বিশ্বজিৎও আর দাঁড়ালেন না, বিনয়কে জেনে থাকলে। তাড়াতাড়ি উঠতে পারবে না।
বিশ্বজিৎ আর দাঁড়ালেন না, বিনয়কে সঙ্গে করে নিজের ঘরে চলে এলেন।
বিনয় প্রতিবেদন লিখতে লিখতে উঠে গিয়েছিল। ভেবেছিল ফিরে এসে বাকিটা শেষ করে ফেলবে। কিন্তু এখন আর টেবলে। গিয়ে বসতে ইচ্ছে করছে না। হরিপদর গান আর মোহনবাঁশিদের বাজনার রেশ জেফ্রি পয়েন্টের পাহাড়ে, বনভূমিতে এবং সমুদ্রে এখনও থেকে গেছে যেন। খুব ভালো লাগছে বিনয়ের। হরিপদরা যেন পূর্ববাংলা নামে বহুদূরের এক স্বপ্নের ভূখণ্ডে তাকে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে। আজ আর অন্য কাজে মন বসবে না।
পুনর্বাসন দপ্তরের কোনও কর্মী কখন যেন এসে তাদের দুজনের মশারি খাটিয়ে দিয়ে গিয়েছিল। বিনয় টেবলের ওপর যে লণ্ঠনটা জ্বলছিল সেটা নিভিয়ে মশারির ভেতর ঢুকে পড়ল।
বিশ্বজিত শুয়ে পড়লেন। তাঁর খাটের পাশে নিচু টেবলে আরেকটা লণ্ঠন জ্বলছিল। চাবি ঘুরিয়ে সেটা নিভিয়ে দিতে দিতে বললেন, আজ আর লেখাটা কমপ্লিট করা গেল না–তাই তো?
বিনয় বলল, হ্যাঁ, কাল সকালে উঠে ওটা শেষ করব। আসলে হরিপদর গানটা
বিশ্বজিৎ বললেন, খুব সাধারণ চেহারা–মোস্ট আন-ইমপ্রেসিভ। পাশ দিয়ে গেলে কেউ ফিরেও তাকাবে না। কিন্তু ছেলেটার গলায় ম্যাজিক আছে; একেবারে হিপনোটিক। কার ভেতরে কী যে থাকে, মুখ দেখে বোঝা যায় না।
২.০৫ জমি বিলি হওয়ার কথা
পরদিন ঘুম ভাঙতে বেশ দেরিই হয়ে গেল বিনয়ের। ধড়মড় করে উঠে মশারির বাইরে এসে দেখল বিশ্বজিৎ নেই। জমি বিলি হওয়ার কথা খুব সকাল থেকে। বিনয় গভীর ঘুমে ডুবে আছে, তাই আর তাকে ডাকেননি। নিশ্চয়ই উদ্বাস্তু এবং পুনর্বাসনের কর্মীদের নিয়ে জঙ্গলে চলে গেছেন।
একটা তোয়ালে নিয়ে সমুদ্রের ধারে চলে এল বিনয়। তাড়াতাড়ি মুখ ধুয়ে চা এবং সকালের খাবার খেয়ে কালকের লেখাটা নিয়ে বসতে হবে।
সূর্য পুবদিকের পাহাড়ের মাথায় উঠে এসেছে। তিনদিকের ঘন জঙ্গলে এবং সমুদ্রে রোদ ঝলকে যাচ্ছে। রোদটা এত তেজি যে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকা যায় না।
বিচটা একেবারে ফাঁকা। কেননা জেফ্রি পয়েন্টের বাসিন্দারা এখন সবাই উত্তর দিকের জঙ্গলে।
মুখটুখ ধুয়ে তোয়ালেতে মুছতে মুছতে বিচের ওপর দিয়ে সে যখন ফিরতে শুরু করেছে, হঠাৎ ভট ভট শব্দ কানে এল। ঘুরে দাঁড়াতেই চোখে পড়ল একটা মোটর বোট সমুদ্রের পাড় ঘেঁষে খুব আস্তে আস্তে এগিয়ে আসছে। বোটটার গায়ে নাম লেখা: সি-গাল। সি-গালের মানে তো সিন্ধুশকুন, নাকি সাগর পাখি।
বোটটায় জনা চারেক লোক রয়েছে। তাদের মধ্যে একজন বর্মি, সেটা তার মঙ্গোলিয়ান চেহারা দেখে লহমায় ধরে ফেলা যায়। বাকি তিনজন বেশ কালো। সবার চুল চামড়া ঘেঁষে ছোট ছোট করে ঘঁটা। কেউ মাঝারি হাইটের, কেউ বেড ঢ্যাঙা। বমিটার বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি, পরনে ঢোলা ফুলপ্যান্ট আর হাতকাটা জামা। অন্য সবাই পরেছে খাটো হাফ প্যান্ট, প্যান্টগুলো আঁট হয়ে গায়ে লেপটে আছে। শার্টটার্ট নেই। দুজনের গলায় কালো কারে ক্রস ঝুলছে। বোঝাই যাচ্ছে খ্রিস্টান। বাকি লোকটির গলায় কিছু নেই।
ওরা বিনয়কে দেখতে পেয়েছিল। বোটটা থামিয়ে বর্মিটি হিন্দি এবং উর্দু মেশানো হিন্দুস্থানিতে জিগ্যেস করল, সাহাব, এই জেফ্রি পয়েন্টে রিফিউজি সেটলমেন্ট বসার কথা শুনেছিলাম। পাকিস্তানের রিফিউজিরা কি এসে গেছে? বাঙালি, বিহারি, মারাঠি শিখ বর্মি কারেন–সবাই এখানে হিন্দুস্থানিতে কথা বলে। সেই মিউটিনির সময় যে সিপাহিদের কালাপানি সার করে এই দ্বীপে পাঠানো হয়েছিল তখন থেকেই হিন্দুস্থানি বুলি অর্থাৎ ভাষাটা চালু হয়েছে। প্রায় একশো বছর ধরে সেটা চলছে।
বিনয়ের চেহারাটা উদ্বাস্তুদের মতো ক্ষয়াটে, ভাঙা-চোরা, নুয়ে-পড়া ধরনের নয়। তাকে দেখলে মনেই হয় না, দারিদ্র, কষ্ট বা চরম দুর্দশার মধ্যে আছে সে। বরং চোখেমুখে সম্ভ্রান্ত, মার্জিত একটা ছাপ রয়েছে। তাই বর্মিটা তাকে সাহাব বলেছে। তার কথাবার্তায় রীতিমতো সম্ভ্রম মেশানো।
বিনয় বলল, হ্যাঁ, অনেক উদ্বাস্তু ফ্যামিলি এসে গেছে। আরও আসবে।
নিজেদের মধ্যে কী যেন বলাবলি করল লোকগুলো। তারপর বর্মিটা বলল, হামলোগ আতে হেঁ। এদিকে যখন এসেই পড়েছি নয়া সেটলমেন্টের কামকাজ কেমন হচ্ছে, একবার দেখেই যাই।
মোটর বোর্টটা যদিও ছোট কিন্তু কিনারে ঘেঁষতে পারছে না, কেননা সেখানে জলের গভীরতা দেড় দুফিটের বেশি হবে না। বোটের তলার দিকটা জলতলের বালিতে আটকে যাবে। খানিক দূরে জল যেখানে কোমর সমান গভীর সেখানে নোঙর ফেলে বর্মিরা চারজন সমুদ্রে নেমে পড়ল। তারপর জল ঠেলে ঠেলে পাড়ে এসে উঠল। তাদের প্যান্টট্যান্ট ভিজে গেছে, কিন্তু তা নিয়ে কারও মাথাব্যথা নেই। ভাবখানা এইরকম ভিজে যখন গেছে তখন শুকিয়েও যাবে।
বর্মি আর সঙ্গীরা বিনয়ের কাছে চলে এসেছিল। বর্মিটা জিগ্যেস করল, আপলোগ সেটলমেন্টকা অফসর হ্যায়?
অফসর অর্থাৎ অফিসার। কলকাতা আসার পর কাজ চালাবার মতো হিন্দি এবং একটুআধটু উর্দু শিখে নিয়েছে বিনয়। বুঝতে পারে, মোটামুটি বলতেও পারে। সে বলল, না না, আমি কলকাতার একটা নিউজ পেপারে কাজ করি। আন্দামানের সেটলমেন্ট দেখতে এসেছি।
আপনি আখবরে কাম করেন? পত্রকার? বর্মির ভক্তি যেন কয়েক গুণ বেড়ে গেল।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।