একদিনে কটা ফ্যামিলিকে জমি দেওয়া সম্ভব?
লা-ডিনরে জিগাইয়া কইতে আছি।
লা-ডিন এই সেটলমেন্টের আমিন। উনিশশো তিরিশে বর্মার মৌলমিন থেকে খুনের দায়ে কালাপানির সাজা নিয়ে আন্দামানে এসেছিল। ভারত স্বাধীন হল,ব্রহ্মদেশ ইন্ডিয়া থেকে আলাদা হয়ে নতুন সার্বভৌম রাষ্ট্রের মর্যাদা পেল। কিন্তু লা-ডিন আর মৌলমিনে ফিরে যায়নি। আন্দামানেই থেকে গেছে।
এখানে আসার পর প্রথম বছরটা সেলুলার জেলেই কাটাতে হয়েছে লা-ডিনকে। তারপর তাকে জেলের বাইরে পি ডব্লু ডিতে কাজ দেওয়া হয়। জমি জরিপের খুঁটিনাটি শিখে সে তুঘোড় আমিন হয়ে ওঠে। সেই কাজটাই করে যাচ্ছিল। যখন আন্দামানে পূর্ব পাকিস্তান থেকে উৎখাত হওয়া মানুষদের পুনর্বাসনের জন্য ব্যাপক পরিকল্পনা নেওয়া হল সেই সময় তাকে পি ডরু ডি থেকে রিহ্যাবিলিটেশন ডিপার্টমেন্টে বদলি করা হয়।
বিভাস লা-ডিনের কাছে চলে গেল। তার সঙ্গে আলোলাচনা সেরে ফিরে এসে বিশ্বজিৎকে বলল, পনরোটা ফ্যামিলিরে জমিন মাইপা দ্যাওন (দেওয়া) যাইতে পারে। এইটাই ম্যাক্সিমাম।
বিশ্বজিৎ মনে মনে অঙ্ক কষে বললেন, তার মানে আড়াইশো ফ্যামিলিকে ল্যান্ড ডিষ্ট্রিবিউট করতে সতেরো-আঠারো দিন লেগে যাবে।
হেয়া (তা) তো লাগবই। জঙ্গলের মধ্যে জমি মাইপা (মেপে) সীমানা ঠিক করন তো সোজা কথা না। সোময় তো লাগেই।
কিন্তু
উৎসুক চোখে বিশ্বজিতের দিকে তাকাল বিভাস। কোনও প্রশ্ন করল না।
বিশ্বজিৎ বললেন, আমার পক্ষে এতদিন এই সেটলমেন্টে পড়ে থাকা সম্ভব না। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পোর্ট ব্লেয়ারে ফিরে যেতে হবে।
বিনয় পাশেই দাঁড়িয়েছিল। সে আগেই শুনেছে, পোর্ট ব্লেয়ারে বিশ্বজিতের কোর্টে অনেক কেস জমে আছে। সেই সব মামলার শুনানি হবে, কম করে ছ-সাতটা রায় দিতে হবে।
বিভাস বলল, অতদিন থাকতে হইব না। আপনের সামনে কামটা খালি আরম্ভ হউক। পরে আমরা অন্য ফেমিলিগুলানরে জমিন বিলি কইরা দিতে পারুম।
জমি ডিস্ট্রিবিউশন শেষ হলেই তুমি আর নিরঞ্জন পোর্ট ব্লেয়ার চলে আসবে। সেখানে রিহ্যাবিলিটেশন ডিপার্টমেন্টের অনেক কাজ পড়ে আছে। নতুন নতুন আরও সেটলমেন্ট বসবে। কোথায় কোথায় বসবে, ঘুরে ঘুরে সেইসব জায়গা সম্পর্কে রিপোর্ট তৈরি করতে হবে।
হে (সেই) খেয়াল আমার আছে। আপনে চিন্তা কইরেন না।
যাও, এবার কাজে লেগে পড়।
এর মধ্যে পরিতোষ সেটলমেন্টের এক ধারে অ্যাসবেস্টসের ছাউনি দেওয়া যে অফিসঘর রয়েছে সেখান থেকে মোটা বাঁধানো লম্বা একটা খাতা নিয়ে এসেছে। সেটায় উদ্বাস্তু ফ্যামিলিগুলো কাল এখানে এসেছে তাদের নাম, প্রতিটি পরিবারের আলাদা আলাদা বিবরণ লেখা আছে।
ওদিকে ধনপত এবং পুনর্বাসনের কয়েকজন কর্মী মালপত্র রাখার গুদাম থেকে কোদাল, শাবল, করাত এবং লম্বা লম্বা বর্মি দা এবং গোলাকার মস্ত দুটো জার এনে একধারে জড়ো করে রেখেছে। জার বা বয়ম দুটো গাঢ় ধরনের তরল জিনিসে বোঝাই।
উদ্বাস্তুরা সামনের ফাঁকা জায়গাটায় কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ বা বসে বসে নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল। বিভাস পরিতোষের হাত থেকে খাতাটা নিয়ে গলার স্বর উঁচুতে তুলে উদ্বাস্তুদের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগল, হগলে মন দিয়া আমার কথা শুনেন।
চিড়েটিড়ে খাওয়ার পর ছিন্নমূল মানুষগুলোর কেমন একটা এলানো ভাব এসে গিয়েছিল। এবার তারা চনমনে হয়ে ওঠে। যারা বসে ছিল তারা শরীরে ঝাঁকুনি দিয়ে উঠে দাঁড়ায়।
বিভাস থামেনি। বলেই চলেছে, কাইল জারোয়াগো লেইগা মেলা (অনেক) তাফাল গ্যাছে। তাই আপনেগো জমিন দেওন যায়। নাই। আইজ থিকা বিলি করন শুরু হইব। একদিনে এতগুলান ফেমিলিরে দেওন সোম্ভব না। রোজ পনরোটা ফেমিলিরে জমিন বিলি করন হইব। যারা আইজ জমিন পাইবেন হেয়াগো (তাদের) নাম পড়তে আছি। হাতের খাতাটা খুলে সে পড়তে লাগল, জলধর বারুই, মনা ব্যাপারী, সহদেব রুদ্রপাল…
পনেরো জনের নাম পড়া হলে বিভাস বলল, প্রতিটি ফেমিলিরে শাবল, কুড়াল, দাও (দা) দেওন হইব। আপনেরা আউগাইয়া (এগিয়ে) আইয়া লইতে থাকেন।
পনেরোটি পরিবারকে শাবল-টাবল দেওয়া হলে বিভাস ধনপতকে বলল, এইবার এয়াগো (এদের) হাতে লোশান দাও উদ্বাস্তুদের বলল, যারা আমাগো লগে জঙ্গলে জমিন লইতে যাইবেন হেরা (তারা) গায়ে লোশান মাইখা লন (নিন)। মাথাতেও মাখবেন।
লোশান অর্থাৎ লোশন। সেটা যে কী বস্তু আন্দাজ করতে পারছিল না উদ্বাস্তুরা। জঙ্গলে জমি বুঝে নিতে হলে সেটা গায়ে মাথায় কেনই বা মাখতে হবে কেউ ভেবে পাচ্ছিল না। তারা রীতিমতো অবাকই হয়ে যাচ্ছিল।
উদ্বাস্তুদের মনোভাব কিছুটা আঁচ করে বিভাস বলল, ক্যান লোশান মাখতে লাগব, জঙ্গলে গ্যালেই ট্যার পাইবেন। ধনপত তুমি এয়াগো (এদের) হাতে লোশান দাও—
ধনপত হতবুদ্ধি মানুষগুলোকে তাড়া দিয়ে দিয়ে তার কাছে ডেকে নিল। তারপর সেই মোটা জার থেকে পরপর তাদের দাঁড় করিয়ে হাতে গাঢ় তরল চটচটে জিনিস ঢেলে দিতে লাগল। নির্দেশমতো গায়ে মাথায় সেসব মেখে নিল উদ্বাস্তুরা।
বিনয় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। সেও কম অবাক হয়নি। নিচুগলায় বিশ্বজিৎকে জিগ্যেস করল, রিফিউজিদের ওই লিকুয়িডটা মাখতে বলা হল কেন?
বিশ্বজিৎ মৃদু হাসলেন। প্রশ্নের উত্তরটা না দিয়ে বললেন, আন্দামানে কীভাবে উদ্বাস্তুদের ল্যান্ড ডিস্ট্রিবিউট করা হয়, নিশ্চয়ই আপনাদের কাগজে তা লিখবেন।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।