বিনয় আগে লক্ষ করেনি। এবার দেখতে পেল, যারা বাঁশের খুঁটি, শাবল, কুড়ল এবং করাটরাত নিয়ে এসেছিল তারা কয়েকটা বড় বড় পেটমোটা বোতলও সঙ্গে করে এনেছে। বোতলগুলো পেট্রোল বোঝাই।
কানখাজুরা বা চেলা বিছেগুলো দলা পাকিয়ে কিলবিল করছে। ধনপত চকিতে একটা বোতল থেকে বিষাক্ত সরীসৃপগুলোর গায়ে পেট্রোল ছিটিয়ে দিয়ে দেশলাইয়ের কাঠি ধরিয়ে তাদের দিকে ছুঁড়ে দেয়। চোখের পলকে দাউদাউ আগুনে পুড়ে বিছেগুলো দলা পাকিয়ে যায়।
বিভাস মোহনবাঁশিদের দিকে ফিরে বলল, এইবার ডর কাটছে তো? আমরা আপনেগো পাশে আছি। কানখাজুরা জারোয়া কেও আপনেগো কিছু করতে পারব না। আহেন আহেন, আবার জমিন মাপামাপি শুরু হইব। নিজেগো চৌখে দেইখা হল (সব) বুইঝা লন (নিন)।
মোহনবাঁশিদের সাহস অনেকখানি ফিরে আসে। হয়তো ভাবে কাল রাতে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে বুশ পুলিশ এবং ধনপতরা জারোয়াদের ঠেকিয়েছে, আজ কানখাজুরা মারল। এসবই তো তাদের নিরাপত্তার জন্য। পায়ে পায়ে উদ্বাস্তুরা ফিরে আসে।
যে এলাকা দিয়ে জমি মাপামাপির জন্য লম্বা লোহার চেন বসানো হবে সেখানকার ঝোঁপঝাড় কেটে আবার নতুন উদ্যমে কাজ শুরু হয়ে যায়। তবে পুরোপুরি নির্বিঘ্নে নয়। কতকাল ধরে যে কানখাজুরা আর জেঁকেরা জঙ্গলের ভেতর চিরস্থায়ী আস্তানা গেড়ে আছে। দশ পা এগতে না এগতেই গাছের ডালপালা থেকে থোকায় থোকায় জোঁক মাথায় এসে পড়ছে। সারা গায়ে এবং মাথায় লোশন লাগানো রয়েছে তাই বাঁচোয়া। সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো গা-মাথা থেকে খসে পড়ছে। ঝোঁপজঙ্গলে দা কিংবা কোদালের কোপ পড়লেই বুড় বুড় করে বেরিয়ে আসছে কানখাজুরা এবং অন্য সব বুনো সরীসৃপের দঙ্গল। পেট্রোল দিয়ে তাদের পোড়াতে পোড়াতে জমি মাপা এবং খুঁটি পোঁতা চলতে লাগল। মোহনবাঁশির পরিবারের জন্য পনেরো বিঘে জমি মেপে তার চরপাশে খুঁটি পুঁতে পুঁতে সীমানা ঠিক করে দিয়ে, তারপর সহদেবের পরিবারের জন্য জমি দেওয়া হল। এইভাবে সূর্য যখন পশ্চিম দিকে ঢলতে শুরু করেছে তার মধ্যে পাঁচটি ফ্যামিলিকে জমি বিলি করা সম্ভব হল।
সেই সকালবেলায় চিড়ে গুড় খেয়ে জঙ্গলে ঢুকেছিল সবাই। খিদেয় এখন পেট জ্বলে যাচ্ছে। মুখে কেউ খিদের কথা না বললেও সেটা বোঝা যাচ্ছিল। বিশ্বজিৎ বললেন, এ বেলার মতো কাজ বন্ধ থাক। খেয়েদেয়ে এসে আবার করা যাবে।
বিভাস হেঁকে হেঁকে সবাইকে বলল, অহন কেম্পে ফিরা চলেন।
.
স্নান এবং খাওয়াদাওয়া চুকিয়ে যখন সবাই আবার জঙ্গলে ঢুকল, সূর্য আরও খানিকটা হেলে গেছে।
বিশ্বজিৎ বললেন, ও বেলা মাত্র পাঁচটা ফ্যামিলিকে জমি দেওয়া হয়েছে। এভাবে কাজ হলে এতগুলো ফ্যামিলিকে জমি দিতে অনেক সময় লেগে যাবে। যে উদ্বাস্তুরা এখানে এসে পৌঁছেছে এক উইকের ভেতর তাদের ল্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কমপ্লিট করতেই হবে। মাসখানেক বাদে আবার একশো ফ্যামিলি মেনল্যান্ড থেকে এসে পড়বে। এখন প্রচুর কাজ।
ঠিক করা ছিল, আজ বারোটি ফ্যামিলিকে জমি দেওয়া হবে কিন্তু উত্তর দিকে ঝোঁপ-ঝাড় অনেক বেশি ঘন। সেসব সাফ করে আর মাত্র চারটি ফ্যামিলিকে জমি দেওয়া সম্ভব হল।
আজ সব মিলিয়ে নটা উদ্বাস্তু ফ্যামিলি জমি পেল।
সূর্য পশ্চিমদিকের পাহাড়ের পেছনে অনেকখানি নেমে গেছে। সেটাকে আর দেখা যাচ্ছে না। পাহাড় আর বিশাল বিশাল মহাবৃক্ষগুলির ছায়া নেমে এসেছে উপত্যকায়। সেই ছায়া এমনই ঘন যে সন্ধে হবার আগেই চারিদিক দ্রুত অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে। অন্ধকার ভেদ করে সহজে নজর চলে না।
বিভাস হেঁকে বলল, আইজকার মতো কাম বন্ধ। কাইল ভুরের। (ভোরের আলো ফুটলেই আবার জমিন দেওন শুরু হইব। চলেন কেম্পে যাই
জঙ্গল থেকে বেরিয়ে সবাই ব্যারাকগুলোর দিকে এগিয়ে যায়।
বিনয় আর বিশ্বজিৎ বিরাট দলটার একেবারে পেছনে ছিলেন। সারাটা দিন জঙ্গলের পুরু শ্যাওলায় ঢাকা, সঁতসেঁতে, পিছল, উৎকট সোঁদা গন্ধে-ভরা জমি, নানা ধরনের পোকামাকড়, সেঁক। আর কানখাজুরার মধ্যে কাটিয়ে ভীষণ ক্লান্তি বোধ করছিলেন। দুজনে।
পশ্চিমদিকের পাহাড় এবং বনজঙ্গল গাঢ় ছায়ায় ঢেকে গেলেও পুবদিকের পাহাড়ে বেলাশেষের একটু আলো এখনও আলগাভাবে লেগে রয়েছে। দক্ষিণ প্রান্তে পাহাড়-টাহাড় নেই; একেবারে খোলা। সেখানে অফুরান বঙ্গোপসাগর। যদিও নিভুনিভু, তবু সমুদ্রের ঢেউগুলোর মাথায় মাথায় প্রচুর আলো দোল খাচ্ছে।
চলতে চলতে হঠাৎ পুবের পাহাড়ের দিকে নজর চলে যায় বিনয়ের। এক দঙ্গল হাতিকে প্যাচানো পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে হাঁটিয়ে হটিয়ে নামিয়ে নিয়ে আসছে কটা লোক। খুব সম্ভব তারা মাহুত। হাতিদের পেছনে দুটো বিরাট ট্রাক। ট্রাক বা হাতি, কারও কোনও তাড়া নেই। তারা ধীর চালে এধারের ঢাল দিয়ে নেমে আসছে।
অবাক বিনয় দাঁড়িয়ে পড়েছিল। জেফ্রি পয়েন্টে হাতির পাল। আর পেল্লায় পেল্লায় ট্রাক নিয়ে কেন লোকগুলো আসছে, বোঝা যাচ্ছে না।
বিশ্বজিৎও কম অবাক হননি। হাতিটাতি এসে হাজির হবে, খুব সম্ভব জানতেন না। তাই তিনি দাঁড়িয়ে পড়েছেন।
উদ্বাস্তুদের নিয়ে বিভাসরা বেশ খানিক দূর এগিয়ে গিয়েছিল। হাতি দেখে তারাও থমকে গেছে।
কয়েক মিনিটের ভেতর কটা বিপুল আকারের প্রাণী, দুটো ট্রাক আর বেশ কিছু মানুষ নিচের উপত্যকায় নেমে এল।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।