে অতীতে যা ঘটে গেছে তা নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি হোক, সেটা একেবারেই চায় না লা পোয়ে। মুখ নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে সে।
বিশ্বজিতের হয়তো একটু মজা করার ইচ্ছা হল। বললেন, কটা যেন মার্ডার করে এখানে এসেছিলে–তিনটে না চারটে?
জবাব না দিয়ে নীরবে ঘাড় চুলকাতে লাগল। এতকাল বাদে পুরানো দুষ্কর্মের ইতিহাস খুঁচিয়ে বার করার কি কোনও মানে হয়? বড়ে সাহাব তাকে কী ফ্যাসাদেই যে ফেলে দিয়েছেন!
বিশ্বজিৎ বলতে লাগলেন, নাইনটিন থার্টি ফাইভে বর্মা ইন্ডিয়া থেকে আলাদা হয়ে গেল। তারপর ইন্ডিয়া, বর্মা দুই কান্ট্রিই স্বাধীন হল। সাজার মেয়াদও ফুরিয়ে গিয়েছিল। ইচ্ছা করলে লা পোয়ে নিজের দেশে মৌলমিনে ফিরে যেতে পারত। যায়নি। এখানেই বিয়েটিয়ে করে শেল-এর কারবার করছে। লা পেয়ে এখন পাকা জেন্টলম্যান। কী হে তা-ই তো? শেষ কথাটা লা পোয়েকে।
বর্মি শেল কালেক্টরের ঘাড় চুলকানি আরও বেড়ে গেল। বিশ্বজিৎ এমনিতে গম্ভীর প্রবল ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। কাজের সময় কারও পান থেকে চুন খসার উপায় নেই। কিন্তু অন্য সময় ভারী মজাদার মানুষ। অন্যের পেছনে লেগে রঙ্গ করতে ভালোবাসেন। নিছক নির্দোষ কৌতুক।
বিনয়ের মাথায় ঝিনুকের চিন্তাটা ঘুরছিলই। তার ইচ্ছে লা পোয়েরা যদি শেল তুলতে মিডল আন্দমানে যায় সে তাদের মোটর বোটে উঠে পড়বে। কিন্তু ওঠাটা সহজ নয়। বিশ্বজিৎ বললে লা পোয়েরা নিশ্চয়ই তাকে সঙ্গে নেবে। তবে আপাতত বিশ্বজিৎকে জানাবে না, সে মধ্য আন্দামানে যেতে চায় এবং এই যাওয়ার পেছনে রয়েছে ঝিনুক। বলা যাবে না সেখানে সমুদ্রের ধারে গহন বনভূমির ভেতর নতুন যেসব সেটেলমেন্টের পত্তন হচ্ছে সেই উপনিবেশগুলিতে হানা দিয়ে ঝিনুককে খুঁজে বার করবে। ঝিনুকের কথা লা পোয়েদেরও বলবে না। এ জন্য মনে। মনে একটা কৌশল মনে মনে ঠিক করে ফেলেছে।স।
বিশ্বজিৎ বললেন, আমি এখন খুব ব্যস্ত। আর কথা বলতে পারব না। তোমরা তোমাদের কাজ কর গিয়ে। দরকার হলে আমার সঙ্গে পোর্ট ব্লেয়ারে গিয়ে দেখা করো।
জি বড়ে সাহাব
লা পোয়েরা সমুদ্রের দিকে পা বাড়াতে যাবে, ব্যগ্রভাবে বিনয় বিশ্বজিৎকে বলে, আমার একটা কথা আছে।
বিশ্বজিৎ জিগ্যেস করলেন কী কথা?
বিনয় বলল, লা পোয়ের কাছে শুনেছি ওরা সমুদ্র থেকে হাঙর বা অন্য ধরনের ফেরোশাস সি অ্যানিম্যালদের সঙ্গে লড়াই করে শেল তুলে আনে। এই নিয়ে আমাদের কাগজে দু একটা লেখা পাঠানো যায়।
বিশ্বজিৎকে বেশ উৎসাহিত দেখা গেল। বললেন, হ্যাঁ, ব্যাপারটা খুব ইন্টারেস্টিং। সেই সঙ্গে ভীষণ রিস্কিও। যে ডাইভাররা শেল তোলে তারা যদি একটু অসাবধান হয় হাঙরেরা তাদের ছিঁড়ে খাবে। এরকম দু চারটে ঘটনা যে ঘটে না তা নয়। একটু থেমে ফের শুরু করেন, আন্দামানের ডাইভারদের পক্ষে ভীষণ বিপজ্জনক প্রফেশন। পেটের জন্যে মানুষকে কত কিছুই না করতে হয়।
বিনয়ের কৌতূহল হচ্ছিল। সে বলে, হাঙরটাঙরদের সঙ্গে ওরা কীভাবে লড়াই করে?
সেটা ঠিক বলা যাবে না। লড়াইয়ের নির্দিষ্ট কোনও পদ্ধতি নেই। পরিস্থিতি বুঝে ওরা স্ট্রাটেজি ঠিক করে নেয়।
বিনয় বলল, আমার একটা বিশেষ অনুরোধ আছে।
হাঁ হাঁ, বলুন না—
আমি এই শেল কালেক্টিং সম্পর্কে নতুন ভারত-এ লেখা পাঠাতে চাই। কিন্তু নিজের চোখে না দেখলে তো, মানে অভিজ্ঞতা না হলে শুনে শুনে এসব লেখা যায় না। আপনি যদি লা পোয়েদের বলে দেন, ওরা আমাকে ওদের বোটে ঘুরিয়ে সব দেখাবে।
অবশ্যই। বিশ্বজিৎ বিনয়কে দেখিয়ে লা পোয়েদের বললেন, উনি আমার বন্ধু। কলকাতার পত্রকার।
লা পেয়ে বলল, জানি বড়ে সাহেব। ওঁর মুখেই শুনেছি।
উনি তোমাদের কাজকর্ম দেখতে চান। তোমরা তো এখন এখানেই আছ। ওঁর যখন সময় হবে তোমাদের বোটে তুলে সব দেখিয়ে দেবে। যা জানতে চান, ভালো করে জানাবে। তোমাদের কথা উনি আখবরে লিখবেন। ইন্ডিয়ার হাজারো মানুষ তোমাদের নাম জেনে যাবে।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।