বিনয় অবাক। বলল, ‘দেশ তো গেছে। কোথায় আর ফিরবেন? ফিরলে তো কলকাতার সেই ক্যাম্পেই যেতে হবে। কিন্তু ক্যাম্প কি কঁকা পড়ে আছে? এত দিনে অন্য রিফিউজি এনে নিশ্চয়ই সেখানে তোলা হয়েছে। একটু থেমে বলল, ক্যাম্পে কী সুখে ছিলেন, একবার ভেবে দেখুন।‘
মুখের কথা শুনে আন্দামানে এসেছে হলধর। কিন্তু স্বচক্ষে যখন দেখল বিজন, গহন অরণ্যে বাকি জীবন কাটাতে হবে, এটা ভেবে ভীষণ উতলা হয়ে উঠেছে। সে চুপ করে থাকে। হয়তো খেয়াল হয়, এই দ্বীপ ছাড়া বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অন্য কোথাও তাদের জন্য ছ’আঙুল জমি পড়ে নেই। অনেকক্ষণ পর দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বিমর্ষ মুখে বলে, ‘হ, কই আর যামু! যাওনের জাগা নাই।’
বিনয় বুঝিয়ে বলে, ‘দুঃখ করবেন না। এখন থেকে এটাই আপনাদের দেশ। এখানেই জমি পাবেন, টাকা-পয়সা পাবেন, ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার জন্যে স্কুল বসবে। আস্তে আস্তে দেখবেন, সব কষ্ট ঘুচে গেছে।‘
বিভাস ওধার থেকে রিফিউজিদের তাড়া লাগাচ্ছিল, ‘যার যার মাল লইয়া ব্যারাকে রাখেন। হের পর সমুদ্র থিকা হাত-পা ও ধুইয়া আসেন। অহনই খাওনেরটা (খাবার) দেওয়া অইব।
বিনয় হলধরদের বলল, ‘যান যান, চলে যান।‘
১.৬ বিশাল চারটে ব্যারাক
বিশাল চারটে ব্যারাক ছাড়াও পাঁচ-ছ’টা বড় কাঠের বাড়িও তোলা হয়েছে। যতদিন না শরণার্থীরা নিজেদের ঘরবাড়ি তৈরি করে নিতে পারছে, ব্যারাকেই তাদের থাকতে হবে। ব্যারাকের ভেতর দেওয়াল তুলে আলাদা আলাদা কুঠুরিতে ভাগ করা হয়নি। টানা পাটাতন পেতে দেওয়া হয়েছে।
দুটো ব্যারাকে থাকবে পুরুষেরা, বাকি দু’টোয় মেয়েমানুষ আর বাচ্চাকাচ্চারা। বাকি যে পাঁচ ছটা ঘর তোলা হয়েছে তার দুটো হল গুদাম, সেখানে সেটলমেন্টের নানা মালপত্র রাখার ব্যবস্থা। দুটো ঘর পুনর্বাসন বিভাগের কর্মীদের জন্য, একটা ঘর কলোনাইজেশন আসিষ্টান্টের, বাকি ঘর দুটোয় পোর্টব্লেয়ার থেকে যে অফিসাররা দু’চার দিনের জন্য সেটলমেন্টের কাজকর্ম দেখতে আসেন তারা থাকেন। বিশেষ করে বিশ্বজিৎ রাহা।
চান করা, কাপড় কাঁচা, বাসন মাজা ইত্যাদির মোটা কাজের জন্য সমুদ্র হাতের কাছেই রয়েছে। কিন্তু নোনা জল তো আর খাওয়া যায় না। সে জন্য কাছাকাছি একটা ঝরনা রয়েছে, অবিরল সেটা জল ঢেলে চলেছে। ঝরনাটা যেখানে, তার পাশের পাহাড়ের মাথায় নৌকোর আকারে মস্ত একটা খোল বা গহুর। সারা বর্ষার জল সেখানে জমে থাকে। দরকারমতো সেখান থেকেও লম্বা লম্বা পাইপ দিয়ে জল আনা যেতে পারে।
.
বিশ্বজিৎ এই সেটলমেন্টে এলে যে ঘরটায় থাকেন বিনয়কে নিয়ে সেখানে চলে এলেন। জিপের ড্রাইভার নাসিম এর মধ্যে। বিনয়ের সুটকেস বিছানা-টিছানা রেখে গেছে।
ঘরটার দুই দেওয়াল ঘেঁষে দু’খানা তক্তপোশ পাতা রয়েছে। আর আছে কাঠের আলমারি। দেওয়ালে টাঙানো আয়না। একটা তাকে সাবান, নারকেল তেলের কৌটো ইত্যাদি টুকিটাকি জিনিস।
বিশ্বজিৎ বললেন, ‘এই ঘরেই আপনি আমার সঙ্গে থাকবেন। পরশু অবশ্য আমি পোর্টব্লেয়ার চলে যাচ্ছি। তারপরও যতদিন ইচ্ছে এখানে থেকে সেটলমেন্টের কাজ দেখবেন। সারাদিন জানি করে জামা-প্যান্টের হাল খারাপ হয়ে গেছে। ঘামে সারা গা চটচট করছে। সুটকেস খুলে তোয়ালে-টোয়ালে বার করে সমুদ্রে গিয়ে চানটা সেরে আসি। পরিতোষরা রিফিউজিদের নিয়ে ব্যস্ত। আজ কিন্তু চানের জন্যে গরম জলের ব্যবস্থা করা যাবে না। কাল থেকে সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে।’
বিনয় পোর্টব্লেয়ারে বিশ্বজিতের বাংলোয় আপত্তি করেনি। সেখানে অনেক কাজের লোক রয়েছে। কিন্তু এখানে উদ্বাস্তুরাই আসল। তার স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য পুনর্বাসন দপ্তরের কর্মীদের ব্যস্ত করে তোলাটা অস্বস্তিকর। বলল, ‘কী দরকার? সবাই যখন সমুদ্রে গিয়ে চান করবে, আমার জন্যে স্পেশাল অ্যারেঞ্জমেন্টের দরকার নেই। সেটা খারাপ দেখাবে।‘
বিনয় যে বাড়তি কোনও সুবিধা নিতে চায় না সেটা বুঝে আর কিছু বললেন না বিশ্বজিৎ। একটু হেসে আলমারি খুলে ফেললেন। ভেতরে বেশ ক’টা তাকে কয়েক প্রস্থ পোশাক, তোয়ালে রয়েছে।
বিনয়ের মনে পড়ল সকালে তারা যখন পোটচেয়ার থেকে বেরিয়েছিল, সঙ্গে কিছুই নেননি বিশ্বজিৎ। একেবারে খালি হাত-পা। দু’দিন তিনি জঙ্গলে কাটাবেন। পরনের জামা-প্যান্ট তো ঘামে, পথের ধুলোয় নোংরা, চটকানো-মটকানো হয়ে যাবে। সেই পোশাকে কি দুটো দিন কাটানো যায়? উদ্বাস্তুদের কোথায় নিয়ে যাওয়া হবে, জঙ্গলের কোন অভ্যন্তরে, সে ব্যাপারে বিনয়ের কৌতূহল তখন এত প্রবল, উত্তেজনা এমন তীব্র যে অন্য কোনও দিকে তার লক্ষ ছিল না। এখন দেখা যাচ্ছে, জঙ্গলে কাটানোর মতো সমস্ত কিছুই এখানে মজুত করে রেখেছেন বিশ্বজিৎ
দু’জনেই ঘরে পরার মতো পাজামা-শার্ট আর পাতলা চটি-টটি বার করে বেরিয়ে পড়ল।
হঠাৎ কিছু খেয়াল হতে বিনয় বলে, ‘একটা কথা খুব জানতে ইচ্ছে করছে।’
চলতে চলতে বিশ্বজিৎ বললেন, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। বলুন–’
‘আন্দামানে রিফিউজিদের তো আরও সেটলমেন্ট হয়েছে।’
‘হ্যাঁ, তিনটে।’ বিশ্বজিৎ বলতে লাগলেন, আজ যারা এল। তাদের আগে আড়াই হাজারের মতো মানুষ এসেছে। ওদের জমি-টমি দিয়ে বসানো হচ্ছে।’
বিনয় জিগ্যেস করে, ‘সেই সেটলমেন্টগুলো কোথায়?’
উত্তর দিকে আঙুল বাড়িয়ে বিশ্বজিৎ বললেন, ‘ওধারে তিনটে পাহাড় পেরলে পাশাপাশি দুটো সেটলমেন্ট, থার্ডটা আরও দূরে।‘

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।