মোহনবাঁশিরা চলে গেল।
.
খাওয়া চুকলে নিজেদের ঘরে চলে এল বিনয়রা। বিশ্বজি বললেন, এবার লেখা শুরু করে দিন।
মশা এবং পোকামাকড় মারা ধূপগুলো জ্বলছিল। কাজে জঙ্গলের দিক থেকে তারা এদিকে ঘেঁষছিল না।
খোলা জানালার ধার ঘেঁষে যে লেখার টেবলটা রয়েছে সেট ওপর একটা লণ্ঠন তুলে কাগজ কলম নিয়ে বসে পড়ল বিনয়।
ওধারের খাটে কাত হয়ে শুয়ে একটা বই খুলে পড়তে লাগলেন বিশ্বজিৎ। বিনয় যতক্ষণ লিখবে, তিনি পড়বেন।
কয়েক লাইন লেখার পর হঠাৎ হইচই কানে এল। জানালার বাইরে তাকাতেই চোখে পড়ল, ওধারের চত্বরে তুমুল ব্যস্ততা চলছে। উদ্বাস্তুরা তো বটেই, পুনর্বাসন দপ্তরের কয়েকজন কর্মী বিপুল উদ্যমে অনেকটা জায়গা জুড়ে লম্বা লম্বা চট বিছিয়ে লোকজনের বসার ব্যবস্থা করছে। বিভাস, নিরঞ্জন বা পরিতোষরাও গা গুটিয়ে নেই। তাদেরও বিপুল উৎসাহ। কটা হ্যাঁজাক আর গ্যাসবাতি এনে চারপাশে এবং মাঝখানে বসিয়ে দিচ্ছে।
আসর সাজানো শেষ। সেটেলমেন্টের কেউ বাকি নেই; সবাই কে। মাঝখানে খানিকটা অংশ বাদ দিয়ে গোল হয়ে বসে পড়তে শুরু করেছে। বোঝাই যায়, মাঝখানের জায়গাটা বাজনদার আর গাইয়েদের জন্য ফাঁকা রাখা হয়েছে।
একটু পরেই সহদেব, হলধর, মোহনবাঁশি এবং হরিপদ দোতারা সারিন্দা টারিন্দা নিয়ে আসরের মধ্যিখানে বসে পড়ল। খুলনার আছেরপুর গাঁয়ের হরিপদ এবং তার দাদা সোমেন বিশ্বাসকে স্পষ্ট মনে আছে বিনয়ের। রস আইল্যান্ডে রিফিউজি নার কোটা পূর্ণ করার জন্য পঁয়তাল্লিশ মিনিটে যে ছ ছটা বিয়ে দেওয়া হয়েছিল তার মধ্যে হরিপদও ছিল।
যেসব ফ্যামিলি কলকাতা থেকে মহারাজা জাহাজ বোঝাই হয়ে এই খেপে আন্দামানে এসেছে তাদের দু ভাগে ভাগ হয়ে একদল গেছে মিডল আন্দামানে। আরেক দল সাউথ আন্দামানের এই জেফ্রি পয়েন্টে। এদের ভেতর যে হরিপদরা ছিল, আগে খেয়াল করেনি বিনয়। আসলে আন্দামানে পৌঁছুবার পর এত ধকল গেছে, এতসব ঘটনা ঘটেছে যে আলাদা করে হরিপদর কথা তার মাথায় আসেনি।
হরিপদ কী করবে ওখানে? গাইবে? বাজাবে?
মোহনর্বাশি দোতারা আর সহদেব সারিন্দা নিয়ে এসেছিল। একটু পর মোহনবাঁশির আঙুলের টোকায় দোতারা টুং টুং সুরে বেজে ওঠে। ধীর লয়ে সারিন্দায় ছড় টানে সহদেব। ক্রমশ লহর তুলে দুই বাদ্যযন্ত্রের সুর পর্দায় পর্দায় চড়তে থাকে।
ঠিক এই সময় একটা হাত সামনের দিকে বাড়িয়ে গাইতে শুরু করে হরিপদ।
বন্ধু আমার নিধনিয়ার ধন
তারে দেখলে জুড়ায় জীবন যৈবন,
না দেখলে হয় আমার মরণ
যেদিন হইতে বন্ধুহারা
আমি হইয়াছি পাগলের পারা গো
আমার দুই নয়নে বহে ধারা
কে করে আমায় বারণ…
রোগাটে গড়নের ভীরু, লাজুক, মুখচোরা, গেঁয়ো যুবকটির এমন এক আকুল করা, সতেজ কণ্ঠস্বর রয়েছে, কে তা ভাবতে পেরেছিল! পদ্মা-মেঘনা-মধুমতী পারের স্মৃতিটাকে বহুদূরের বঙ্গোপসাগরের এই দ্বীপে লহমায় তুলে এনেছে হরিপদ। তিন টার দিকের পাহাড়ে গানের সুরটা প্রতিধ্বনি তুলে চলেছে অবিরল; হাওয়ায় ভেসে যাচ্ছে সমুদ্রের দিকেও। অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে বিনয়।
ওধারে হাতের বইটা নামিয়ে রেখে উঠে বসেছেন বিশ্বজিৎ। গানটা তাঁকেও প্রবল নাড়া দিয়েছে। নিচু গলায় বললেন, এক্সেলেন্ট! এ একেবারে খাঁটি ইস্ট বেঙ্গলের জিনিস। শহুরে ভেজাল ভাটিয়ালি নয়। চলুন, বাইরে গিয়ে শোনা যাক।
দুজনে বেরিয়ে আসর থেকে একটু দূরে গিয়ে দাঁড়ালেন। ওঁদের দেখলে হরিপদ হয়তো ঘাবড়ে যাবে; গানের সুর তাল কেটে যাবে, তাই খুব কাছে না যাওয়াই ভালো।
হরিপদ আধবোজা চোখে বিভোর হয়ে গেয়ে চলেছে।
বনের আগুন সবাই দেখে
আমার মনের আগুন কেউ না দেখে গো।
আমি বনপোড়া হরিণের মতো
পুড়িয়া হই ছাই যখন।
শিখাইয়া দারুণ পীরিতি
আসলো না মোর প্রাণনিধি গো
সারা জীবন সার হইল।
সার হইল, গো আমার কান্দন
একের পর এক গান গেয়ে হরিপদ যখন থামল, বেশ রাত হয়ে। গেছে। সে যতক্ষণ গাইছিল তারিফের সুরে শ্রোতারা মাঝে মাঝেই বলে উঠছিল, আহা হা, কী গীতইনা হুনলাম (শুনলাম)! বা ‘পরান খান উথালি পাথালি করে গো’
আসর ভাঙার পর বিশ্বজিৎ আর বিনয় হরিপদর কাছে এগিয়ে যায়। মুগ্ধ গলায় বিশ্বজিৎ বললেন, তুমি তো গুণী লোক হে। একজন সত্যিকারের আর্টিক্ট।
গুণী শব্দটা হরিপদর জানা। কিন্তু আর্টিস্ট কথাটার মানে জানে না। তবে বিশ্বজিৎ যে তার সুখ্যাতি করছেন সেটা বুঝতে পারছিল। সঙ্কোচে সে একেবারে এতটুকু হয়ে যায়। মুখ নামিয়ে বলে, আপনারা আমার হাবিজাবি গান শুনিছেন!
বিশ্বজিৎ বললেন, হাবিজাবি কী বলছ! চমৎকার গেয়েছ।
আরও নুয়ে পড়ল হরিপদ। কী যেন বলতে চাইল; পারল না। গলার ভেতর উত্তরটা আটকে গেল।
বিশ্বজিৎ তার কাঁধে একটা হাত রাখলেন। এতগুলো। মানুষকে আনন্দ দেওয়া, সেটা কি সোজা কথা! সাত পুরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে চলে আসতে হয়েছে, সেখানে আর ফিরে যাওয়া যাবে না। এখন এই দ্বীপ তোমাদের দেশ। নিজে আনন্দে থাকো, সবাইকে আনন্দ দাও। মোহনর্বাশি সহদেবদের বললেন, তোমরাও গুণী মানুষ। যেমন বলেছিলে তেমনি রোজ সন্ধের পর আসর বসাবে। অনেক রাত হয়ে গেছে, এবার ব্যারাকে গিয়ে শুয়ে পড়। কাল সকাল থেকে আবার জমি দেওয়া শুরু হবে। বেশি রাত পর্যন্ত জেগে থাকলে তাড়াতাড়ি উঠতে পারবে না।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।