উদ্বাস্তুদের মধ্যে যারা বয়স্ক, বিপদের গুরুত্বটা তারা বুঝতে পারছিল। তারা চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বাচ্চাকাচ্চাদের ঠান্ডা করে, এই পোলাপানেরা চিল্লাইস না, চিল্লাইস না। হাতি চেতলে (খেপে গেলে) অঁড়ে প্যাচাইয়া (পেঁচিয়ে) আছাড় মাইরা শ্যাষ করব।
বাচ্চাদের হল্লা থেমে যায়।
.
বিনয়কে নিয়ে বিশ্বজিৎ তার ঘরে ফিরে এলেন। বাইরে দিনশেষের ফ্যাকাশে আলো থাকলেও ঘরের ভেতরটা অন্ধকার। তবে পুনর্বাসন বিভাগের কোনও কর্মী লণ্ঠন জ্বালিয়ে তার তেজ কমিয়ে রেখে গিয়েছিল। চাবি ঘুরিয়ে সেটার শিখা বাড়িয়ে দিলেন বিশ্বজিৎ। উজ্জ্বল আলোয় ঘর ভরে গেল।
বিশ্বজিৎ এবার জুতো খুলে বিছানায় শরীর এলিয়ে দিলেন। বললেন, হোল ডে জঙ্গলে ভীষণ ধকল গেছে। একটু রেস্ট নিয়ে নিন।
বিনয়ের হাত-পা যেন আলগা আলগা হয়ে আসছিল। সেও হুড়মুড় করে শুয়ে পড়ল।
কিছুক্ষণ চুপচাপ।
তারপর বিশ্বজিৎ বললেন, কাল তো আমাকে পোর্টব্লেয়ার চলে যেতে হচ্ছে। মাসখানেক বাদে আবার একশো উদ্বাস্তু ফ্যামিলি আসবে। তার বন্দোবস্ত করতে হবে। নিরঞ্জন আর বিভাসকে দু খেপ কলকাতায় রিফিউজি আনতে পাঠিয়েছিলাম। এবার অন্য লোক যাবে। বিভাসদের পোর্টব্লেয়ারে রিহ্যাবিলিটেশন অফিসে প্রচুর কাজ জমে আছে। সেসব ওদের শেষ করতে হবে। সেগুলো আমাকে চেক করে দিল্লিতে পাঠাতে হবে। তাছাড়া আমার কোর্টে অনেকগুলো কেস জমে রয়েছে। আমি না গেলে হিয়ারিং শুরু করা যাবে না।
এসব কথা গতকালও বলেছিলেন বিশ্বজিৎ। বিনয় জিজ্ঞেস করল, কাল কখন যাবেন?
যেতে যেতে বিকেল হয়ে যাবে মনে হচ্ছে।
ওঁদের কথাবার্তার মধ্যে বনবিভাগের একজন কলাই-করা দুটো বড় কাপ বোঝাই করে চা নিয়ে এল। তার সঙ্গে প্রচুর বিস্কুট।
কর্মীটি বর্মি। চায়ের কাপটাপ টেবলে রেখে ঘরের চার কোনায় মশা এবং পোকা মারা ধূল্প জ্বালিয়ে দিল। কেননা সন্ধে নামতে না-নামতেই মশাদের দঙ্গল ঘরে ঢুকতে শুরু করেছে।
চায়ের পেয়ালা থেকে ধোঁয়া উড়ছিল। সটান উঠে বসলেন বিশ্বজিৎ। বললেন, এই বস্তুটির জন্যে মন-প্রাণ অস্থির হয়ে উঠেছিল।বর্মিটিকে দেখিয়ে বলেন, লোকটা বোধ হয় অন্তর্যামী। ঠিক সময় ঠিক জিনিসটি এনে হাজির করেছে। নিন–চা খান।
বিনয়ও এর মধ্যে উঠে পড়েছে। একটু হেসে সে চায়ের পেয়ালা তুলে নিল।
বর্মিট কাজ শেষ করে আর দাঁড়ায়নি। নিঃশব্দে চলে গেছে।
চা খেতে খেতে দুজনের কথা হচ্ছিল। বিশ্বজিৎ বললেন, যদি মনে হয়, আপনাদের কাগজের জন্যে আরও দু-একটা রিপোর্ট লিখবেন, আজই লিখে ফেলুন। কাল আমার সঙ্গে দিয়ে দেবেন।
বিনয় বলল, হ্যাঁ, লিখতে তো হবেই। তবে এক্ষুনি নয়; রাত্তিরে খাওয়া দাওয়ার পর লিখব।
ঠিক আছে।
একটু ভেবে বিনয় এবার জিগ্যেস করে, বলেছিলেন কাকা দু-চারদিনের মধ্যে এখানে এসে পড়বেন। তাকে ভীষণ দরকার। তাঁর কাছ থেকে ব্রিটিশ আমলের আন্দামানের অনেক কথা জানা যেত।
এই কাকা হলেন শেখরনাথ রাহা। বিশ্বজিতের বাবার সবচেয়ে ছোট ভাই। তার কথা আগেই বিশ্বজিতের কাছে শুনেছে বিনয়। শেখরনাথ ছিলেন সশস্ত্র বিপ্লবী। অহিংস নির্বিষ আন্দোলনে ইংরেজ সরকারকে এদেশ থেকে উৎখাত করা যাবে, তিনি বা তার মতো বিপ্লবীরা আদৌ তা বিশ্বাস করতেন না। ভারতের মতো একটা কলোনি থেকে চরকা কেটে, সত্যাগ্রহ বা অসহযোগ আন্দোলন করলে তারা চাটিবাটি গুটিয়ে দেশ থেকে সুবোধ বালকের মতো বিদায় হবে, এসব আকাশ কুসুম কল্পনা। পাগলের প্রলাপও বলা যায়। এই উপমহাদেশের মতো কামধেনু। ফেলে কেউ কি সহজে চলে যেতে চায়! এদের তাড়াতে হলে সশস্ত্র অভ্যুত্থান চাই। তার জন্য চাই বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, বন্দুক, রাইফেল, পিস্তল। মুখের কথা খসালেই তো সেসব মুড়ি মুড়কির মতো পাওয়া যায় না। তার জন্য টাকা দরকার। ট্রেন ডাকাতি করে টাকা জোগাড় করতে গিয়ে ধরা পড়ে উনিশশো কুড়ি সালে শেখরনাথ কালাপানির সাজা নিয়ে আন্দামানে এসেছিলেন। পোর্টব্লেয়ারে সেলুলার জেল এবং বঙ্গোপসাগরের দ্বীপপুঞ্জ সম্পর্কে তাঁর বিপুল অভিজ্ঞতা।
তাদের নতুন ভারত-এর চিফ রিপোর্টার, নিউজ এডিটর থেকে শুরু করে কাগজের মালিক জগদীশ গুহঠাকুরতা পর্যন্ত সবাই চান শুধু রিফিউজি সেটেলমেন্টই নয়, সেলুলার জেল, ব্রিটিশ আমলের পেনাল কলোনি ইত্যাদি সম্পর্কেও যেন নিয়মিত প্রতিবেদন পাঠায় বিনয়। ইন্ডিয়ার মেন ল্যান্ডের মানুষজনের কাছে আন্দামান এক অচেনা দ্বীপপুঞ্জ। যেমন ভীতিকর তেমনি রহস্যময়। এই দ্বীপগুলি সম্বন্ধে সবার অপার কৌতূহল। শেখরনাথের সঙ্গে দেখা হলে তার কাছ থেকে সেকালের এবং একালের অজস্র তথ্য জোগাড় করা যাবে।
বিশ্বজিতের সঙ্গে এই নিয়েও অনেক কথা হয়েছে বিনয়ের। তিনি বললেন, জেফ্রি পয়েন্টে নতুন সেটেলমেন্ট বসছে আর। কাকা আসবেন না তাই কখনও হয়। নিশ্চিন্ত থাকুন, দু-একদিনের মধ্যে তিনি ঠিক এসে পড়বেন। এখানকার উদ্বাস্তুরা এখন তার। ধ্যানজ্ঞান।
.
রাত্তিরেও সেটেলমেন্ট অফিসের সামনের খোলা চত্বরে খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা। দুদিন খিচুড়ি খাওয়ানো হয়েছে। আজ দুপুরে দেওয়া হয়েছিল ভাত ডাল আর সুবয়াই মাছের ঝোল। এবেলা অর্থাৎ রাত্তিরে চাপাটি তরকারি এবং ডাল।
খোলা চত্বরটায় অনেকগুলো গ্যাস বাতি আর হ্যাঁজাক জ্বেলে দেওয়া হয়েছে। আলোয় আলোয় ভরে গেছে সমস্ত এলাকাটা।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।