বড় বড় কাঠের পরাতে পাহাড় প্রমাণ চাপাটি। প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড। ডেকচি বোঝাই ডাল, তরকারি। তরকারি বলতে আলু কুমড়োর ছক্কা। ছক্কার স্বাদ বাড়াবার জন্য প্রচুর আস্ত আস্ত ছোলা দেওয়া হয়েছে।
উদ্বাস্তুরা নিজের নিজের থালা গেলাস হাতে নিয়ে যথারীতি কাতার দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নিরঞ্জন আর বিভাসের তদারকিতে। ধনপত এবং পুনর্বাসন বিভাগের কর্মীরা তাদের থালায় চাপাটি টাপাটি তুলে দিচ্ছে। খাবার নিয়ে তারা কঁকা জায়গায় চলে যাচ্ছে।
বিশ্বজিৎ বিনয়কে সঙ্গে করে চলে এসেছেন। খাবার নিয়ে। খেতে খেতে তারা কথা বলছিলেন।
মজার গলায় বিনয় জিগ্যেস করল, রিফিউজিদের জন্যে এই সরকারি লঙ্গরখানা কতদিন চালু থাকবে?
বিশ্বজিৎ একটু ভেবে বললেন, দ্যাট ডিপেন্ডস
কথাটা বুঝতে পারল না বিনয়; সে তাকিয়ে থাকে।
বিশ্বজিৎ বললেন, বড় বড় গাছগুলো তো আমরা কেটে দিচ্ছিই। জমি ডিস্ট্রিবিউশনের পর বাকি ঝোঁপঝাড় মাঝারি আর ছোট গাছটাছ কেটে সাফ করবে রিফিউজিরা আপনাকে আগেই তা বলেছি। তারপর যে যার জমির একধারে নিজেদের ঘর তুলে নেবে। চাষের জমির পাশেই বাড়ি। এই বাড়ির সব মেটিরিয়াল বাঁশ টিন দড়ি কাঠগভর্নমেন্ট থেকে দেওয়া হবে।
বিশ্বজিৎ আরও জানালেন, ঘর তোলা হলে অ্যাডাল্টদের মাথা পিছু পঁচিশ টাকা আর মাইনরদের মাথা পিছু কুড়ি টাকা করে। ক্যাশডোল দেওয়া হবে। সেই টাকায় উদ্বাস্তুরা নিজেদের ফ্যামিলি চালাবে। অবশ্য আইরিশ আর আমেরিকান এভাঙ্গেলিস্টরা যে। পাউডার মিল্ক পাঠাচ্ছে সেটা ওদের ফ্রি দেওয়া হবে। তখন রিহ্যাবিলিটেশন ডিপার্টমেন্ট এই কমন কিচেন বন্ধ করে দেবে। আগে যেসব সেটেলমেন্ট বসানো হয়েছে সেসব জায়গাতেও এটা করা হয়েছে।
বিনয় বেশ ধন্দে পড়ে যায়। কিন্তু
কী?
টাকা না হয় দেওয়া হল, কিন্তু এই জঙ্গলের ভেতর মানুষগুলো চাল ডাল তেল নুন কোথায় পাবে? এখানে তো হাটবাজার কিছু নেই।
বিশ্বজিৎ জানালেন, রিহ্যাবিলিটেশন ডিপার্টমেন্টে একটা কো-অপারেটিভ সেকশন রয়েছে। সেই সেকশনের লোকজন এখানে এসে দোকান বসাবে। পোর্টক্লেয়ার থেকে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এনে উদ্বাস্তুদের মধ্যে বিক্রি করবে। না-লাভ, না-লোকসান, এই পদ্ধতিতে।
ওঁদের কথাবার্তার মধ্যেই মোহনবাঁশি, সহদেব, হলধর দাসরা হাতে খাবারের থালা এনে কাছাকাছি এসে দাঁড়ায়। মোহনবাঁশিদের কী একটা যেন বলার আছে কিন্তু বলতে পারছে না। ভয়ে ভয়ে শুধু বিশ্বজিতের দিকে বার বার তাকাচ্ছে।
বিশ্বজিৎ মোহনবাঁশিদের লক্ষ করেছিলেন। জিগ্যেস করলেন, কিছু বলবেন?
মোহনবাঁশি মাথা নেড়ে খুব বিনীত ভঙ্গিতে বলল, হ, স্যার
বেশ তো বলুন না।
জমিন দেওয়া শুরু হইচ্ছে। তমস্ত (সমস্ত দিন আমাগো যার যার জমিনে কাইটা যাইব। সন্ধ্যার পর আর কুনো কাম নাই। ওই সোময়টা কিছুক্ষণ যদিন আমরা ইট্ট গানবাজনা করি, আপত্ত নাই
সহদেব বলল, দ্যাশ ছাইড়া আসনের সোময় আমি একহান দোতারা লইয়া আইছি। কেও কেও সারিন্দাও আনছে। গান বাজনা করলে মন ভাল থাকব।
চকিতে বিশ্বজিৎ একবার বিনয়ের দিকে তাকালেন। তাঁর চাউনির মধ্যে এমন কিছু রয়েছে যাতে আন্দাজ করা যায় তিনি খুশি হয়েছেন। খুশির কারণটাও মোটামুটি আঁচ করা যাচ্ছে। পরশু রাত্তিরে জারোয়ারা যখন আঁচমকা সেটেলমেন্টে হানা দিয়েছিল, উদ্বাস্তুরা ভয়ে আতঙ্কে পাগলের মতো চেঁচাচ্ছিল; তারা কিছুতেই এই দ্বীপে থাকবে না, কলকাতায় ফিরে যাবে। আজ তারাই কিনা পাহাড়ে-ঘেরা বিজন বনভূমিতে গান বাজনার আসর বসাতে চাইছে। এই সেটেলমেন্টে বাকি জীবন কাটানো যে ওদের ভবিতব্য সেটা ওরা বুঝতে পারছে। এখানে তাদের মন বসতে শুরু করেছে। ভালো লক্ষণ।
বিশ্বজিতের চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। উৎসাহ দেবার সুরে বেশ জোর দিয়েই বললেন, নিশ্চয়ই গাইবেন, বাজাবেন। গ বাজনায় মন ভালো থাকে। যদি আরও কিছু বাজনার জিনি দরকার হয়, যেমন ধরুন হারমোনিয়াম, তবলা, সব সরকার থে কিনে দেওয়া হবে।
মোহনবাঁশির চোখ দুটো উদ্দীপনায় চকচক করছে, তাদে আর্জি যে এত সহজে পূরণ হবে, ভাবতে পারেনি। বল আমাগো মইদ্যে (মধ্যে) কেঠা কেঠা (কে কে) হারমুনি অ তবলা বাজাইতে পারে, একবার খবর লই, হের পর আপনে কমু
আমি তো কালই চলে যাচ্ছি। তবে এখানকার অফিস পরিতোষ বণিক থাকবেন। তাঁকে বলবেন সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে
সার (স্যার), ভরসা যহন দিলেন, আর দুইখান কথা কই।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, বলুন।
ফাঁকা চত্বরটার দিকে আঙুল বাড়িয়ে মোহনবাঁশি বলল, আম ওইহানে খুটি কুইপা (পুঁতে), বাঁশের পাটাতন বহাইয়া (বসিয়ে একহান বড় কইরা মাচান বানাইতে চাই।
বিশ্বজিৎ একটু অবাক হলেন। –মাচান দিয়ে কী হবে?
হের উপুর বইসা গীত গামু। কুলোনির মাইনষে ঘিরা বই শুনব।
গীত বাদ্যের একটা পাকাঁপোক্ত বন্দোবস্ত করতে চাই। মোহনবাঁশিরা। মঞ্চ সাজিয়ে তারা আসর বসাবে, কিন্তু শ্রা ছাড়া আসরের তো মানেই হয় না, তাই তাদের ঘিরে বস সেটেলমেন্টের নতুন বাসিন্দারা।
বিশ্বজিৎ বললেন, নিশ্চয়ই মাচান বানিয়ে নেবেন। আর যেন বলবেন?
আইজ রাইতেই খাওয়া দাওয়া সাইরা কিছু সোময় গী গাইতে চাই। বাত্তিগুলান নিভাইয়া না দিলে ভালা হয়। আন্ধা তো গাওন (গাওয়া) যায় না।
না না, আলো অবশ্যই জ্বলবে। আমি বলে দেব। যা আপনারা খেয়ে নিন।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।