আখবর কথাটার মানে জানত না বিনয়। আন্দাজে বুঝে নিল–খবরের কাগজ। পত্রকারটা আগেই শুনেছে–সেটা হল সাংবাদিক।
বিনয় বলল, হ্যাঁ। কিন্তু আপনাদের পরিচয়টা কিন্তু জানতে পারিনি।
বমিটি বিপুল উৎসাহে জানায়, সে শেল কালেক্টর। নাম লা পোয়ে। আন্দামানের দরিয়া ইজারা নিয়ে জলের তলা থেকে নানারকম শঙ্খ কড়ি টার্বো ট্রোকাস ইত্যাদি তুলে ঘষেমেজে সাফ করে কলকাতা বোম্বাই এমনি বিরাট বিরাট শহরে পাঠায়। আন্দামানের শেলের সারা দুনিয়া জুড়ে কদর। কলকাতা বোম্বাইয়ের বড় বড় শেঠেরা সেসব পৃথিবীর নানা জায়গায় চালান দেয়। শেল নিয়ে লাখো লাখো টাকার কারবার চলছে।
শেলের ব্যাবসা নিয়ে কিছুই ভাবছিল না বিনয়। সে কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে। বিদ্যুৎ চমকের মতো ঝিনুকের মুখ তার চোখের সামনে ভেসে উঠেছে। সে কিছু বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই লা পোয়ে জানায়, সি-গাল বোটটার মালিক সে নিজে। সরকারের কাছ থেকে সে নিজেই শেল তোলার লাইসেন্স নেয়, ফি বছর লাইসেন্স রিনিউ করতে হয়। বছরের পর বছর এইভাবেই চালিয়ে যাচ্ছে।
লা পেয়ে তার সঙ্গীদের সঙ্গেও পরিচয় করিয়ে দেয়। তারা হল যোশেফ, জন এবং রামন। তিনজনই কেরালার লোক। দুজন। খ্রিস্টান, একজন হিন্দু। ওরা ডাইভার। অর্থাৎ জলের তলায় ডুব দিয়ে দিয়ে হাঙর এবং অন্য সব হিংস্র সামুদ্রিক জন্তুর সঙ্গে লড়াই করে ট্রোকাস টার্বো ইত্যাদি দামি দামি শেল তুলে আনে।
ঝিনুকের চিন্তায় বিনয়ের মাথার ভেতরটা তোলপাড় করে দিচ্ছিল। সে আগেই শুনেছে, শেল কালেক্টররা আন্দামানের নানা দ্বীপের চারদিকে ঘুরে ঘুরে শেল তোলে। ঝিনুক রয়েছে মিডল আন্দামানে। এখান থেকে কম করে ষাট-সত্তর মাইল দূরে। লা পোয়েরা কি সেখানে যায়?
রস আইল্যান্ডে চকিতের জন্য ঝিনুককে দেখার পর থেকে তীব্র ব্যাকুলতায় বুকের ভেতরটা ভরে আছে বিনয়ের। ঝিনুকের সঙ্গে তার সম্পর্কটা ঠিক কী, বিশ্বজিৎকে জানাতে পারেনি। সংকোচ হয়েছে। একটু ঘুরিয়ে শুধু বলেছে, সে মিডল আন্দামানের নতুন নতুন সেটলমেন্টগুলো দেখতে চায়। সেইসব অঞ্চলের রিপোর্টও সে নতুন ভারত-এ পাঠাবে। এগুলো তার অ্যাসাইনমেন্টের মধ্যে পড়ে। কিন্তু আসল উদ্দেশ্যটা হল, একবার মিডল আন্দামানে পৌঁছাত পারলে সেটেলমেন্টের পর সেলটমেন্ট ঘুরে সে ঝিনুককে যেভাবেই হোক খুঁজে বার করবে।
কিন্তু বিশ্বজিৎ বিশেষ গরজ দেখাননি। বলেছেন, তাড়াহুড়োর কিছু নেই। সাউথ আন্দামানে সেটেলমেন্টের পত্তন কীভাবে হচ্ছে, প্রথম সেটা দেখুক বিনয়, পরে তাকে মিডল আন্দামানে পাঠবার ব্যবস্থা করা হবে। তিনি কেমন করে জানবেন একটি চিরদুঃখী তরুণীর জন্য কতটা অস্থির হয়ে আছে বিনয়!
লা পোয়ের সঙ্গে আলাপ হওয়ার পর আশায় উত্তেজনায় উথালপাতাল হয়ে যাচ্ছিল বিনয়। কৌশলে জেনে নিতে হবে ওরা মিডল আন্দামানে শেল তুলতে যায় কিনা। যদি যায় যেভাবেই হোক ওদের সঙ্গে সেখানে চলে যাবে।
লা পোয়ে জিগ্যেস করল, বড়ে সাহাবকে আপনি চেনেন?
বিনয় একটু অবাক হল।কোন বড়ে সাহেব?
রাহা সাহাব। যাঁর হাত দিয়ে এই সব সেটলমেন্ট বসছে।
রাহা সাহাবকে চিনব না? তিনিই তো আমাকে এই জেফ্রি পয়েন্টে নিয়ে এসেছেন।
সাহেব কি এখন এখানে আছেন?
আছেন। জঙ্গলে রিফিউজিদের জমি দেওয়া হচ্ছে। তিনি তার দেখাশোনা করছেন।
খুশিতে চোখমুখ চক চক করতে থাকে লা পোয়ের। আজ আমার নসিবটা বহুত আচ্ছা। বড়ে সাহাবের সঙ্গে দেখা হবে। ওঁকে সালাম দিয়ে যাই। উনি কোন দিকের জঙ্গলে আছেন?
উত্তর দিকের।
লা পায়ে আর সঙ্গীদের নিয়ে দুরের জঙ্গলের দিকে হাঁটতে শুরু করল।
এই শেল কালেক্টরটাকে কোনও ভাবেই ছাড়া যায় না। বিনয়ের খেয়াল রইল না, এখনও তার চাটা খাওয়া হয় নি। খেয়াল রইল না, কাল রাত্রিরে যে লেখাটা শুরু করেছিল, সেটা শেষ করা জরুরি। সেও লা পেয়ে পাশাপাশি হাঁটতে লাগল।
.
উত্তরের জঙ্গলে এখন তুমুল ব্যস্ততা। একদিকে বন দপ্তরের কর্মীরা লম্বা লম্বা করাত চালিয়ে বিশাল বিশাল ঝাড়লো মহাবৃক্ষকে কাটছে। লা ডিন তার দল বল নিয়ে চেন দিয়ে জমি মাপছে, আর একটা দল বাঁশের খুঁটি পুঁতে জমির সীমানা ঠিক করে দিচ্ছে। তাদের কাজকর্ম তদারক ধনপত, নিরঞ্জন এবং বিভাস। উদ্বাস্তুরাও রয়েছে প্রচুর। তারা তাদের জমি বুঝে নিচ্ছে।
একটু দূরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব লক্ষ করছেন বিশ্বজিৎ। ঝোঁপ ঝাড় লতাপাতা ঠেলে আসার শব্দে পেছন ফিরে তাকিয়ে লা পোয়েদের সঙ্গে বিনয়কে দেখে তিনি রীতিমতো অবাক।
লা পেয়ে এবং তার তিন কেরেলি ডাইভার কপালে হাত ঠেকিয়ে কোমর ঝুঁকিয়ে বলল, সেলাম বড়ে সাহাব। আপনার তবিয়ত আচ্ছা হ্যায় তে?
লঘু সুরে বিশ্বজিৎ বললেন, আমার তবিয়ৎ কখনও খারাপ হয় না। সব সময় আচ্ছা থাকে। তা তেমারা এখানে আমার খবর পেলে কী করে? বলে একটু কী ভেবে বিনয়কে দেখিয়ে বলল, নিশ্চয়ই এই সাহেবের কাজ?
হা- লা পোয়ে জানায় মোটর বোট নিয়ে তারা জেফ্রি পয়েন্টে এসেছিল। বিনয়কে সমুদ্রের বিচে দেখে নেমে আসে। তারা আগেই খবর পেয়েছিল এখানে রিফিউজি সেটলমেন্ট বসছে। বিনয়ের কাছেই শুনেছে বিশ্বজিৎ এখানে আছেন। তাই
বিশ্বজিৎ বললেন, তোমাদের কাজকর্ম ঠিকমতো চলছে?

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।