ঘাড় গুঁজে একটানা কলম চালিয়েছে। একটু ক্লান্তই লাগছিল বিনয়ের। পিঠটা পেছন দিকে হেলিয়ে জানালার বাইরে তাকাল সে। সন্ধের পর থেকে যেমনটা দেখেছিল তার কোনও হেরফের নেই। ঘোলাটে চাঁদের আলো, কুয়াশা আর অন্ধকারে দক্ষিণ র্তিা কানে আন্দামানের পাহাড় অরণ্য জুড়ে সেই অন্তহীন নিশুতি। কিছুক্ষণ যাচ্ছে না। আগেও সমুদ্রের দিক থেকে জোর হাওয়া দিচ্ছিল। হঠাৎ হাওয়ার তেজ পড়ে গেছে। বঙ্গোপসাগরের লক্ষ কোটি ঢেউ বাতাসের ধাক্কায় পাড়ে এসে বিপুল গর্জনে অবিরল ঝাঁপিয়ে পড়ছিল। এখন সেই আওয়াজ থেমে গেছে। কোনও এক অদৃশ্য ম্যাজিসিয়ান জাদুকাঠি ছুঁইয়ে আচমকা যেন জেফ্রি পয়েন্টের সব শব্দ থামিয়ে দিয়েছে।
এই রাত্রিবেলা আদিম প্রকৃতির নিস্তব্ধ খাঁজের ভেতর বসে থাকতে থাকতে কেমন যেন গা ছম ছম করে।
কয়েক মিনিট বাইরে তাকিয়ে থাকার পর সুটকেস থেকে চিঠির কাগজ খামটাম বার করে নিল বিনয়। আপাতত তিনটে চিঠি লিখতে হবে। একটা ‘নতুন ভারত’-এর চিফ রিপোর্টার প্রসাদ লাহিড়িকে, একটা আনন্দকে, একটা সুধাকে। চকিতে মনে পড়ে গেল, কলকাতা থেকে জাহাজে ওঠার আগে ঝুমা কতবার যে বলেছে আন্দামানে পৌঁছেই বিনয় যেন তাকে চিঠি লেখে। বিনয় নিজেও জানিয়েছিল, লিখবে, নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই লিখবে।
ঝিনুক নিরুদ্দেশ হয়ে যাবার পর তার জীবন জুড়ে যে ধু-ধু শূন্যতা নেমে এসেছিল সেই কটা ধীরে ধীরে ভরিয়ে তুলেছিল ঝুমা। রাজদিয়ায় তাকে নিয়ে দুই কিশোরীর মধ্যে যে মহাযুদ্ধ শুরু হয়েছিল তা কতকাল চলত, কে জানে। কলকাতায় আসার পর যখন তারা পূর্ণ যুবতী তখনও সেই যুদ্ধের অবসান হয়নি।
ঝুমা এক পরমাশ্চর্য মেয়ে। যেন কোনও মায়া কাননের পরি। কী যে তীব্র সম্মোহন তার। এস্রাজে ছড় টানার মতো তার হাসি, তার কণ্ঠস্বরে হালকা ঝংকার, নিটোল ফুলদানির মতো গ্রীবা বাঁকিয়ে আধবোজা চঞ্চল চোখে তাকানো, তার সারা শরীর থেকে উঠে আসা উগ্র সুগন্ধ বিনয়কে আচ্ছন্ন করে ফেলত। শত আলোকবর্ষ দূরের পূর্ব বাংলার ছোট্ট শহর রাজদিয়ায় এক বিজন দুপুরে কিশোরী ঝুমা তাদের বাড়ির চিলেকোঠায় একটি চুম্বনে সেদিনের বিনয়ের স্নায়ুতে ঝড় বইয়ে দিয়েছিল। বিনয়ের হাত ধরে জীবনের অজানা রহস্যের অনেকগুলো দরজা পার করে যৌবনের সীমানায় পৌঁছে দিয়েছে সে। তার কাছে গেলে সারা। শরীর ঝিম ঝিম করত। প্রবল আকর্ষণে সমস্ত শিকড় ছিঁড়ে ঝুমা বিনয়কে ছিনিয়ে নিতে চাইত।
অন্যদিকে ছিল ঝিনুক। চিরদুঃখী মেয়েটার শান্ত করুণ মুখ, বিষাদ মাখানো চোখের তাকানো, তার নিঝুম বসে থাকা, তার সংগোপন যাতনা–সব মিলিয়ে এমন এক শক্তি ছিল যা দিয়ে বিনয়কে নিজের কাছে ধরে রেখেছে। ঝুমা তার সমস্ত মাদকতা দিয়েও তাকে পুরোপুরি কেড়ে নিতে পারেনি।
কিন্তু ঝিনুক নিখোঁজ হওয়ার পর উদ্ভ্রান্তের মতো কলকাতা এবং মহানগরের চারপাশে পঁচিশ-তিরিশ মাইল দূর অবধি ঘুরে ঘুরেও যখন তার সন্ধান পাওয়া গেল না, ভেঙেচুরে একেবারে তছনছ হয়ে গিয়েছিল বিনয়। সেই সময় অফুরান মমতায় পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল ঝুমা। যে মেয়ে পুরুষের রক্তে তুফান তোলে, জাদুকরির মতো আঙুলের ডগায় তুলে তাকে নাচায়, তুড়ি মেরে মেরে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে মাতিয়ে দিতে পারে, এ যেন সেই ঝুমা নয়। কী প্রগাঢ় মায়া এই ঝুমার, কী অনন্ত সহানুভূতি।
ঝিনুক জনারণ্যে হারিয়ে যাওয়ার পর এক সময় বিনয়ের মনে হয়েছিল আকাশ খান খান হয়ে ভেঙে পড়েছে। ঝিনুককে ছাড়া কীভাবে দিন কাটবে ভাবতেও পারছিল না। সে যে কী নিদারুণ ক্লেশ, কী যে অসহ্য দাহ! কিন্তু জীবন তো এক জায়গায় থেমে থাকে না; তার ভাঁজে ভাঁজে কত যে ইন্দ্রজাল লুকনো আছে, আগে তা কি সে জানত? ঝিনুক তার হাড়েমজ্জায় যে দগদগে রক্তাক্ত ক্ষত রেখে গিয়েছিল, ঝুমা তার ওপর স্নিগ্ধ প্রলেপ লাগিয়ে দিয়েছে। তখন পাগল পাগল, অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে সে। তাকে সেখান থেকে তুলে এনে কত যত্নে ঝুমা যে সুস্থ স্বাভাবিক করে তুলেছে। ক্রমশ বিনয়ের মনে হয়েছে স্বেচ্ছায় যে মেয়েটি হারিয়ে গেছে তার জন্য বাকি দীর্ঘ জীবনটা শুধু স্মৃতি, হাহাকার আর দীর্ঘশ্বাস নিয়ে কাটানো যায় না। অনেক দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে শেষ পর্যন্ত নিজেকে ঝুমার হাতে সঁপে দিয়েছে সে।
কিন্তু কে জানত, আন্দামানে ‘রস’ আইল্যান্ডে ঝিনুকের সঙ্গে আবার দেখা হয়ে যাবে? না, তাকে ভোলা যায়নি। বুকের ভেতর যে গোপন ক্ষতটা মনে হয়েছিল নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে ফের সেটা সময়ের স্তর ভেদ করে বেরিয়ে এসেছে। বিনয় টের পেয়েছে, নতুন করে রক্তক্ষরণ শুরু হয়েছে। ঝিনুকের জন্য সেই পুরনো আবেগ আর তীব্র ব্যাকুলতা তাকে উথালপাতাল করে দিয়েছে। আরও একবার সে টের পেয়েছে তার শ্বাসপ্রশ্বাসে মেয়েটা জড়িয়ে আছে। আমৃত্যু জড়িয়েই থাকবে।
ঝিনুককে দেখার পর ঝুমা বহু-বহু দূরে বিলীন হয়ে গিয়েছিল। এ এক আশ্চর্য খেলা। যতদিন ঝিনুককে পাওয়া যায়নি, সেই শূন্য স্থানে চলে এসেছিল ঝুমা। কিন্তু এখন? বিনয়ের অজান্তে কেউ যেন তাকে নিঃশব্দে ঠেলে সরিয়ে দিয়েছে।
এরপর ঝুমাকে চিঠি লেখা কি ঠিক হবে? বিনয় মনস্থির করে ফেলল লিখবে না। লেখাটা মহা অন্যায়। এক ধরনের পাপই হবে। সে যেন নিয়তিতাড়িত এক মানুষ। ঝিনুকই তার নিয়তি। তাকে বাদ দিয়ে অন্য কোনও নারীর কথা এই মুহূর্তে সে ভাবতে পারছে না। ঝুমা খুবই কষ্ট পাবে, ভেঙেও পড়বে কিন্তু সম্পর্কটা খুব সম্ভব রাখা যাবে না। ঝুমাকে সে কি ভালোবাসেনি? বেসেছে। দুঃখের দিনে সংকটের সময় সে যখন চুরমার হয়ে যাচ্ছিল, ঝুমা পাশে থেকে তাকে ধসে পড়তে দেয়নি। অবিরল শুশ্রূষায় সব কষ্ট ভুলিয়ে দিতে চেয়েছে। এটা তো ঠিক মনপ্রাণ ঢেলে মেয়েটা তাকে ভালোবেসেছে। কিন্তু যে ’রস’ আইল্যান্ডে ঝিনুককে দেখার পর বিনয়ের মনে হয়েছে জীবনের প্রথম নারীটি তার বত্রিশ নাড়ি ধরে টান দিয়েছে। ঝিনুকের সঙ্গে কাল একটি কথাও হয়নি। চলুঙ্গা জাহাজের আপার ডেকে দাঁড়িয়ে ছিল সে। জাহাজটা সুরে, আরও দূরে, ধীরে ধীরে ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেছে। তারপর অন্য একটা দ্বীপের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে যায়। সেই যে দেখা হয়েছিল তারপর থেকে ঝিনুক ঝুমার কাছ থেকে প্রবল টানে উপড়ে নিয়ে গেছে তাকে।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।