বিনয় জানে, বিশ্বজিৎ মনেপ্রাণে চান আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ বাঙালিদের দ্বিতীয় স্বদেশ হয়ে উঠুক। সীমান্তের ওপারে অবারিত নীলাকাশ, শত জলধারায় বহমান অজস্র নদী, সোনালি শস্যে ভরা আদিগন্ত ধানের খেত, ফুল পাখি বৃক্ষলতা ইত্যাদি মিলিয়ে স্বপ্নের মতো যে মায়াবী ভূখণ্ডটি ফেলে তাদের চলে আসতে হয়েছে, বঙ্গোপসাগরের মাঝখানে ঠিক তেমনটিই তারা নিজেদের হাতে সৃষ্টি করুক। এখানকার সেটলমেন্টগুলোর সঙ্গে গভীর আবেগে তিনি জড়িয়ে পড়েছেন।
বিশ্বজিৎকে যত দেখছে ততই মুগ্ধ হচ্ছে বিনয়, ততই তার শ্রদ্ধা বেড়ে চলেছে। ইচ্ছা করলে তিনি হিল্লি-দিল্লি কলকাতা বা মুম্বইতে পোস্টিং নিতে পারতেন। বিশাল বিশাল মেট্রোপলিসের অঢেল আরাম বা স্বাচ্ছন্দ্যের কথা তিনি ভাবেননি। সর্বস্ব খুইয়ে আসা ছিন্নমূল মানুষগুলোর জন্য এই সৃষ্টিছাড়া দ্বীপপুঞ্জে পড়ে আছেন।
বিনয় গাভীর গলায় বলল, জারোয়ারা মাঝরাতে হানা দিয়েছিল ঠিকই কিন্তু কারও তো কোনও ক্ষতি হয়নি। সবাই বেঁচে আছে। আমার রিপোর্টে এই ঘটনাটা সম্বন্ধে একটা লাইনও লিখব না।
বিশ্বজিতের মুখটা আলো হয়ে উঠল। তিনি সম্পূর্ণ দুশ্চিন্তামুক্ত। আন্দামানে উদ্বাস্তু পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় কোনও রকম বাধা হলে সেটা যেন তার নিজস্ব পরাজয়।
এক সময় দুজনে তাদের ঘরে চলে এল।
২.০৪ উদ্বাস্তুদের মধ্যে তুমুল আতঙ্ক
পরশু মাঝ রাতে উত্তর দিকের গভীর জঙ্গল থেকে বেরিয়ে নয়া সেটলমেন্টে হানা দিতে এসেছিল। ফলে উদ্বাস্তুদের মধ্যে তুমুল আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল। তার ধাক্কা সামলাতে কাল দুপুর পেরিয়ে গেছে। উদ্বাস্তুদের বুঝিয়ে-সুঝিয়ে শান্ত করতে বিশ্বজিৎ বিভাস নিরঞ্জন ধনপত সিং থেকে শুরু করে পুনর্বাসন দপ্তরের কর্মীদের দম বেরিয়ে গিয়েছিল।
কাল রাতটা অবশ্য নির্বিঘ্নেই কেটে গেছে। বুশ পুলিশ আর সেটলমেন্টের কর্মীরা খুবই সতর্ক ছিল। পালা করে তারা রাত জেগেছে। জারোয়ারা আর এদিকে আসেনি।
আজ সকাল হতে না হতেই বিভাস নিরঞ্জনরা হাঁকডাক করে উদ্বাস্তুদের ঘুম ভাঙিয়ে দিয়েছিল। পশ্চিম দিকের পাহাড়ের ঢাল যেখানে ঝোঁপঝাড় আর অজস্র বুনো গাছ আর লতায় ঠাসা, তাড়া দিয়ে দিয়ে তাদের সেখানে পাঠিয়েছে। আবরু বাঁচানোর জন্য চারদিক ঘিরে এখানে পায়খানা-টায়খানা তৈরি করে রাখা হয়নি। বুড়ো-ধুড়ো, বাচ্চা-কাচ্চা, জোয়ান ছেলেমেয়ে প্রতিদিনের প্রাকৃত কর্মটি সারার জন্য ঝোঁপজঙ্গলের আড়ালে না গিয়ে উপায় নেই কারও। খোলা আকাশের নিচে এই মুক্ত, আদিম শৌচাগারই একমাত্র ভরসা।
জঙ্গল থেকে সমুদ্রে গিয়ে মুখটুখ ধুয়ে উদ্বাস্তুরা ফিরে আসতেই বিভাসরা হেঁকে হেঁকে বলতে লাগল, হগলে (সবাই) একহান কইরা থাল গিলাস (থালা গেলাস) লইয়া আহেন।
আগের দিনই উদ্বাস্তুদের কিছু কিছু বাসনকোসন দেওয়া হয়েছিল। একটু পর দেখা গেল, কথামতো থালা এবং গেলাস নিয়ে বিভাসদের সামনে কাতার দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে।
চারদিকের হাঁকাহাঁকিতে বিশ্বজিৎ এবং বিনয়েরও ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। তারাও তাড়াহুড়ো করে সমুদ্র থেকে মুখটুখ ধুয়ে বিভাসদের কাছে চলে এলেন।
সকালে শুকনো খাবারের ব্যবস্থা। চিঁড়ে, আখের গুড় এবং এক গেলাস করে দুধ। আমেরিকার কটা চ্যারিটেবল অর্গানাইজেশন এবং স্ক্যান্ডিনেভিয়ার এভাঙ্গেলিস্টরা পূর্ব পাকিস্তানের উদ্বাস্তুদের জন্য ঢাউস ঢাউস সুদৃশ্য টিনের পাত্র বোঝাই করে পাউডার মিল্ক, চকলেট, চিজ, মাখন ইত্যাদি নিয়মিত কলকাতায় পাঠাচ্ছে। সর্বস্ব হারিয়ে আসা রুক্ষ, আধমরা, ছিন্নমূল মানুষগুলো যাতে অপুষ্টিতে ভুগে ভুগে শেষ না হয়ে যায় সে জন্য সাগরপারের দাঁতব্য প্রতিষ্ঠানগুলোর অনন্ত দুর্ভাবনা।
যেসব পুষ্টিকর খাদ্যবস্তু জাহাজ বা প্লেনে কলকাতায় পৌঁছয়। তার সামান্য কণিকা আন্দামানের দুর্গম অরণ্যে যেসব সেটলমেন্ট বসছে সেখানেও পাঠানো হয়। তবে শুধুই পাউডার মিল্ক। অন্য সমস্ত বাদ।
গুঁড়ো দুধ গুলে প্রকাণ্ড একটা ড্রাম বোঝাই করে রেখেছিল সেটলমেন্টের কর্মীরা।
প্রতিটি উদ্বাস্তুর থালায় চিড়ে, গুঁড় ও গেলাসে দুধ বিলি করা শুরু হয়।
বিশ্বজিৎ আগেই কড়া হুকুমনামা জারি করে রেখেছিলেন, তাঁদের জন্য আলাদা দামি দামি খাবারের ব্যবস্থা যেন না করা হয়। উদ্বাস্তুরা যা খাবে যে দরের মহামান্য অফিসারই হোন, তাকেও তাই খেতে হবে।
বিশ্বজিৎ আর বিনয় খালি হাতে চলে এসেছিল। তাদের ঘরে আগে থেকেই থালা গেলাস রাখা ছিল। পরিতোষ দৌড়ে গিয়ে নিয়ে এল। চিঁড়ে-গুড়টুড় নিয়ে উদ্বাস্তুদের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে খেতে শুরু করলেন বিশ্বজিৎরা।
খাওয়াদাওয়া চুকতে ঢুকতে মিনিট চল্লিশেক লেগে গেল। এর। মধ্যে বেশ খানিকটা বেলা হয়েছে। সূর্য পুব দিকের পাহাড়ের চুড়োর ওপর উঠে এসেছে। তেজি রোদে ভেসে যাচ্ছে বনজঙ্গল উপত্যকা। এই সকাল বেলাতেই সমুদ্রের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না। রোদে নোনা জল থেকে এখনই আঁঝ উঠে আসছে। বেলা যত বাড়বে এই ঝঝ ততো বাড়বে। চোক আরও ধাঁধিয়ে যাবে।সসস।
বিশ্বজিৎ পরিতোষ বিভাসদের ডেকে বললেন, আর দেরি কোরো না; জমি মেপে ভাগ বাটোয়ারার বন্দোবস্ত কর।
বিভাস বলল, হ। অহনই কামটা শুরু করুম।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।