উদ্বাস্তুরা যেখানে বসে খাচ্ছি সেখান থেকে নিরঞ্জনের গলা ভেসে আসে। কখন যে সে ওদের কাছে চলে গিয়েছিল, টের পাওয়া যায়নি।
নিরঞ্জন গলার স্বর উঁচুতে তুলে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলে যাচ্ছিল, ‘ভাই সগল, পোর্ট ব্লেয়ার থিকা এতখানি পথ আইতে আপনেগো শরীলের উপুর দিয়া অনেকখানি তাফাল গ্যাছে। আইজ তরাতরি খাওনদাওন সাইরা গিয়া শুইয়া পড়েন। কাইল সকাল সকাল উইঠা পড়বেন। কাইল থিকাই আপনেগো জমিন দেওয়া হইব।’
খানিক দূরে দাঁড়িয়ে খিচুড়ি দিয়ে নৈশভোজ সারতে সারতে রীতিমতো অবাকই হয়ে গেল বিনয়। বিশ্বজিতের দিকে ফিরে বলল, ‘এখানে সব দিকেই তো ঘোর জঙ্গল। বড় বড় কটা গাছ কাটা হয়েছে শুধু। এই জঙ্গলে জমি কোথায়? কী করে তা দেওয়া হবে? কে কতটা এলাকা পাচ্ছে তা-ই বা ঠিক হবে কীভাবে?’
বিশ্বজিৎ হাসলেন।–’কালই সব দেখতে পাবেন।’
খাওয়া হয়ে গেলে আঁচিয়ে, জল খেয়ে বিনয়কে নিয়ে বিশ্বজিৎ তাঁর ঘরে চলে গেলেন।
(প্রথম পর্ব সমাপ্ত)
২.০১ জেফ্রির পয়েন্টে অন্ধকার
পোর্ট ব্লেয়ার থেকে পঞ্চাশ মাইল দূরের এই জেফ্রির পয়েন্টে অন্ধকার নেমে গিয়েছিল অনেকক্ষণ আগেই। সেই সঙ্গে নেমেছে গাঢ় কুয়াশা। এখন শুক্লপক্ষ। আকাশে পূর্ণ চাঁদের মায়াবী আলো। অন্ধকার আর কুয়াশার স্তরগুলো ভেদ করে চুঁইয়ে চুঁইয়ে সেই আলো এসে পড়েছে দক্ষিণ আন্দামানের এই সৃষ্টিছাড়া ভূখণ্ডে।
তিনদিকে উঁচু উঁচু পাহাড়ের মাথায় হাজার বছরের আদিম অরণ্য, অন্যদিকে যতদূর চোখ যায় ধু-ধু দিগন্ত অবধি সমুদ্র–অফুরান বঙ্গোপসাগর। অন্ধকার আর কুয়াশা মাখানো জ্যোৎস্না চারপাশের চরাচরকে অপার কোনও রহস্যে যেন মুড়ে রেখেছে। সমুদ্রকে ঝাঁকি দিতে দিতে উঠে আসছে জোরালো হাওয়া। তুমুল ঢেউ এসে ভেঙে পড়ছে সোনালি বালির বিচে। একটানা আওয়াজ শোনা যাচ্ছে শাঁই শাঁই। সমুদ্রের দিকটা ছাড়া বাকি সব কিছু একেবারে নিঝুম। অনন্ত নৈঃশব্দ্য বনভূমি, পাহাড় আর উপত্যকা পাষাণভারের মতো চেপে বসেছে।
এখানে নতুন উপনিবেশের পত্তন হবে। গড়ে উঠবে বাংলার ছিন্নমূল মানুষদের নতুন বাসভূমি। কয়েক ঘণ্টা আগে সেই বিকেল বেলায় দেড়শো উদ্বাস্তু পরিবারের শ’ পাঁচেক প্রথম দলটা এসে গেছে। সাড়ে চারদিন জাহাজে আর এ পোর্ট ব্লেয়ারে কাটিয়ে লরিতে চেপে চড়াই-উতরাই ভেঙে ঝাঁকানি খেতে খেতে যখন তারা পৌঁছল হাড়মজ্জা প্রায় ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। সন্ধে নামতে না নামতেই তাদের খাইয়ে ব্যারাকের মতো লম্বা ঘরগুলোতে শুতে পাঠিয়ে দিয়েছিল বিভাসরা। এখন তারা গভীর ঘুমের আরকে ডুবে আছে।
কিছুক্ষণ আগেও পূনর্বাসন দপ্তরের কর্মীদের কথাবার্তা ভেসে আসছিল। তাদেরও আর সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। সারাদিন হইহই করে খাটাখাটুনির পর ওরাও অপার ক্লান্তিতে বিছানায় শরীর ঢেলে দিয়েছে।
বিশ্বজিৎ রাহার মাঝারি ধরনের ঘরটিতে টেবলের ওপর ঝুঁকে লিখে চলেছে বিনয়। টেবলের এক কোণে একটা ঝকঝকে কাচের বড় লণ্ঠন জ্বলছে আরও একটা লণ্ঠনও রয়েছে। সেটা ঝুলছে সিলিং থেকে। দুই লণ্ঠনের উজ্জ্বল আলোয় ঘর ভরে গেছে।
এই ঘরের দুটো তক্তপোশে পুনর্বাসন দপ্তরের একজন কর্মী বিছানা পেতে মশারি টাঙিয়ে দিয়ে গিয়েছিল। একটা বিছানায় মশারির ভেতর শুয়ে শুয়ে ক্রাইম স্টোরি পড়ছেন বিশ্বজিৎ। তিনি ডিটেকটিভ গল্পের পোকা। অন্য বিছানাটা ফাঁকা। লেখা শেষ হলে বিনয়ও সেখানে শুয়ে পড়বে।
ঘরের চার কোনায় চারটে পেতলের সরায় মশা-মারার তেজি ধূপ পুড়ছে। এই বিজন অরণ্যে লক্ষ কোটি মশা আর বাড়িয়া পোকা দিবারাত্রি ঝাঁক বেঁধে টহল দিয়ে বেড়ায়। রাত্তিরে তাদের উদ্যমটা শতগুণ বেড়ে যায়। তারা টের পেয়েছে জেফ্রি পয়েন্টে নতুন মানুষ এসেছে। মানুষ মানেই তো টাটকা সুস্বাদু রক্ত।
বিনয়ের টেবলের সামনের বড় জানালাটা খোলা। ওরা ঘরে এসে ঢুকতেই বাড়িয়া পোকা আর মশাদের দঙ্গলগুলো ঢুকে আসছিল কিন্তু ধূপের উগ্র ঝাঁঝে ফিরে ফিরে যাচ্ছে। কিন্তু যাদের এনার্জি বেশি, ভেতরে এসে হাত-পা-শুঁড়-ডানা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে দমবন্ধ হয়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে। ঘরের এধারে ওধারে মরা পোকা আর মশাদের ডাঁই।
পরশু দুপুরে বিশ্বজিৎ পোর্ট ব্লেয়ারে ফিরে যাবেন। তার হাতে ‘নতুন ভারত’-এর জন্য অন্তত দুটো প্রতিবেদন তৈরি করে দিতেই হবে। আজ রাত্তিরে একটা লেখা শেষ না করলেই নয়। সেই সঙ্গে লিখতে হবে তিনটে চিঠি! বাকি প্রতিবেদনটা কাল এক ফাঁকে লিখে ফেলবে। বিশ্বজিৎ সেগুলো পোর্ট ব্লেয়ার থেকে প্লেনে কলকাতায় পাঠিয়ে দেবেন।
এক সময় প্রথম রিপোর্টটা শেষ হল। খিদিরপুর ডক থেকে হাজারখানেক উদ্বাস্তুকে নিয়ে এস এস ‘মহারাজা’ জাহাজে রওনা হওয়ার পর থেকে পোর্ট ব্লেয়ারে পৌঁছনো পর্যন্ত অনুপুঙ্খ বিবরণ গুছিয়ে লিখেছে বিনয়। দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রায় আতঙ্কে উদ্বাস্তুদের দিশেহারা হয়ে যাওয়া, তাদের মৃত্যুভয়, তাদের বুঝিয়েসুঝিয়ে ভরসা দিয়ে শান্ত করা, উত্তাল সমুদ্রে ভয়াবহ সাইক্লোনের মুখে পড়া–কোনও তে দিতে কিছুই বাদ যায়নি।
লেখাটা বেশ বড়ই হল। পুরো এগারো পাতা। আগাগোড়া সেটা পড়ে দু-চারটে শব্দ পালটে, তিন-চারটে প্যারা কেটে নতুন করে লিখল বিনয়। মনে হল রিপোর্টটা ভালোই দাঁড়িয়েছে। আন্দামানের প্রথম প্রতিবেদনটা যে ‘নতুন ভারত’-এর পাঠকদের উৎসুক করে তুলবে তা নিয়ে বিনয়ের সংশয় নেই। ভেতরে ভেতরে তৃপ্তিই বোধ করল সে। একটা লাগসই হেডিং দিতে হবে। খানিকক্ষণ ভেবে প্রথম পাতার মাথায় বড় বড় অক্ষরে লিখে ফেলল ‘উত্তাল কালাপানি পেরিয়ে উদ্বাস্তুদের আন্দামান যাত্রা’। তারপর কাগজগুলো গুছিয়ে পিন দিয়ে গেঁথে টেবলের এক পাশে রাখল।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।