হ্যাঁ, তা তো লিখতেই হবে।
তা হলে আমাদের সঙ্গে আপনাকেও জঙ্গলে যেতে হবে। আর তখন বুঝতে পারবেন লিকুয়িডটা কেন মাখা জরুরি।
আপনিও জঙ্গলে যাবেন নাকি?
অবশ্যই। বিশ্বজিৎ জানালেন, আন্দামানের যেখানে যেখানে রিফিউজি সেটলমেন্ট বসেছে সেসব জায়গায় তিনি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে জমি বিলিবণ্টনের শুরুটা করে দিয়েছেন। এখানেও করবেন।
বিশ্বজিৎ, বিভাস, নিরঞ্জন, লা-ডিন এবং পুনর্বাসনের কর্মীরা লোশন মেখে নিল। দেখাদেখি বিনয়ও মাখল।
যে ফ্যামিলিগুলোকে আজ জমি দেওয়া হবে তাদের হেড অফ দি ফ্যামিলি অর্থাৎ কর্তারা বিভাসের কথায় শাবল এবং বর্মি দা হাতে ঝুলিয়ে নিয়েছে। পুনর্বাসনের কর্মীরা দা-শাবল তো নিয়েছেই, সেইসঙ্গে নিয়েছে লম্বা লম্বা লোহার চেন।
ব্যারাকগুলোর সামনের ফাঁকা জায়গাটায় তিন দিকে–পুবে, পশ্চিমে এবং উত্তরে ঘোর জঙ্গল। এবার সবাই উত্তর দিকে চলল। যাদের জমি দেওয়া হবে তারা তো যাচ্ছেই, বাকি উদ্বাস্তুদের অনেকেই তাদের পিছুপিছু চলেছে। জমি কীভাবে ভাগ-বাঁটোয়ারা করা হবে ওরা স্বচক্ষে তা দেখতে চায়। কৌতূহল, অপার কৌতূহল।
কালই বিনয়ের চোখে পড়েছিল ব্যারাকের পেছন দিকে বিশাল বিশাল গাছ কেটে সেগুলোর গুঁড়ি এবং মোটা মোটা ডাল মস্ত এলাকা জুড়ে ভঁই করে করে ফেলে রান্না হয়েছে। কাল নজরে পড়েনি, পাহাড়-প্রমাণ গুঁড়িগুলোর পেছন দিকে আট-দশ ফুটের মতো মাপ করে বাঁশ কেটে সেই টুকরোগুলোও টাল দিয়ে সাজানো রয়েছে।
বনবিভাগের কিছু কর্মী বিনয়দের সঙ্গে চলেছে। কিন্তু আরও কুড়ি-পঁচিশজন দশ-পনেরোটা করে বাঁশের খুঁটি দড়ি দিয়ে শক্ত করে বেঁধে মাথায় চাপিয়ে একটু ঘুরপথে উত্তরের জঙ্গলে যাচ্ছে। এদের কারও কারও হাতে রয়েছে নানা মাপের এবং ওজনের করাত। যে করাতগুলো প্রকাণ্ড এবং বেজায় ভারী সেগুলো দুজনে দুমাথায় ধরে নিয়ে চলেছে। মাঝারিগুলো তুলনায় অনেক হালকা। এগুলোর জন্য দুজন দরকার নেই। একজনই হাতে ঝুলিয়ে নিয়ে যেতে পারছে।
বাঁশের খুঁটি বা করাত কোন কাজে লাগবে, আন্দাজ করা যাচ্ছে না। তবে এ ব্যাপারে কোনও কৌতূহল প্রকাশ করল না বিনয়। জঙ্গলে ঢুকলেই তা জানা যাবে।
ফাঁকা জায়গাটা পেরিয়ে জঙ্গলে ঢোকার মুখে এসে ঘুরে দাঁড়াল বিভাস। যে উদ্বাস্তুদের আজ জমি দেওয়া হবে না তাদের দিকে তাকিয়ে বলল, আপনেরা গায়ে লোশান মাইখা আহেন নাই। এহানেই খাড়হয়া খাড়ইয়া আমাগো কাম কাইজ (কাজকর্ম) দ্যাখেন।
লোকগুলো দাঁড়িয়ে পড়ল। বিনয়রা জঙ্গলে ঢুকে বড় বড় সব গাছ যেগুলোর বেড় তিনশো চারশো ফিটের মতো সেগুলো কাটা হলেও, শিকড়বাকড় এখনও তুলে ফেলা হয়নি। কিন্তু বিরাট মহাবৃক্ষ আর কটা? চারিদিকে অগুনতি মাঝারি এবং ছোট ছোট গাছ, ঝোঁপঝাড়, বনতুলসীর উদ্দাম জঙ্গল। যে গাছগুলো অক্ষত দাঁড়িয়ে আছে সেগুলোকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রয়েছে মোটা মোটা বেতের লতা।
বড় গাছগুলো কেটে ফেলায় কোথাও কোথাও জঙ্গল ততটা ঘন নয়, তাই আকাশ চোখে পড়ছে। কিন্তু যেখানে হাজার বছরের অরণ্য ডালপালা মেলে চাপ বেঁধে রয়েছে সেইসব এলাকায় আন্দামানের তেজি সূর্যালোকও ঢুকতে পারছে না। সমস্ত কিছু ছায়াচ্ছন্ন, অন্ধকার অন্ধকার। সেখানকার মাটি স্যাঁতসেঁতে, ঠান্ডা, শ্যাওলার পুরু স্তর জমে আছে। অসাবধানে পা ফেললে পিছলে পড়ার সম্ভাবনা।
জঙ্গলে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে ঝাঁকে ঝাকে বাড়িয়া পোকা, মাছি আর মশাদের দঙ্গল কোত্থেকে যেন বেরিয়ে এসে বিনয়দের হেঁকে ধরল। সরসর আশেপাশে অদৃশ্য সরীসৃপেরা বুকে ভর দিয়ে দূরে চলে যাচ্ছে। মাথার ওপর নাম না-জানা হাজারে হাজারে বুনো পাখি চক্কর দিয়ে কর্কশ গলায় সমানে চেঁচিয়ে চলেছে। উর্ধশ্বাসে কটা বুনো শুয়োর দৌড়তে দৌড়তে ঝোঁপঝাড় ভেদ করে আরও দূরে উধাও হয়ে গেল যেখানে জঙ্গল আরও জমাট, আরও দুর্ভেদ্য।
হঠাৎ উটকো কিছু মানুষ এসে পড়ায় এখানকার আদি বাসিন্দা জারোয়ারা খেপে গিয়ে কাল রাতে হানা দিয়েছিল। আজ দেখা যাচ্ছে পোকামাকড় সরীসৃপ পাখি থেকে জন্তুজানোয়ার, সবাই মহাবিরক্ত। উড়ে এসে যারা জুড়ে বসতে চাইছে, ভাগ বসাতে চাইছে তাদের আবহমানকালের অধিকারে তাদের ওপর ওরা আদৌ খুশি নয়। যতই চেঁচিয়ে-মেচিয়ে, চক্কর মেরে তারা হুলুস্থুল বাঁধাক, যে লক্ষ লক্ষ মানুষ সর্বস্ব খুইয়ে সীমান্তের ওপার থেকে এপারে চলে এসেছে তাদের জন্য উপনিবেশ তো গড়ে তুলতেই হবে।
কয়েক পা এগুতেই গাছের ডাল থেকে থপ করে কী যেন বিনয়দের মাথার ওপর পড়ল। খুব একটা ভারী নয়নরম, হড়হড়ে, ঠান্ডা।
বিনয় চমকে ওঠে। পরক্ষণে চোখে পড়ে অগুনতি সেঁক তারগা বেয়ে নিচে পড়ে যাচ্ছে। শুধু তারই নয়, অন্য সবারই এক হাল।
লোশনটার মহিমা এতক্ষণে বোঝা গেল। ওটা না মাখলে জেঁকগুলো তাদের গা থেকে রক্ত শুষে নিত। হাত দিয়ে কটাকে আর ছাড়ানো যেত!
বিশ্বজিৎ তাকে লক্ষ করছিলেন। চোখাচোখি হতে একটু হাসলেন। তার হাসিটা যেন বুঝিয়ে দিল কেন লোশন মাখতে হয়েছে, এবার টের পেলেন তো।
একটা সামান্য ফাঁকা মতো জায়গায় এসে সবাই দাঁড়িয়ে পড়ল। বিভাস গলার স্বর উঁচুতে তুলে হল, মোহনবাঁশি কর্মকার
একটা আধবুড়ো রোগাটে চেহারার লোক মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, খাড়া খাড়া কাঁচা-পাকা চুল–পরনে ময়লা ফতুয়া আর খাটো ধুতি-সামনে এসে বলল, আইজ্ঞা—

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।