হতচকিত ভাবটা কাটিয়ে উঠতে বিশ্বজিৎদের খানিকটা সময় লাগল। তারপর বিশ্বজিতের সঙ্গে পুনর্বাসন দপ্তরের কর্মীরা উদ্বাস্তুদের বোঝাতে লাগল, তাদের কোনও ভয় নেই। বুশ পুলিশ আছে, পুনর্বাসন এবং কাছাকাছি বন বিভাগের অগুনতি কর্মী আর ফরেস্ট গার্ড রয়েছে, তেমন বুঝলে পোর্ট ব্লেয়ার থেকে আরও পুলিশ আনা হবে। জায়োরারা উদ্বাস্তুদের চামড়ায় একটি আঁচড় কাটতে পারবে না। কিন্তু কে কার কথা শোনে! তাদের কান্না এবং চিৎকার ক্রমশ আরও উদ্দাম হয়ে উঠতে থাকে।
ধনপত বিশ্বজিতের খুব কাছে এসে চাপা গলায় বলে, এ আদমিলোক কোনও কথা শুনবে না। হুকুম দেন তো থামাতে কোসিস করি।
বিশ্বজিৎ বললেন, দেখ চেষ্টা করে।
ধনপত উদ্বাস্তুদের দিকে সরে গিয়ে গলার স্বর শেষ পর্দায় তুলে হুঙ্কার ছাড়ে, রিফুজলোগ বিলকুল চোপ। রোনা (কাঁদা), চিল্লানা বন্ধ কর। বিনয় আগেই শুনেছে উনিশ বছর আগে তিন তিনটি খুন করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আসামি হিসেবে কালাপানিতে সাজা খাটতে এসেছিল ধনপত। এই মধ্যরাতে তার ভেতর থেকে সেই দুর্ধর্ষ কয়েদিটি হঠাৎই বেরিয়ে এসেছে। তার হাঁকানিতে উদ্বাস্তুদের উতরোল কান্নাকাটি লহমায় মিইয়ে যায়। কেউ কেউ ভয়ে ভয়ে জিগ্যেস করে, জারো বাইর হইয়া আইছে। অহন আমাগো কী অইব?
ধনপত এবার নরম গলায় বলল, ডরো মাত। আমরা তো আছি। বারিকে (ব্যারাকে) চলে যাও। আমরা জংলি আদমিদের সামলাব।
উদ্বাস্তুরা আর দাঁড়ায় না; যে যার ব্যারাকে ঢুকে পড়ে। কিন্তু ত্রাস তাদের যতটা, কৌতূহল তার চেয়ে লেশমাত্র কম নয়। ব্যারাকে ঢুকলেও দরজা সামান্য ফাঁক করে অনেকে রুদ্ধশ্বসে সন্ত্রস্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে। সশস্ত্র জারোয়ারা সেটলমেন্ট পর্যন্ত এসে পড়বে কি না তাই নিয়ে তাদের প্রচণ্ড শঙ্কা।
ওদিকে অদৃশ্য পেরিমিটার রোড থেকে বনভূমি, আকাশ, পাহাড় খান খান করে যেন ড্রামের আওয়াজ আরও আরও প্রবল হয়ে উঠছে। আন্দাজ করা যাচ্ছে জারোয়ারা নিশ্চয়ই গভীর অরণ্যে তাদের বাসস্থানে ফিরে যায়নি।
বিশ্বজিৎ থেকে চেইনম্যান ধনপত, ক’জন বুশ পুলিশ থেকে পরিতোষ, নিরঞ্জন, বিভাস এবং পুনর্বাসন দপ্তরের সব কর্মী সেটলমেন্টের ফাঁকা এলাকাটার ওধারে জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে আছে। পলকহীন। প্রায় দমবন্ধ করে নিঃশব্দে।
আচমকা চোখে পড়ল সাফ করা জায়গার ওধারের জঙ্গল থেকে আবছা ছায়ামূর্তির মতো একদল আধা উলঙ্গ কালো মানুষ বেরিয়ে এল। আফ্রিকার নিগ্রোয়েডদের মতো কালো কালো চেহারা, পাঁচ ফিটের মতো হাইট, হাতে তির-ধনুক এবং অন্য সব আদিম অস্ত্র।
অনেকগুলো মশাল জ্বলছিল ঠিকই কিন্তু তার আলো অতদূর অবধি পৌঁছায়নি। তবু কুয়াশা থেকে চুঁইয়ে আসা ঝাপসা আলোয় তাদের মোটামুটি দেখা যাচ্ছে। নিশ্চয়ই জারোয়া।
এর আগে কখনও জারোয়া দেখেনি বিনয়। তাদের কথা শুনেছে মাত্র। সামনাসামনি তাদের আসতে দেখে বুকের ভেতর। ঠান্ডা শিহরন খেলে যায় তার।
জারোয়াদের উদ্দেশ্য পরিষ্কার। দক্ষিণ আন্দামানের এই অঞ্চলে উড়ে আসা আগন্তুকদের তাড়াবার জন্য, তারা মাঝরাতে হানা দিয়েছে।
বিশ্বজিৎ সকলকে সতর্ক করে দিলেন, খুব সাবধান। জারোয়ারা যেন এখানে আসতে না পারে।
একজন বুশ পুলিশ বলল, জরুর জংলি লোগোকো রুখ দুঙ্গা
সেই শিখ পুলিশটি বলল, সাহাব, আপকো হুকুম হো যায় তো, ফায়ার করে দিই। দো-চার জংলি মর যায়গা, ব্যস কাম ফতে। ও হারামিরা আর কভি ইহা আনেকো ভরসা নেহি পায়েগা। ফায়ার করু?
বুশ পুলিশটি গুলি বন্দুক ছাড়া অন্য কিছু বোঝে না। এদিকে সরকার থেকে কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ভারতবর্ষের পাহাড়বাসী জনজাতি, আদিবাসী, কারও গায়ে একটি আঁচড় কাটা চলবে না। নিজস্ব পরিবেশে তাদের নিজের মতো করে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। কত ধরনের মানুষ রয়েছে এই সুবিপুল ভূখণ্ডে। তাদের যেভাবেই হোক সংরক্ষণ করতে হবে। এই সব ছোট বড় অসংখ্য জনগোষ্ঠী নিয়েই তো দেশ। অন্য সবার মতো তাদেরও বেঁচে থাকার অধিকার আছে। এরা শেষ হয়ে গেলে বহুবর্ণময়। বহুভাষাভাষী ভারতবর্ষের জনজীবন তার সুবিশাল মহিমা হারিয়ে ফেলবে। যে যেভাবে আছে সে সেইভাবেই থাকুক, এই হল সরকারের ঘোষিত নীতি। পূর্ব পাকিস্তানের আগন্তুকদের জন্য বনবাসী জারোয়ারা উৎখাত হয়ে যাক–এটা কোনওভাবেই কাম্য নয়। সম্পূর্ণ বেআইনিও।
বিশ্বজিৎ আঁতকে উঠলেন, না না, ওদের গায়ে গুলি চালানো চলবে না।
শিখ জিগ্যেস করল, তাহলে জংলিদের রুখব কী করে?
একটু চিন্তা করে বিশ্বজিৎ বললেন, আকাশের দিকে বন্দুক তুলে তোমরা কয়েকবার ব্ল্যাঙ্ক ফায়ার কর। মনে হয় ফাঁকা আওয়াজে কাজ হবে।
শুধু শিখটিই নয়, যে ক’জন বুশ পুলিশ নয়া সেটলমেন্ট অবধি চলে এসেছিল তারা সবাই মাথার ওপর বন্দুক উঁচিয়ে পর পর ফায়ার করতে লাগল।
লহমায় ম্যাজিকের মতো কাজ হল। জেফ্রি পয়েন্টের আকাশ এবং বনভূমির নিরেট স্তব্ধতাকে চৌচির করে মুহুর্মুহু যে শব্দ হতে জঙ্গলের আদিম বাসিন্দারা ভীষণ ভয় পেয়ে যায়, খুব সম্ভব অরণ্যের গোপন অন্তঃপুরে থাকলেও বন্দুকের মহিমা তারা জানে।
কালো কালো ঝাপসা যে মূর্তিগুলো দেখা গিয়েছিল, লহমায় জঙ্গলের ভেতর তারা উধাও হয়ে যায়। এক ফোঁটা রক্তপাত হল না, কিন্তু কৌশলে কাজ হাসিল হয়ে গেল।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।