ওরা চলে যাবার পর বিশ্বজিৎ আর বিনয় ভালো করে হাত-পা মুখ ধুয়ে নিল। সারাদিন পাহাড়ি রাস্তায় গাড়িতে এসেছে তারা। ধুলোয় ঘামে জামাকাপড় চটচট করছিল। সেসব বদলে পাজামা-শার্ট পরে নিল।
সেটলমেন্টে ফিরতে ফিরতে হঠাৎ কাজের কথাটা মনে পড়ে গেল বিনয়ের। বলল, ‘আমি তো আপাতত এই জঙ্গলে থেকে যাব। আমাদের কাগজে আন্দামানের রিপোর্ট পাঠাব কী করে?’ এই প্রশ্নটা কি আগেও একবার বিশ্বজিৎকে করেছিল সে? ঠিক মনে পড়ল না।
বিশ্বজিৎ বললেন, ‘আমি তো কালকের দিনটা এখানে আছি। এর মধ্যে দুটো রিপোর্ট লিখে ফেলুন। আমি পরশু পোর্টব্লেয়ার গিয়ে এয়ার মেলে আপনাদের কাগজে পাঠিয়ে দেব।’
‘এবারটা না হয় পাঠানো গেল। তারপর?’
বিশ্বজিৎ জানালেন, পোর্টব্লেয়ার থেকে দু-তিন দিন পর পর। রিহ্যাবিলিটেশন ডিপার্টমেন্টের গাড়ি নানা জিনিসপত্র নিয়ে এই অঞ্চলের সেটলমেন্টগুলোতে আসে। ড্রাইভারকে তিনি বলে দেবেন বিনয়ের কাছ থেকে লেখা নিয়ে তাঁর কাছে পৌঁছে দিতে। বিশ্বজিৎ রিপোর্টগুলো পাওয়ামাত্র কলকাতায় পাঠিয়ে দেবেন।
রোদের তেজ আর নেই। দিনের শেষ আলোটুকু ফিকে হতে হতে দ্রুত নিভে যাচ্ছে। পাহাড় আর বিশাল বিশাল মহাবৃক্ষের হায়া দীর্ঘ হয়ে চরাচর ঢেকে দিচ্ছে। একটু পরেই বঙ্গোপসাগরের এই দ্বীপে ঝপ করে সন্ধে নেমে যাবে।
সেটলমেন্টে এসে দেখা গেল, এর মধ্যে অগুনতি হ্যাঁজাক আর গ্যাসবাতি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। জ্বলছে বেশ কিছু হ্যারিকেনও। জোরালো আলোয় ভরে গেছে চারিদিক।
লম্বা লম্বা ব্যারাক ধরনের বাড়িগুলোর সামনের দিকের অনেকখানি জায়গায় জঙ্গল তো নির্মূল করা হয়েছিলই, নিচের ঘাস চেঁছে পরিষ্কার করে মাটিও বার করা হয়েছে। সেখানে লম্বা করে দুই সারিতে এমনভাবে চট বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে যাতে পাশাপাশি অনেকে বসতে পারে।
ব্যারাকগুলোর একধারে বিরাট বিরাট টিনের ড্রাম আর উঁই করা অ্যালুমিনিয়ামের থালা আর গেলাস। সেখানে নিরঞ্জন আর বিভাস তো রয়েছেই, তাছাড়া পুনর্বাসন বিভাগের অন্য কর্মীদেরও দেখা যাচ্ছে।
নিরঞ্জনরা দারুণ করিৎকর্মা। সমুদ্র থেকে চান করে আসার পর উদ্বাস্তুদের লাইন দিয়ে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে তারা।
নিরঞ্জনের হাতে লম্বা তালিকা। সেটা দেখে হেঁকে হেঁকে উদ্বাস্তুদের নাম পড়ছিল। –’চন্দ্র সূত্রধর, হরিমতি সূত্রধর–সরকার থিকা আপনেগো হগলেরে থাল গেলাস দেওন হইতে আছে। একে একে লইতে থাকেন–’ নিরঞ্জন কখনও উদ্বাস্তুদের ‘তুমি’ করে বলে, কখনও ‘আপনি’। নিরঞ্জনের পাশেই বিভাস এবং আরও দু’জন কর্মী দাঁড়িয়ে আছে। তারপর টিনের ড্রামগুলোর কাছে আরও কয়েকজন কর্মী। তাদের হাতে মস্ত মস্ত পেতলের হাতা।
বিভাসরা থালা-গেলাস দিয়ে ভ্রামগুলোর দিকে উদ্বাস্তুদের পাঠিয়ে দিচ্ছে। ড্রাম বোঝই রয়েছে খিচুড়ি চালডালের সঙ্গে আলু কুমড়ো পটল এবং অন্যান্য সবজি সেদ্ধ করা হয়েছে। আলাদা করে তরকারি বা ভাজাটাজা করার সময় হয়তো পাওয়া যায়নি।
পুনর্বাসন বিভাগের একজন কর্মী হাতায় করে উদ্বাস্তুদের থালায় খিচুড়ি এবং অন্যজন আর একটা ড্রাম থেকে মগে করে গেলাসে গেলাসে খাওয়ার জল দিচ্ছে।
পরিতোষ একধারে দাঁড়িয়ে তদারক করছিল। সে খানিক দূরে বিছানো চটের আসনের দিকে আঙুল বাড়িয়ে উদ্বাস্তুদের বলছিল, ‘আপনেরা ওইখানে গিয়া বইসা বইসা খান। আইজ খিচোড়ি দেওয়া হইল। কাইল থিকা ভাত মাছ ডাইল দুধ পাইবেন। যান—’
বিনয়কে সঙ্গে করে বিশ্বজিৎ পরিতোষদের কাছে চলে এসেছিলেন। তাদের দিকে নজর পড়তেই ব্যস্ত হয়ে ওঠে পরিতোষ। ক’পা এগিয়ে এসে জিগ্যেস করে, ‘স্যার, আপনেরা কি অখন খাইবেন?’
বিশ্বজিৎ একটু হাসলেন। –‘কখন সেই সকালবেলা ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়েছি। সন্ধে হতে চলল। এর ভেতর পেটে কিছু পড়েনি। পেটে হুতাশন জ্বলছে হে–’
রিফিউজিদের জন্য অ্যালুমিনিয়ামের নতুন নতুন থালা গেলাস ছাড়াও রয়েছে বেশ কিছু শালপাতার থালা আর মাটির গেলাস। পরিতোষ নিজের হাতে শালপাতার থালায় খিচুড়ি নিয়ে এল বিশ্বজিৎদের জন্য। বলল, ‘আপনেরা খাইতে থাকেন স্যার। খাওন হইলে জল নিয়ে আসুম–’
বিশ্বজিৎ আন্দামানে উদ্বাস্তু পুনর্বাসন দপ্তরের প্রায় সর্বেসর্বা; বিপুল ক্ষমতাবান। কিন্তু তার জন্য আলাদা করে পোলাও কালিয়ার ব্যবস্থা করা হয়নি। নিশ্চয়ই আগে থেকে হুকুমনামা জারি করা আছে, যত বড় অফিসারই হোন, রিফিউজি সেটলমেন্টে এলে উদ্বাস্তুরা যা খাবে তাদেরও তা-ই খেতে হবে।
বিশ্বজিৎ বললেন, ‘আমাদের জন্যে উতলা হতে হবে না। খিচুড়ি নিয়ে আসা তোমার উচিত হয়নি। যখন দরকার হবে, আমরাই জল চেয়ে নেব। তুমি ওধারে যাও। দেখ, কার কী লাগবে, পেট ভরে ওরা খাচ্ছে কি না।’
পরিতোষ চলে গেল।
ওধারে খিচুড়ি বিতরণ হয়ে গিয়েছিল। উদ্বাস্তুরা কাতার দিয়ে চটের আসনে বসে খাচ্ছে।
সন্ধে নেমে গেছে। কিছুক্ষণ আগেও যে অন্ধকার ফিকে ফিকে জোলো কালির মতো মনে হচ্ছিল, এখন তা অনেক গাঢ় হয়েছে। দক্ষিণ দিকের সমুদ্র আর দেখা যাচ্ছে না। বাকি তিন পাশের উঁচু উঁচু পাহাড় আর জঙ্গল প্রাগৈতিহাসিক অতিকায় জন্তুর মতো এত পেতে আহে। সেদিকে তাকালে বুকের ভেতর কেমন যেন শিহরন খেলে যায়। বিনয়ের মনে হয় পৃথিবীর বাইরে সৌরলোকের কোনও সৃষ্টিছাড়া গ্রহে এসে পড়েছে।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।