বুশ পুলিশের দলটা জানতে চাইল পেরিমিটার রোডের টঙে তারা ফিরে যাবে কি না।
বিশ্বজিৎ বললেন, আরও কিছুক্ষণ থাকো। জাবোয়ারা ভীষণ একরোখা। তেমনি হিংস্র। খুব সহজে এখানে সেলটমেন্ট বসাতে দেবে না। বার বার এসে তারা হামলা চালাতে চাইবে।
আরও ঘন্টাখানেক স্নায়ু টান টান করে জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন বিশ্বজিৎরা। তারপর সবাইকে হুঁশিয়ার থাকতে বলে বুশ পুলিশের দলটাকে পেরিমিটার রোডে পাঠিয়ে বিভাস, নিরঞ্জন, পরিতোষ, ধনপত এবং পুনর্বাসন বিভাগের কর্মীদের জিগ্যেস করেন, তোমাদের এখানে ক্যানেস্তারা আছে?
পরিতোষ জেফ্রি পয়েন্টের কলোনাইজেশন অ্যাসিস্ট্যান্ট বা সি এ বিভাস নিরঞ্জনরা আট-দশ দিনের বেশি এখানে থাকবে না। তাদের পোর্ট ব্লেয়ারে ফিরে যেতে হবে। কিছুদিন পর ফের তারা উদ্বাস্তু আনতে কলকাতায় যাবে। মুখের কথা খসালেই তো মেনল্যান্ড থেকে উদ্বাস্তু আনা যায় না। তার জন্য অনেক তোড়জোড় করতে হয়। জেফ্রি পয়েন্টের সব ঝক্কি সামলাতে হবে পরিতোষকে। অবশ্য তার সঙ্গে ধনপতের মতো জবরদস্ত একজন কর্মী ছাড়াও রিহ্যাবিলিটেশনের আরও অনেকেই রয়েছে। তবু জারোয়াদের জন্য দুশ্চিন্তাটা থেকেই যাচ্ছে বিশ্বজিতের।
পরিতোষ বলল, না স্যার
যত তাড়াতাড়ি পার, ইনডেন্ট করে পোর্ট ব্লেয়ার থেকে কুড়ি-পঁচিশটা ক্যানেস্তারা আনিয়ে নিও। জারোয়ারা এদিকে আসুক বা না-আসুক, সন্ধের পর থেকে কয়েক বার ৮ ক্যানেস্তারাগুলো পিটিয়ে আওয়াজ করবে। ওদিকে বুশ পুলিশ আর তাদের ভ্রাম তো রয়েছেই। বেশি আওয়াজ হলে জারোয়ারা সহজে এদিকে ঘেঁষবে না।
পরিতোষ ঘাড় কাত করে জানায়, বিশ্বজিৎ যা বলেছেন অবিলম্বে তা করা হবে।
যাও, এবার গিয়ে শুয়ে পড়। আশা করি, আজ রাত্তিরে আর কোনও উৎপাত হবে না।
সবাই যে যার আস্তানায় চলে গেল। বিশ্বজিৎ বিনয়কে নিয়ে তার ঘরের দিকে যেতে যেতে লক্ষ করলেন, উদ্বাস্তুরা কেউ তাদের লম্বা লম্বা ব্যারাকে শুয়ে পড়েনি। বন্ধ দরজার তলা দিয়ে আলোর রেখা দেখা যাচ্ছে। তার মানে ভেতরে লণ্ঠন জ্বলছে।
অনেকের চাপা গলার স্বর ব্যারাকগুলোতে শোনা যাচ্ছে। বোঝাই যাচ্ছে জারোয়াদের এই অতর্কিত হামলাটা তাদের হতচকিত এবং সন্ত্রস্ত করে তুলেছে। নির্ঘাত তাই নিয়ে তাদের কথাবার্তা চলছে। বাকি রাতটা নিশ্চয়ই ওরা ঘুমবে না। ভয়ে, উত্তেজনায় কাটিয়ে দেবে।
উদ্বাস্তুদের কথাবার্তা শোনার ভীষণ আগ্রহ ছিল বিনয়ের। কিন্তু সে সুযোগ পাওয়া গেল না। বিশ্বজিৎ তাকে দাঁড়াতে দিলেন না। সোজা নিজের ঘরে নিয়ে গেলেন। বললেন, শুয়ে পড়ুন। ভোর। হতে দু-আড়াই ঘণ্টার বেশি সময় নেই। ঘুমন। নইলে শরীর খারাপ হবে।
বিনয় শুয়ে পড়ল ঠিকই। কিন্তু কিছুতেই ঘুম আসছে না। একটা প্রবল দুর্ভাবনা তার মাথায় চেপে বসেছে যেন।
এই যে ছিন্নমূল মানুষের দলটা কাল এস এস মহারাজা’ জাহাজে আন্দামানে এখানে এসে পৌঁছেছে, সেটা পুরোপুরি স্বেচ্ছায় নয়। অনেক দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল তাদের মনে। তা ছাড়া রাজনৈতিক দলগুলো মিছিলে স্লোগানে অবিরল চিৎকার করে গেছে, উদ্বাস্তুরা যেন আন্দামানে না আসে, পশ্চিমবঙ্গেই পুনর্বাসনের দাবিতে অনড় থাকে।
সেন্ট্রাল গভর্নমেন্টের রিহ্যাবিলিটেশন দপ্তর এবং পশ্চিমবাংলার ত্রাণ বিভাগের অফিসাররা অনেক বুঝিয়েসুঝিয়ে তাদের অনেকটা নরম করেছিলেন। জানিয়েছিলেন উদ্বাস্তুদের জন্য বঙ্গোপসাগরের এই দ্বীপপুঞ্জে সোনায় মোড়া ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে। পূর্ব পাকিস্তানে তারা যা ফেলে এসেছে তার বিশগুণ পাওয়া যাবে এখানে এলে।
এই বোঝনোর কাজটা বিনয়ও কম করেনি। সেও উদ্বাস্তুদের প্রচুর ভরসা দিয়েছিল। তাই এদের, বিশেষ করে কাল যারা এসেছে তাদের সম্বন্ধে কিছু দায় তারও রয়েছে। অন্তত সেটাই সে মনে করে।
রস আইল্যান্ড থেকে লঞ্চে পোর্ট ব্লেয়ারে আসার সময় হলধর সূত্রধর, মাখন রুদ্রপালরা এভাবে তাকে জারোয়াদের কথা বলেছিল। বিনয় তাদের অনবরত সাহস জুগিয়ে গেছে। জারোয়ারা তাদের মতো জঙ্গলে থাকে। হয়তো নতুন লোক দেখলে ছুটকো-ছাটকা ঝঞ্ঝাটও বাধাতে চেষ্টা করে। কিন্তু পুলিশ আছে, অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের লোকেরা আছে। যত হিংস্রই হোক, জঙ্গলের অভ্যন্তর থেকে বেরিয়ে এসে জারোয়ারা তাদের লেশমাত্র ক্ষতি করতে পারবে না।
কিন্তু আসলে কী দাঁড়াল? আজ বিকেলে উদ্বাস্তুরা জেফ্রি পয়েন্টে সেটলমেন্ট বানাতে এসেছে, আর আজই মধ্যরাতে কিনা জারোয়ারা হানা দিয়ে বসল।
ত্রাণ শিবিরে বা শিয়ালদা স্টেশনের চত্বরে দিনের পর দিন কাটিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের উচ্ছেদ হয়ে আসা মানুষগুলোর জীবনশক্তি ক্ষয়ে ক্ষয়ে শেষ হয়ে এসেছে; মনোবল গিয়ে ঠেকেছে তলানিতে। আর প্রথম দিনই সশস্ত্র, তিরন্দাজ জারোয়াদের হামলায় তারা নিশ্চয়ই দিশেহারা হয়ে পড়েছে। জেফ্রি পয়েন্টে এমন একটা অভ্যর্থনার জন্য কেউ প্রস্তুত ছিল না। ভয়ে, আতঙ্কে তারা একেবারে বিস্ত।
ধনপত এই মানুষগুলোকে ধমকে ধামকে ব্যারাকে পাঠিয়ে দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু আজকের রাতটা কাটলে তারা কী করে বসবে, সেই চিন্তাটা কাটার মতো বিঁধে বিনয়ের মাথায় বিঁধে রইল।
অনেকক্ষণ বাদে হঠাৎ খেয়াল হল পাহাড়, জঙ্গল, উপত্যকা, সব নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। বুশ পুলিশের ভ্রামগুলো এখন আর বাজছে না। কোথাও কোনও শব্দ নেই। তার মানে জারোয়ারা দুর্গম বনভূমিতে তাদের বাসস্থানে ফিরে গেছে।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।