‘সেইসব জায়গায় তো আপনাকে যেতে হয়—’
‘তা তো হয়ই। এতগুলো মানুষ সর্বস্ব হারিয়ে আমাদের ভরসায় এত দুরের আইল্যান্ডে এসেছে। তারা কী অবস্থায় রয়েছে, তাদের কোনও অসুবিধা হচ্ছে কি না, কোনও গ্রিভান্স আছে কি না, সেসব দেখতে হবে না?’
বিশ্বজিৎকে যত দেখছে, তার কথা যত গুনছে, ততই শ্রদ্ধা বেড়ে যাচ্ছে। বিনয় জিগ্যেস করল, ‘ওই সেটলমেন্টগুলোতে নিশ্চয়ই এখানকার মতো জামাকাপড় রাখা আছে?’
বিশ্বজিৎ হেসে ফেলেন। ‘–তা তো আছেই।‘
বিভাস আর নিরঞ্জন এর মধ্যে উদ্বাস্তুদের সমুদ্রের দিকে নিয়ে গেছে। ওদর দেখতে পাচ্ছিল বিনয়রা।
পরিতোষ কাছাকাছি কোথাও ছিল। সে দৌড়ে আসে। ব্যগ্রভাবে বলল, ‘স্যার, আপনেরা কষ্ট কইরা সমুদ্রে যাইয়েন না। ঘরে যান। আমি জল পাঠাইয়া দিতে আছি।’
খুব ঠান্ডা গলায় বিশ্বজিৎ বললেন, ‘আমাদের আরামের জন্যে ভাবতে হবে না। এই সেটলমেন্ট যাদের জন্যে তাদের কথা ভাবো।’
ম্লান মুখে দাঁড়িয়ে থাকে পরিতোষ। আর কিছু বলতে সাহস হয় না তার।
বিশ্বজিৎ বিনয়কে নিয়ে এগিয়ে চললেন।
সেটলমেন্টের এদিকটা অন্য তিনদিকের মতো ঘন জঙ্গলে ঢাকা। লম্বালম্বি তার খানিকটা সাফ করে সমুদ্রে যাবার পথ করে নেওয়া হয়েছে। তবে পথের দু’পাশে এখনও চাপ-বাঁধা ঘন ঝোঁপ, নানা ধরনের অজস্র বুনো গাছ এবং জলডেঙ্গুয়া অর্থাৎ বনতুলসীর উদ্দাম ঝাড়।
সমুদ্রের ধারে এসে দেখা গেল দু-আড়াইশো ফিটের মতো চওড়া সোনালি বালির বিচ; ডাইনে এবং বাঁয়ে বহুদূর অবধি শরীর এলিয়ে পড়ে আছে। বেলাভূমির মাথায় মাইলের পর মাইল জুড়ে ঝাড়ালো ম্যানগ্রোভের জটলা। আর কত যে নারকেল গাছ তার লেখাজোখা নেই। আকাশের দিকে মাথা তুলে তারা লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আন্দামানের তটরেখা পাহারা দিয়ে চলেছে।
বিচের পর থেকে সমুদ্র। পাড়ের দিকে সিকি মাইল অবধি কাঁচের মতো টলটলে জল। খুব বেশি হলে কোমর সমান। জল এতটাই স্বচ্ছ যে নিচের বালুকণা, পাথর, নুড়ি, নানা রঙের ঝিনুক, সামুদ্রিক শ্যাওলা আর আগাছা স্পষ্ট দেখা যায়।
সিকি মাইল পর থেকে জলের রং ক্রমশ পালটে গেছে। প্রথমে হালকা সবুজ, তারপর গাঢ় সবুজ, নীল এবং আরও দূরে ঘন কালো হয়ে অন্তহীন সমুদ্র দিগন্ত অবধি চলে গেছে।
উদ্বাস্তুরা জলে নেমে পড়েছিল। কলকাতা থেকে আসার সময় চার পাঁচ দিন ‘মহারাজা’ জাহাজে তোলা জলে তারা চান করেছিল। এই প্রথম অফুরান সমুদ্র পেয়েছে। পদ্মা-মেঘনা-কালাবদর ধলেশ্বরীর দেশের মানুষ, এত জল পেয়ে সবাই ডগমগ। বুড়োবুড়ি যুবক যুবতী– কেউ সাঁতরাচ্ছে, কেউ এক জায়গায় দাঁড়িয়ে ডুবের পর ডুব দিয়ে চলেছে। ছোট বাচ্চাগুলো খলবল করে জল ছিটচ্ছে।
সমুদ্র রং বদলে যেখানে সবুজ হতে শুরু করেছে সেদিক থেকে লক্ষ কোটি মাছ ঝাঁকে ঝাঁকে ছুটে আসছে তীরের দিকে। কত রকমের যে মাছ–সুরমাই, লান্স ভেটকি, সার্ডিন, শাকুস, পমফ্রেট ছাড়াও নাম-না-জানা আরও অসংখ্য। এছাড়া উড়ুক্কু মাছেরা তো রয়েছেই। তারা সমুদ্র ফুঁড়ে উঠে আসছে; আধখানা বৃত্তের আকারে শূন্যে চক্কর দিয়ে ফের জলে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। এই ওড়াউড়ি চলছে অবিরাম।
জল পেয়ে উদ্বাস্তুরা খুশি তো হয়েছেই। মাছ দেখে একেবারে আত্মহারা। খিদিরপুর ডকে জাহাজে ওঠার সময় তারা ত্রাসে সংশয়ে একেবারে কুঁকড়ে ছিল। এই প্রথম তাদের উচ্ছ্বসিত হতে দেখা গেল। চোখেমুখে তাদের প্রবল উত্তেজনা। নিজেদের মধ্যে ওরা বলাবলি করছিল।
‘বাইসুত রে, সমুন্দুরে কত মাছ দেখছনি? মনে লয় দশহান পদ্ম, দশহান ম্যাঘনা ছেইচা (ছঁচে) ফালাইলেও এত মাছ মিলব না।’
‘সারা জনম খাইয়াও শ্যাষ করন যাইব না।’
‘সারা জনম কী কও, চৈদ্দে পুরুষ খাইলেও ফুরাইব না।’
‘হ, সাচাই কইছ।’
‘কেম্প (ক্যাম্প) থিকা যহন আমাগো খিদিরপুরে লইয়া আইল, ডরে হাত-পাও প্যান্টের ভিতরে হাইন্দা (ঢুকে) গ্যাছিল। অহন মনে লয় (হয়) আন্দায়মানে না খাইয়া মরুম না। আর কিছু না জুটুক, সমুদুরে মাছ তো আছে, হেই খাইয়া বাইচা থাকুম।’
পাড়ে দাঁড়িয়ে বিভাস, নিরঞ্জন আর পুনর্বাসন বিভাগের ক’জন কর্মী উদ্বাস্তুদের ওপর সতর্ক নজর রাখছিল। নিরঞ্জন গলার স্বর উঁচুতে তুলে সমানে বলে যাচ্ছে, ‘কেও বেশিদুর যাইবা না। সমুন্দুরের কিনারে ছান (চান) কর। হাঙ্গরের চোখে পড়লে রক্ষা নাই। সাবধান, সাবধান—’
রাঁচির লোকটিও একটানা চেঁচিয়ে যাচ্ছে, বদমাশ মচ্ছি (হাঙর) হোত খতরনাক। হোশিয়ার—’ তারা অনবরত বলে যাচ্ছে, খানিক দূরে সমুদ্রের জল যেখানে সবুজ হতে শুরু করেছে তার ওধারে হাঙরেরা ঝাঁকে ঝুঁকে ঘুরে বেড়ায়। যে কোনও মুহূর্তে তারা বিদ্যুৎগতিতে পাড়ের দিকে হানা দিতে পারে। সামুদ্রিক এই দানবেরা মানুষ পেলে ধারালো দাঁতে ছিন্নভিন্ন করে ফেলবে।
এত হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও উদ্বাস্তুরা কি সহজে সমুদ্র ছেড়ে উঠতে চায়? দুরে গেল না বটে, কিনারার কাছে জল নিয়ে মাতামাতি করতে লাগল।
শেষ পর্যন্ত ধমকধামক দিয়ে নিরঞ্জনরা তাদের তুলে ফেলল।–’আমাগো কথা কানে তোলো না। হাঙ্গরের প্যাটে কেও গালে তহন দোষ অইব সরকারের। দুনিয়াসুদ্ধা মানুষ জানবো, হাঙ্গর দিয়া খাওয়ানের লেইগা আমরা রিফিউজিগো আন্দামানে লইয়া আইছি।’
উদ্বাস্তুরা সাড়াশব্দ করে না। অপরাধী অপরাধী মুখ করে নিরঞ্জনদের সঙ্গে সেটলমেন্টে ফিরে গেল।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।