কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকে বিনয়। তারপর প্রথম চিঠিটা লেখে প্রসাদ লাহিড়িকে। খুবই সংক্ষিপ্ত চিঠি। সে নিরাপদে আন্দামানে পৌঁছেছে, উদ্বাস্তু পরিবারগুলির সঙ্গে কাল চলে এসেছে জেফ্রি পয়েন্টে; গভীর অরণ্যের মধ্যে এখানেই রিফিউজি সেটলমেন্ট গড়ে উঠবে। দুটো প্রতিবেদন আপাতত সে পাঠাচ্ছে। এরপর দুদিন পর পর পাঠাতে থাকবে। ‘নতুন ভারত’-এর কপি এয়ারমেলে যদি বিশ্বজিৎ রাহার ঠিকানায় পাঠানো হয় সে পেয়ে যাবে। ঠিকানা লিখে দিল: C/o বিশ্বজিৎ রাহা, মেরিন জেটির কাছে। পোর্ট ব্লেয়ার। আন্দামান। প্রণাম জানিয়ে চিঠি শেষ করল বিনয়।
পরের চিঠিটা সে লিখল আনন্দকে। এটাও ছোট চিঠি। নির্বিঘ্নে পৌঁছবার খবর দিয়ে বিনয় জানাল, সে ভালোই আছে। তার জন্য কেউ যেন দুশ্চিন্তা না করে। বাড়ির কে কেমন আছে, ইত্যাদি জানিয়ে আনন্দ যেন মাঝে মাঝে চিঠি লেখে। বিনয়ও লিখবে। বিশ্বজিৎ রাহার ঠিকানা জানিয়ে সেখানেই যোগাযোগ করতে লিখল। তার চিঠিতে ঝুমার নামটা পর্যন্ত নেই।
বিনয় জানে, কলকাতায় আনন্দর কাছে চিঠি পৌঁছানোমাত্র খবর পেয়ে যাবে ঝুমা। তাকে না লিখে তার মামাকে লিখেছে, এতে ভীষণ ভেঙে পড়বে মেয়েটা। কিন্তু কিছু করার নেই বিনয়ের। চকিতের জন্য তার খেয়াল হল, অনন্তকাল সে আন্দামানে পড়ে থাকবে না। একমাস কি দু’মাস পর তাকে কলকাতায় ফিরে যেতেই হবে। তখন কি ঝুমা তার কাছে ছুটে আসবে না? তার ব্যাকুলতার সামনে দাঁড়িয়ে কী জবাব দেবে সে? না–এখন আর সেসব ভাবতে পারছে না বিনয়।
ঝুমার চিন্তাটা মাথা থেকে এক রকম জোর করেই বার করে দিয়ে শেষ চিঠিটা লিখতে শুরু করল বিনয়।
‘প্রিয় ছোটদি,
এখন অনেক রাত। পোর্ট ব্লেয়ার থেকে অনেক দূরে আজ বিকেলে আমরা এমন একটা সৃষ্টিছাড়া জায়গায় এসে পৌঁছেছি, কলকাতায় বসে তুই তা কল্পনাই করতে পারবি না। তিনদিকে গভীর অরণ্য, একদিকে সমুদ্র। এই এলাকাতেই কাল থেকে পূর্ব পাকিস্তানের উপনিবেশ তৈরির কাজ শুরু হবে। মনে হচ্ছে পশ্চিম। আফ্রিকার সুগভীর অরণ্যে ঘেরা আদিকালের এক অজানা, রহস্যময় পৃথিবীতে এসে পড়েছি। যতদূর চোখ যায়, এলাকাটা এত নির্জন, এমনই নিঝুম যে গা ছম ছম করে। এখানে বেশ কিছুদিন আমাকে থাকতে হবে। আমার ধারণা, এমন সব ঘটনা আর অভিজ্ঞতা হবে, আগে আর কখনও তা হয়নি।
সে যাক, তোরা কেমন আছিস? তুই তো সেই ছেলেমানুষ বয়স থেকেই ছিচকাঁদুনে; একটুতেই কেঁদে কেটে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ভাসিয়ে। দিস। আমার জন্য ভেবে ভেবে মোটেও শরীর খারাপ করবি না। তোর ঠাকুরঘরে যে শ’খানেক দেবদেবী রয়েছে তাদের নামে দিব্যি করে বলছি, আমি ভালো আছি। আমার বিপদের কোনও ভয় নেই। যেসব অফিসার এবং পুনর্বাসন দপ্তরের কর্মীরা সেটলমেন্ট গড়ার দায়িত্ব নিয়েছেন তারা সব সময় আমার দিকে লক্ষ রাখছেন। আদরযত্নের লেশমাত্র ত্রুটি নেই।
একজনের জন্য আমি ভীষণ দুর্ভাবনায় আছি। তিনি হেমদাদু। কলকাতায় থাকলে পূর্ব পাকিস্তানের অনেক খবর পাওয়া যায়। কিন্তু বেশ কয়েকদিন ধরে পৃথিবী নামে গ্রহটির সঙ্গে আমার সমস্ত সম্পর্ক যেন ছিঁড়ে গেছে। পূর্ব পাকিস্তানে কী হচ্ছে, সেখানকার হাল আরও খারাপ হয়ে গেছে কি না, কিছুই বুঝতে পারছি না।
বর্ডার থেকে নিত্য দাস এর মধ্যে কি হেমদাদুর চিঠিপত্র দিয়ে গেছে? যদি দাদুর চিঠি আসে, খামে ভরে নিচের ঠিকানায় অবশ্যই পাঠিয়ে দিবি…..
এই পর্যন্ত লেখার পর হঠাৎ ঝিনুকের মুখ চোখের সামনে, ভেসে ওঠে। এই মেয়েটার প্রতি যার অনন্ত সহানুভূতি, সবাই মুখ ফিরিয়ে নিলেও একমাত্র সে-ই তাকে নিজের কাছে টেনে নিয়েছিল। লাঞ্ছনায়, গ্লানিতে, অসম্মানে চিরদুঃখী ঝিনুক যখন নিরুদ্দেশ হয়ে যায়, খুবই কষ্ট পেয়েছিল সুধা।
তার এই ছোটদির কাছে সেই জ্ঞানবুদ্ধি হবার বয়স থেকে কখনও কিছু লুকোয়নি বিনয়। তার জীবনের ভালোমন্দ, সংকট বা আনন্দের মুহূর্তগুলো অকপটে মেলে ধরেছে।
কিন্তু না, ঝিনুকের কথা এখন কিছুতেই লিখতে পারবে না। আপাতত তা গোপনই রাখবে। তার কারণও রয়েছে। ঝিনুকের সঙ্গে তার দেখা হয়েছে মাত্র। কিন্তু কথা বলার সুযোগ পাওয়া যায়নি। সে রয়েছে মধ্য আন্দামানে, আর বিনু দক্ষিণ আন্দামানের জেফ্রি পয়েন্টে। দূরত্ব আর কতটুকু? বড়জোর ষাট কি সত্তর মাইল। সে তো মাইলের হিসেবে। কিন্তু এই দুর্গম দ্বীপপুঞ্জে যাতায়াত এমনই দুরূহ যে এক মাসের মধ্যে সেখানে যাওয়া অসম্ভব। এর থেকে লক্ষ কোটি মাইল দূরের নক্ষত্রলোকে পৌঁছনো অনেক সহজ।
সবার আগে মধ্য আন্দামানে গিয়ে ঝিনুককে খুঁজে বার করতে হবে। নিরুদ্দেশ হবার পর থেকে কতটা দুঃখ, কতখানি ক্লেশ, কতখানি অভিমান মনের গোপন কুঠুরিতে সে জমিয়ে রেখেছে। প্রথমে তা জানতে হবে। সামনাসামনি তাকে দেখে ঝিনুকের কী প্রতিক্রিয়া হতে পারে, ঘৃণায় ক্রোধে তাকে ফিরিয়ে দেবে কি না কিছুই জানা নেই।
বিনয়ের ধারণা, বিনয়ের বিশ্বাস ঝিনুক তাকে ফিরিয়ে দিতে পারবে না। কিন্তু মাঝখানের কয়েক মাসে সে যদি পুরোপুরি বদলে গিয়ে থাকে? যদি সে তাকে ফিরিয়ে দেয়? বুকের ভেতরটা হঠাৎই ভীষণ উতলা হয়ে ওঠে বিনয়ের।
খানিকক্ষণ পর মন কিছুটা শান্ত হলে সে ফের লেখা শুরু করে।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।