পরথম আপনেরে জমিন দেওন অইব। বড় গাছগুলান সরকার থিকা কাইটা দেওন অইছে। মাঝারিগুলানও কাইটা দিমু কিন্তুক ছুটো গাছ, ঝোঁপঝাঁপ আপনেগো হগল রিফুজিগো সাফ কইরা লইতে অইব।
মোহনবাঁশি হুঁশিয়ার লোক। সে ঢোক গিলে জিগ্যেস করল, বড় গাছগুলান কাটা অইছে ঠিকই কিন্তুক মাটির উপুরে হাতখানেক কইরা রইয়া গ্যাছে; মাটির তলে রইছে শিকড়বাকড়। হেগুলান (সেগুলো) উঠান (ওঠানো) তো আমাগো শক্তিতে কুলাইব না।
বিভাস বলল, বড় গাছের গোড়া আর শিকড় আপনেগো তুলতে অইব না, আমরাই তুইলা দিমু।
সহদেব রুদ্রপাল এবং জলধর বারুইয়ের বয়স অনেক কম। তিরিশের বেশি হবে না। দেশভাগের পর এপারে এসে শিয়ালদা স্টেশনে কিছুদিন কাটিয়ে তারপর ত্রাণশিবিরে গিয়ে উঠেছিল। তাদের ওপর দিয়ে ঝড়ঝাঁপটা কম যায়নি কিন্তু শরীরস্বাস্থ্য সেভাবে ভেঙে পড়েনি। মোটামুটি অটুটই আছে। দুজনেরই শক্তপোক্ত চেহারা।
সহদেব বলল, শিকড়কড় আপনেরা উঠাইবেন বাকি ঝোঁপঝাঁপ আমরা সাফ করুম। জঙ্গলের মুখ থিকা জমিন বাইর করতে যে মেলা (অনেক) সোময় লাইগা যাইব ছার (স্যার)।
বিভাস বলল, হেয়া তো লাগবই।
সংশয়ের সুরে জলধর বলল, জঙ্গলে ভরা জমিন দিয়াই কী কইবেন, এইবার নিজেগো প্যাটের চিন্তা নিজেরা কর।
তার মনোভাবটা বুঝতে পারছিল বিভাস। হেসে হেসে বলল, ভাইবেন না। আন্দামানে আপনেগো শুকাইয়া মারণের লেইগা আনি নাই। যতদিন না চাষবাস কইরা ফসল ফলাইতে পারেন, আপনেগো প্যাটের চিন্তা সরকারের। আমাগো উপুর ভরসা রাখেন।
দূরের জঙ্গলে লম্বা লম্বা করাত নিয়ে যারা ঢুকেছিল সেখান থেকে একটানা ঘষঘষ আওয়াজ আসছে। বিনয় আন্দাজ করে নিল। বড় গাছ কাটা শুরু হয়ে গেছে। মাঝারি মাপের করাত নিয়ে যারা এসেছিল তারা গভীর জঙ্গলে যায়নি। কাছাকাছি যে পাতলা জঙ্গল রয়েছে সেখানকার মাঝারি গাছগুলো কাটছে।
গাছ কাটার কায়দাটা বিচিত্র ধরনের। দুজন করে লোক গাছে চড়ে ক্ষিপ্র হাতে করাত চালিয়ে প্রথমে ডালগুলো ছেঁটে ফেলছে, তারপর নিচে নেমে এসে কবন্ধ গাছের গুঁড়িগুলো খণ্ড খণ্ড করে টাল দিয়ে রাখছে।
বনভূমির চতুর্দিকে শুধু করাত রাত চালানোর কর্কশ আওয়াজ। জঙ্গলের মাথায় পাখিদের চেঁচামেচি আরও বেড়েছে। বেড়েছে বনচর প্রাণীদের দুদ্দাড় দৌড়ে পালানোর শব্দ। বেড়েছে মশা-মাছি নানা ধরনের পোকা আর পতঙ্গের ওড়াউড়ি।
বিনয়রা যেখানে দাঁড়িয়ে আছে তার খানিকটা দূর দিয়ে এক পাল হরিণ বিদ্যুৎ গতিতে বাঁ পাশের পাহাড়ের দিকে চলে গেল।
বিশ্বজিৎ একবার আকাশের দিকে তাকিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। ব্যস্ততার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। বারোটি ফ্যামিলি আজ পনেরো। বিঘে করে মোট একশো আশি বিঘে জমি পাবে। এতটা জমি মাপজোখ করা কি মুখের কথা। তিনি বললেন, বেলা বেড়ে গেছে। আর দেরি করো না। এবার আসল কাজ আরম্ভ করে দাও।
আমিন লা-ডিন, চেনম্যান ধনপত এবং পুনর্বাসন দপ্তরের আরও কজন কর্মী মুহূর্তে তৎপর হয়ে ওঠে। প্রথমেই মোহনবাঁশিকে জমি দেওয়া হবে। তাকে সঙ্গে নিয়ে লা-ডিনরা জঙ্গলের ডানদিকে গেল। তাদের সঙ্গে বিভাস বিনয় এবং বিশ্বজিৎও গেলেন। বিভাস জমি মাপার কাজটা যাতে সুষ্ঠুভাবে হয় তার তদারক করবে। একবার কাজটা শুরু করে দিতে পারলে বাকিটা মসৃণভাবে চলবে। ঠিক হল, জঙ্গলের ডান পাশে জমি পাবে মোহনবাঁশি। কিন্তু নিবিড় কাঁটাঝোঁপ, ফনফনিয়ে বেড়ে ওঠা ঘণ বনতুলসীর ঝাড়, গাছ, বুক সমান উঁচু ঘাস বনের ভেতর জমি মাপা সহজ নয়। একটা দল সমানে ধারালো চালিয়ে ঝোঁপঝাড় কেটে সাত আট ফিটের মতো জায়গা সাফ করছে; সেখান দিয়ে। লোহার লম্বা চেন পেতে জমি মাপার কাজ চলল।
লা-ডিন আর ধনপত হাঁকডাক করে বলল, খুঁটি বসাতে বসাতে চল- তুরন্ত
বনবিভাগের যে কর্মীরা বাঁশের সমান মাপের টুকরোগুলো নিয়ে এসেছিল, শাবল দিয়ে মাটি খুঁড়ে দশ হাত পর পর খুঁটি পুঁততে লাগল। এই খুঁটি অবধিই মোহন বাঁশির জমির সীমানা। চৌকোনা পনেরো বিঘে জমি খুঁটি দিয়ে ঘিরতে সময় লাগল ঘন্টা দেড়েক।
মোহনবাঁশির পর সহদেবের পালা। মোহনবাঁশির জমির চারপাশে যেসব খুঁটি বসানো হয়েছে সেগুলোর পর চার ফিটের মতো বাদ দিয়ে একই প্রক্রিয়ায় জমি মেপে সহদেবকে দেওয়া হল।
কিন্তু পোকামাকড়, হরিণ, শুয়োর, তক্ষকই নয়, মাঝে মাঝে থোকায় থোকায় ঝোঁপঝাপের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে। বাদামি রঙের চেলা বিছেরা। লম্বায় এক বিগধ এক ফুটের মতো, চওড়ায় ইঞ্চিখানেক।
হোঁশিয়ার-হোঁশিয়ার। কানখাজুরা (চেলা বিছে) বহোত জহরিলা। সাপের চেয়েও খতারনাক। কামড়ালে জান চলে যাবে।
মোহনবাঁশি সহদেবরা দৌড়ে বিশ হাত দূরে চলে যায়। তাদের মুখ আতঙ্কে সাদা হয়ে তারা চিৎকার করতে আমাগো আন্ধারমানে আইনা যমের মুখে ফেইকা (ছুঁড়ে) দিছে। একদিকে জারো (জারোয়া), একদিকে কানখাজুরা, সমুন্দুরে হাঙ্গর। আমাগো নিঘঘাত মরণ।
বিভাস হুংকার ছাড়ে। চুপ। এক্কেরে চুপ। পদ্ম ম্যাঘনার দ্যাশ থিকা আইছেন। সেই হল জাগায় (জায়গায়) সাপ বাঘ কুমের (কুমির) আছিল না? বেবটাকে (সবাই) বাঘ আর কুমিরের প্যাটে গ্যাছেন? নিকি সাপের ছোবল মইরা ঝইরা গ্যাছেন?
বিভাসের তর্জন-গর্জনে মোহনবাঁশিদের চেঁচামেচি থেমে যায়। তারা চুপচাপ দূরে দাঁড়িয়ে থাকে।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।