জানিস ছোটদি, আন্দামানে আসার পর এমন একটা ঘটনা ঘটেছে তার পরিণাম সুখকর হবে, নাকি অনন্ত বেদনাদায়ক, বুঝতে পারছি না। ঘটনাটি আমাকে প্রবল সংশয়ের মধ্যে ছুঁড়ে দিয়েছে। এ বিষয়ে এই চিঠিতে আর কিছু লিখছি না। তেমন বুঝলে পরে সমস্ত জানাব। দ্বারিকদাদু, জেঠিমা, হিরণদা আর তুই আমার ভালোবাসা এবং প্রণাম নিস। ইতি তোদের বিনু।
নিচে বিশ্বজিৎ রাহার ঠিকানা দিয়ে লিখল, এখানে উত্তর দিলে আমি পেয়ে যাব।
আগাগোড়া চিঠিটা একবার পড়ল বিনয়। আচমকা খেয়াল হল, ঝিনুকের ব্যাপারটা গোপন রাখবে ঠিক করেও নিজের অজান্তেই তার সম্বন্ধে একটু ইঙ্গিত দিয়ে ফেলেছে। লাইনগুলো কেটে দেবে কি? পরক্ষণে ভাবল, লেখা যখন হয়েই গেছে–থাক।
তিনটে চিঠি তিনটে খামে পুরে মুখ আঠা দিয়ে আটকে আনন্দ, প্রসাদ এবং সুধার পুরো নাম ঠিকানা লেখা যখন শেষ হয়েছে সেই সময় দূর থেকে অনেকগুলো ড্রাম বাজানোর একটানা তীব্র আওয়াজ ভেসে এল। কারা যেন উন্মাদের মতো বাজিয়ে চলেছে।
আদিম বনভূমির অন্তরাত্মা ভেদ করে শব্দপুঞ্জ উঠে আসছে। মধ্যরাতের নিরেট স্তব্ধতা ভেঙেচুরে খান খান হয়ে যাচ্ছে।
অজানা ভয়াবহ কোনও আশঙ্কায় পা থেকে মাথা অবধি কেঁপে যায় বিনয়ের।
এদিকে বাইরে তুমুল হইচই শুরু হয়ে গেছে। পুনর্বাসন দপ্তরের কর্মীরা সারাদিন অসুরের মতো খেটে কোনওরকমে খাওয়াদাওয়া সেরে অসাড়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল। ড্রামের শব্দে তাদের চোখ থেকে লহমায় ঘুম ছুটে গেছে। বিছানা থেকে উঠে লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে যে যার ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে পড়েছে।
জানালার বাইরে বিহুলের মতো তাকিয়ে ছিল বিনয়। দেখতে পেল কতকগুলো ছায়ামূর্তি ক্ষিপ্র হাতে একের পর এক মশাল জ্বালাচ্ছে। বেশ কয়েকজনের হাতে লম্বা লম্বা টর্চ। ওদের মধ্যে থেকে কয়েকজন সমানে চেঁচিয়ে চলেছে, জারোয়া–জারোয়া–হোঁশিয়ার।
নতুন সেটেলমেন্টের এধারের অংশটুকু আলোয় ভরে গেছে। এখন বাইরের লোকগুলোকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কলোনাইজেশন অ্যাসিস্ট্যান্ট পরিতোষ বণিক, চেইনম্যান ধনপত সিং, তার চারজন বর্মি সহকারী, বিভাস, নিরঞ্জন এবং রিহ্যাবিলিটেশন ডিপার্টমেন্টের অন্য সব বাঙালি এবং অবাঙালি কর্মীরা, যাদের মধ্যে বেশ ক’জন পুরানো দাগি আসামি। এরা ব্রিটিশ আমলে যাবজ্জীবন কালাপানি’র সাজা নিয়ে আন্দামানে জেল খাটতে এসেছিল।
ওদিকে পাশের খাটে সচকিত হয়ে উঠে বসেছেন বিশ্বজিৎ। হাতের বইটা একধারে রেখে মশারি তুলে নেমে এলেন। বললেন, চলুন, দেখা যাক কী হল–
২.০২ উদ্দাম জঙ্গলের ভেতর
উত্তর দিকে অনেকটা দূরে চাপ বাঁধা, ঝাপসা, উদ্দাম জঙ্গলের ভেতর ড্রামের আওয়াজ ক্রমশ আরও তীব্র হয়ে উঠছে। সেই সঙ্গে ভেসে আসছে বেশ কিছু মানুষের হইচই। তারা একসঙ্গে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে কী বলছে, এখান থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না।
অত দূরের ওই জঙ্গলে এত রাতে কারা ড্রাম পেটাচ্ছে, কিছুই আন্দাজ করতে পারল না বিনয়। অজানা শঙ্কায় তার বুকের ভেতরটা কেঁপে গেল।
উত্তর দিকে তাকিয়ে ছিলেন বিশ্বজিৎ। পলকহীন। পাশেই দাঁড়িয়ে আছে বিনয়। নিচু গলায় জিগ্যেস করল, কারা ড্রাম বাজাচ্ছে?
বিশ্বজিৎ তার দিকে তাকালেন না। দুরে চোখ রেখে বললেন, বুশ পুলিশেরা।
ব্যাপারটা বোধগম্য হল না। বিনয় জানতে চাইল, বুশ পুলিশ বলতে?
এবার চোখ ফেরালেন বিশ্বজিৎ। দুরের দুর্ভেদ্য বনভূমির দিকে আঙুল বাড়িয়ে বললেন, ওখানে পেরিমিটার রোড় রয়েছে। জঙ্গলের ভেতর দিয়ে পশ্চিম থেকে ওটা পুব দিকে চলে গেছে।
বিনয়ের কাছে ব্যাপারটা গুলিয়ে গেল। সে জিগ্যেস করে, এ জঙ্গলের মধ্যে রাস্তা আছে নাকি?
না না—
বিশ্বজিৎ বুঝিয়ে দিলেন, পেরিমিটার রোড নামে রাস্তাটা পুরোপুরি কাল্পনিক। ওটা মোটামুটি ভেবে নেওয়া হয়েছে। জঙ্গলে সোজা একটা লাইন ধরে দেড়-দুশো গজ দূরে দূরে তিরিশ-চল্লিশ ফিট উঁচু উঁচু টঙ বানিয়ে দিনরাত পালা করে তিন শিফটে পুলিশের একটা দল পাহারা দেয়। কেননা পেরিমিটার রোডের ওধারে আরও গভীর অরণ্যে হিংস্র জারোয়ারা থাকে। মাঝে মাঝেই তারা এ ধারের পুরনো পেনাল কলোনি আর যেসব নতুন রিফিউজি সেটলমেন্ট বসছে, সেখানে হানা দেয়। ওরা হয়তো মনে করে আন্দামানের সব জঙ্গলের অধিকার একমাত্র তাদেরই। সেখানে অন্য কেউ এসে থাকুক, একেবারেই তা চায় না। এই সব। অনুপ্রবেশকারীকে তাড়াতেই তাদের অবিরত সশস্ত্র হানাদারি। ওদের গতিবিধির ওপর সর্বক্ষণ নজর রেখে চলেছে বুশ পুলিশ। তির-ধনুক বা অন্য ধরনের অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে যখনই তারা সেটলমেন্টগুলোর দিকে আসতে থাকে, ড্রাম পিটিয়ে, হল্লা করে বুশ পুলিশ সবাইকে সতর্ক করে দেয়। খুব সম্ভব আজ জারোয়াদের গতিবিধি লক্ষ করে তারা ড্রাম বাজিয়ে চলেছে।
ধনপত কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল। এগিয়ে এসে বলল, আগে যা কর দেখুঙ্গা।
বিশ্বজিৎ বললেন, দেখ–
মশাল হাতে দু’জন সঙ্গীকে নিয়ে ধনপত তক্ষুনি উত্তর দিকে জোর জোরে পা চালিয়ে দিল।
নয়া সেটলমেন্টের খানিকটা অংশ বিশাল বিশাল গাছ কেটে, ঝোঁপঝাড় নির্মূল করে বন বিভাগের কর্মীরা সাফ করে রেখেছিল। সে আর কতটুকু এলাকা! তারপর আন্দামানের হাজার বছরের প্রাচীন অরণ্য অপার রহস্য আর ভয়াবহতা নিয়ে আকাশের দিকে মাথা তুলে আছে।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।