বিশ্বজিতের সঙ্গে বিনয়ও সেদিকে এগিয়ে গেল। ওদিকে হাতি দেখে বিভাসরা শুধু নয়, যে উদ্বাস্তুরা ক্যাম্পে ছিল তারাও ছুটে এসেছে। বাচ্চাকাচ্চা, যুবকযুবতী, বুড়োধুড়ো–কেউ বাকি নেই। সবার চোখে অপার কৌতূহল।
বিনয় গুনে গুনে দেখল সবসুদ্ধ পাঁচটি হাতি। মাহুতরা পায়ে মোটা শিকল লাগিয়ে গাছের গুঁড়িতে সেগুলোকে বেঁধে ফেলল। কাল যে ছোট লরিগুলোতে চেপে উদ্বাস্তুরা এসেছিল সেগুলো কাতার দিয়ে ক্যাম্প থেকে খানিক দূরে র্ঘড়িয়ে আছে। দুই ট্রাকের ড্রাইভার লরিগুলোর পেছনে তাদের গাড়ি দাঁড় করিয়ে নেমে পড়ল। ট্রাকে আরও কয়েকজন রয়েছে। মাহুতসুদ্ধ তারা সবাই বিশ্বজিতের কাছে দৌড়ে এল। এদের মধ্যে নানা জাতের মানুষ রয়েছে বর্মি, শিখ, সাঁওতাল, তামিল ইত্যাদি। সবার বয়স পঞ্চাশের ওপারে। বিনয় আন্দাজ করে নিল এরা একদিন বঙ্গোপসাগরের এই দ্বীপপুঞ্জে কালাপানির সাজা খাটতে এসেছিল। এখন মুক্তি পেয়ে তারা স্বাধীন ভারতের সরকারি কর্মচারী।
সবাই এসে সসম্ভ্রমে কপালে হাত ঠেকিয়ে বিশ্বজিৎকে বলে, সেলাম হুজৌর
বিশ্বজিৎ ওদের না চিনলেও, ওরা বিশ্বজিৎকে খুব ভালো। চেনে। মোটামুটি একটা আন্দাজ করে নিয়ে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কি ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টে কাজ কর?
সবার হয়ে একটা হট্টাকাট্টা চেহারার, চাড়া-দেওয়া গোঁফওয়ালা লোক, নিশ্চয়ই পুরো দলটার চালক বা সর্দার, বলল, হ, হুজৌর। লোকটা খুবই বিনয়ী, ন; গলার স্বর নরম। কে বলবে সে একদিন দুর্ধর্ষ দাগি আসামি হয়ে এখানে এসেছিল।
তোমাদের এখানে কে পাঠিয়েছে?
তিরুরের ফরিস্টার (ফরেস্টার) সাহাব।
তিরুর অঞ্চলের ফরেস্ট অফিসারকে ভালোই চেনেন বিশ্বজিৎ। বললেন, মণ্ডল সাহেব পাঠিয়েছেন?
হা সাহেব। এখান থেকে গাছের মোটা মোটা বল্লা নিয়ে যেতে হবে। উসি লিয়ে
তোমার নাম কী?
আজীব সিং।
ঠিক আছে। কবে থেকে কাজ শুরু করবে?
কাল সুবেসে।
একটু ভেবে বিশ্বজিৎ জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের খানাদানার কী বন্দোবস্ত? এখানকার রিফিউজিদের সঙ্গে খাবে?
আজীব সিং বলল, জি, নেহি। সে জানায়, নিজেদের রসদ চাল ডাল আটা তেল ঘি রশুন পেঁয়াজ মরিচ মশলা আর এক বস্তা আলু সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে। হাতিগুলোর জন্যও খাবার আনা হয়েছে। বস্তা বস্তা ছোলা, কলাগাছ, কলার কাদি এবং অন্যান্য বুনো ফল। রসদ ফুরিয়ে গেলে আবার তারা ট্রাক পাঠিয়ে আনিয়ে নেবে। শুধু তা-ই নয়, তাদের থাকার ব্যবস্থাও নিজেরাই করবে। রসদের সঙ্গে অনেকগুলো তবুও এসেছে। সেটেলমেন্টের একধারে সেগুলো খাটিয়ে নিলেই হবে।
ঠিক আছে। তোমরা অনেকদূর থেকে আসছ। এবার কিছুক্ষণ আরাম করে তাবুটাবু বসিয়ে নাও। বিশ্বজিৎ আর দাঁড়ালেন না। বিনয়কে সঙ্গে করে তার ঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন।
বিনয়ের মাথায় বল্লা শব্দটা ঘুরছিল। কথাটার মানে সে জানে না। জিজ্ঞেস করল, বল্লা কী?
বিশ্বজিৎ বুঝিয়ে দিলেন যে, বড় বড় গাছ কাটার পর বিশাল আকারের গুঁড়ি এবং মোটা মোটা ডাল চারদিকে ছড়িয়ে রয়েছে সেগুলো হল বল্লা।
হাতি ওগুলো কীভাবে সরাবে?
কাল থেকেই দেখতে পাবেন। বিশ্বজিৎ বললেন, আমাদের। এখানে ক্রেন নেই। হাতিরাই ক্রেনের কাজ করবে।
বিনয় আর কোনও প্রশ্ন করল না।
ওদিকে উদ্বাস্তুরা কিন্তু হাতিগুলোর সঙ্গ ছাড়েনি। খুব সম্ভব একসঙ্গে এত হাতি আগে আর কখনও দেখেনি। নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে অবাক বিস্ময়ে তারা পাহাড়প্রমাণ প্রাণীগুলোকে লক্ষ করছিল।
হাতিরা উঁচুনিচু পাহাড় ডিঙিয়ে এতটা পথ হেঁটে আসার ধকলে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিল না। তারা বসে পড়েছে। কিন্তু জঙ্গলে নিশ্চিন্তে জিরোবার কি উপায় আছে? মশা আর বাড়িয়া পোকার ঝক তাদের হেঁকে ধরেছে। অবিরাম গুঁড়ের ঝাঁপটা মারতে মারতে তারা মশাটশা তাড়িয়ে চলেছে।
বিশ্বজিৎ আজীব সিংদের কিছুক্ষণ আরাম করে নিতে বলেছিলেন। কিন্তু এখন তাদের বসে বসে জিরোবার সময় নয়।
ওদের একজন হাতিগুলোর চারপাশে মশা এবং পোকা মারার ধূপ জ্বালিয়ে দিল। দুজন পাঁচটা কাঠের বিরাট গামলা বোঝাই করে ছোলা, কলা, কলাগাছ ইত্যাদি হাতিদের সামনে এনে রাখল। হাতিপিছু একটা করে গামলা।
পোকা আর মশামারা ধূপ জ্বালাতে অনেক পোকামাকড় লহমায় মরে গেল। বাকি সবাই মহা বিপদের গন্ধ পেয়ে জঙ্গলের। দিকে উধাও। হাতিদের খিদে পেয়েছিল জবর। তারা এখন অপার স্বস্তিতে খাওয়া শুরু করল।
আজীব সিংয়ের বাহিনীর অন্য লোকগুলো বসে নেই। তারা ট্রাক থেকে তাঁবুটাবু নামিয়ে মাটিতে খুঁটি পুঁতে পর পর সেগুলো খাটিয়ে ফেলতে থাকে। কয়েকজন অন্য লটবহর নামিয়ে আনে। তাঁবুগুলোর একধারে একজন মাটি খুঁড়ে উনুন বানিয়ে ফেলে। দুজন জঙ্গলে গিয়ে শুকনো কাঠকুটো জোগাড় করে নিয়ে আসে। শুকনো কাঠই এখানে জ্বালানি।
উদ্বাস্তুদের মধ্যে যারা যুবকযুবতী বা আরও বয়স্ক হাতি দেখার সঙ্গে সঙ্গে আজীব সিংদের কার্যকলাপ খুব মন দিয়ে লক্ষ করছিল। কিন্তু বাচ্চাগুলো এতক্ষণ চুপচাপ থাকার পর হাতিগুলোকে ঘিরে চক্কর দিতে দিতে তুমুল হইচই বাধিয়ে দেয়।
আজীব সিং দুহাত তুলে নাড়তে নাড়তে বলে, বিচ্চেলোগ, চিল্লামিল্লি মত করো। হাঁথি গুসা করেগা তো বহুৎ খতরা হো যায়েগা।
সবাই মোটামুটি আন্দাজে বুঝল, এত চেঁচামেচিতে হাতিদের মেজাজ বিগড়ে যাবে। এই বিশাল প্রাণীগুলো একবার খেপে গেলে রক্ষা নেই; মহা সর্বনাশ ঘটবে।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।