ধনপতদের তিন জনের হাতে তিনটে মশাল। ফাঁকা জায়গাটা তারা সবে পেরিয়েছে, তখনই দেখা গেল আট-দশজন হট্টাকট্টা চেহারার বুশ পুলিশ, হাতে বন্দুক, জঙ্গল ভেদ করে ঊৰ্ধশ্বাসে দৌড়তে দৌড়তে বেরিয়ে এসে ধনপতদের দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। তাদের চোখেমুখে উত্তেজনা, ত্রাস। ধনপতদের সঙ্গে ওরা কিছুক্ষণ কথা বলল, তার একটা বর্ণও শুনতে পেল না বিনয়রা।
একটু পরেই দেখা গেল বুশ পুলিশের দলটাকে নিয়ে ধনপতরা ফিরে এল।
বুশ পুলিশরা প্রায় সবাই বিহারি আর পাঞ্জাবের লোক। চাকরি নিয়ে দুর্গম দ্বীপে চলে এসেছে।
বিশ্বজিৎ ওদের চেনেন। পুলিশের দলটাও তাকে খুব ভালো করেই চেনে। জিগ্যেস করলেন, ডিউটি ছেড়ে তোমরা পালিয়ে এলে কেন?
বিনয় লক্ষ করল, বিশ্বজিতের কপাল কুঁচকে গেছে। পুলিশরা। ঘাঁটি ছেড়ে চলে আসায় তিনি খুবই বিরক্ত।
পুলিশরা হাইমাই করে তড়বড়িয়ে একসঙ্গে বলতে শুরু করল, ফলে বিরাট এক হট্টগোলের সৃষ্টি হল।
গলা চড়িয়ে ধমকের সুরে বিশ্বজিৎ বললেন, হল্লাগুল্লা মাত কর। এক সাথ নেহি– একজন সিপাহি শিখের দিকে আঙুল বাড়িয়ে বলল, তুম বোলো। আইস্তা আইস্তা। হড়বড়াকে নেহি।
শিখ জানাল, তারা পেরিমিটার রোডে টঙের মাথায় বসে। অন্যদিনের মতো জারোয়া এলাকার দিকে নজর রাখছিল। আচানক দেখতে পেল দূর থেকে জংলিরা তির-ধনুক ইত্যাদি মারাত্মক হাতিয়ার নিয়ে সেটলমেন্টের দিকে আসছে। নয়া আদমিরা অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তানের উৎখাত মানুষেরা বনজঙ্গল কেটে এখানে কলোনি বসাতে এসেছে তা তারা টের পেয়ে গেছে। এই এলাকায় বাইরের লোকজন এসে পাকাপাকিভাবে থাকুক সেটা তাদের আদৌ পছন্দ নয়। তাই জারোয়াদের মতলব ছিল মধ্যরাতে হামলা চালিয়ে উদ্বাস্তুদের ভাগিয়ে দেবে।
বুশ পুলিশ জারোয়াদের দেখামাত্র ড্রাম পিটিয়ে হল্লা বাধিয়ে সেলটমেন্টের সবাইকে হুঁশিয়ার করে দিচ্ছে। শুধু তাই নয়, ড্রামের আওয়াজ-টাওয়াজ কেউ যদি শুনতে না পেয়ে থাকে তাই শিখেরা কয়েকজন এখানে দৌড়ে এসেছে।
এদিকে লম্বা লম্বা ব্যারাকগুলোতে উদ্বাস্তুরা মড়ার মতো অসাড়ে ঘুমচ্ছিল। হইচই শুনে তাদের চোখ থেকে ঘুম ছুটে যায়। বাচ্চাকাচ্চা ছেলেবুড়ো সুদ্ধ শ’পাঁচেক মানুষ হুড়মুড় করে বাইরে বেরিয়ে আসে।
বিনয় লক্ষ করল, মশালের আলোয় তাদের তিনদিক ঘিরে উদ্বিগ্ন মানুষের সারি সারি মুখ। ভিড়ের ভেতর থেকে হলধর সূত্রধর, মাখন রুদ্রপাল, এমনি কয়েকজন ভয়ে ভয়ে সামনে এগিয়ে আসে।
দূরে বুশ পুলিশের টঙগুলো থেকে অবিরাম ড্রামের গম্ভীর, হাড়-কাঁপানো শব্দ ভেসে আসছে। সেই সঙ্গে অরণ্য ভেদ করে আসছে হইচই।
হলধর জিগ্যেস করে, মইদ্য রাইতে ঢাকের বাদ্যি ক্যান ছুটোবাবু? মেলা (অনেক) মাইনষে চিল্লাইতেও আছে।
মাখন রুদ্রপাল বলল, এই অচিন দ্যাশে ডরে বুক কাপে ছুটোবাবু। কুনো বিপদ কি ঘটল?
আচমকা বর্মি চেইনম্যানদের একজন বলে ওঠে, জারোয়া আতা হ্যায়। উসি লিয়ে হেঁশিয়ারি দেওয়া হচ্ছে। বহুকাল আন্দামানে থাকার কারণে সে এবং তার মতো সব বর্মি এবং ফারেন হিন্দুস্থানিটা রপ্ত করে ফেলেছে। আঠারোশো সাতান্নয় মহাবিদ্রোহের পর যুক্তপ্রদেশ থেকে যে বিপ্লবী সিপাহিদের আন্দামানে পাঠানো হয়েছিল তখন থেকেই এখানকার মুখের বুলি হয়ে দাঁড়িয়েছে হিন্দুস্থানি হিন্দি আর উর্দুর মিশেলেও এই ভাষাটা সবাই বলে থাকে–সে বর্মিই হোক বা কারেন, কিংবা বাঙালি তামিল অর্থাৎ মারাঠি–তফাৎ ভারতের সমস্ত প্রদেশের মানুষও।
এতক্ষণ পাঁচশো মানুষের বিশাল জনতার মুখে চোখে ছিল উৎকণ্ঠা। লহমায় সেখানে আতঙ্ক ফুটে বেরুল। শোরগোল জুড়ে দিল তারা।
গরমেন (গভর্নমেন্ট) আমাগো মারতে লইয়া আইছে এই আন্ধারমান দ্বীপে।
সমুন্দুরে ঝড় তুফানে আছাড়িপিছাড়ি খাইছি। টেউগুলান আকাশে তুইলা পাতালে নামাইয়া আমাগো দুরমুশ করতে করতে হাড্ডিগুড্ডি চুর চুর কইরা ছাড়ছে। হের পরেও বাইচা আছিলাম। কিন্তু জারোর (জারোয়ার) হাত থিকা নিস্তার নাই। অরা আমাগো নিকাশ কইরা ছাড়ব।
হলধর কঁপা কাপ গলায় বিনয়কে বলল, ‘রস’ দ্বীপ থিকা ইস্টিমারে পুট বিলানে (পোর্ট ব্লেয়ারে) আসনের সোময় জারোগো কথা আপনেরে কইছিলাম। পাকিস্থানে রাজাকার, আর পশ্চিমা মুসলমানগো হাত থিকা কুনোরকমে বাপ-মায়ের দেওয়া পরান লইয়া ইন্ডিয়ায় আইছিলাম। আন্ধারমানে আমাগো নিঘঘাত মরণ। আপনের উপর ভরসা কইরা এই আমরা কই (কোথায়) আইলাম!
বিনয় বিব্রতভাবে কী উত্তর দিতে যাচ্ছিল, আচমকা ডান ধারে ভিড়ের শেষ মাথায় যে উদ্বাস্তুরা দাঁড়িয়ে ছিল, তুমুল হুলস্থূল বাধিয়ে দিল। জোরে জোরে মাথা ঝাঁকিয়ে উন্মাদের মতো বলতে লাগল, এইহানে আমরা থাকুম না। আমাগো এই যমের পুরী থিকা অন্য হানে লইয়া যান।
বয়স্ক পুরুষগুলোর হইচই শুনতে শুনতে নানা বয়সের মেয়েমানুষ এবং বাচ্চারা ভীষণ ভয় পেয়ে যায়। তারা ডাক ছেড়ে প্রচণ্ড কান্না জুড়ে দিল।
চিৎকার এবং কান্নার একটানা শব্দ জেফ্রি পয়েন্টের পাহাড়ে পাহাড়ে ধাক্কা খেতে খেতে মাঝরাতের আবহাওয়াটাকে উতরোল ফুরে তোলে।
ড্রামের আওয়াজে এবং জারোয়াদের হাতিয়ার হাতে দূরের ৮ জঙ্গল থেকে ধেয়ে আসার খবর শুনে বিশ্বজিৎরা ভীষণ দুশ্চিন্তায় ছিলেন। উদ্বাস্তুদের কান্না এবং চেঁচামেচিতে তারা একেবারে হকচকিয়ে যান।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।